হযরত উমর রা. এর ইবাদত:

ইমাম ইবনে কাসীর রহ. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়াতে হযরত উমর রা. এর জীবনী  আলোচনা করেছেন। তিনি লেখেন, হযরত উমর রা. লোকাদেরকে ইশার নামায পড়িয়ে নিজ ঘরে প্রবেশ করতনে। এরপর তিনি ফজর পর্যন্ত নামায আদায় করতেন।

-আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খ.৭, পৃ.১৩৫

হযরত উসমান রা. এর ইবাদত:

ইমাম ইবনুল জাওযী রহ. তার বিখ্যাত কিতাব সিফাতুস সাফওয়া-তে হযরত উসমান রা. এর জীবনী আলোচনা করেছেন। ইমাম ইবনে সিরীন রহ. থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন,

“খারেজীরা যখন হযরত উসমান রা. কে হত্যা করতে উদ্যত হয়, তখন হযরত উসমান রা. এর স্ত্রী বলেন, তোমরা তাকে হত্যা করো বা ছেড়ে দাও, তিনি এক রাকাতে সম্পূর্ণ কুরআন খতম করতেন। আর সারা রাত নামায আদায় করতেন। ”  [সিফাতুস সাফওয়া, খ.১, পৃ.২০০]

সারা রাত ইবাদত করা ও এক রাকাতে কুরআন খতমের বিষয়টি হযরত উসমান রা. থেকে সহীহ সনদে বর্ণিত। ইমাম ইবনে কাসীর রহ. তার ফাজাইলুল কুরআনে একে সহীহ বলেছেন। হযরত উসমান রা. এর এক রাতে কুরআন খতমের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন,

১. মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, খ.২, পৃ.৫০২

২.মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক।

৩. ইমাম বাইহাকী, শুয়াবুল ইমান ও সুনানুল কুবরা।

৪.ইমাম দারে কুতনী, সুনানে দারে কুতনী।

৫.ইমাম ত্ববরানী, মু’জামুল কাবীর।

৬. ইমাম বাগাবী শরহুস সুন্নাহ।

উসমান রা. এর তেলাওয়াতের বিষয়টি সহীহ বলেছেন, ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী ফাতহুল বারীতে। (খ.২, পৃ.৪৮২)

এছাড়াও আহলে হাদীস আলেম আব্দুর রহমান মুবারকপুরী হযরত উসমান রা. এর আমলটি উল্লেখ করেছেন। সেই সাথে আরও অনেক ইমামের কুরআন খতমের বিষয় উল্লেখ করেছেন। তুহফাতুল আহওয়াজী, খ.৮, পৃ.২১৯।

হযরত ইবনে উমর রা. এর রাত্রি জাগরণ:

ইমাম যাহাবী সিয়ারু আ’লামিন নুবালাতে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. এর ইবাদত সম্পর্কে লিখেছেন,

أنه كان يحيي الليل صلاة ، ثم يقول : يا نافع ، أسحرنا ؟ فأقول : لا . فيعاود الصلاة إلى أن أقول : نعم فيقعد ويستغفر ويدعو حتى يصبح .

অর্থ: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. সারা রাত নামায আদায় করতেন। তিনি বলতেন, হে নাফে, ভোর হয়েছে কি? আমি (নাফে) বলতাম, না।  এরপর তিনি আবার নামায শুরু করতেন। এভাবে  আমি হ্যা বলা পর্যন্ত তিনি নামায পড়তে থাকতেন। ফজর হলে তিনি বসে বসে ইস্তেগফার করতেন। এবং সকাল পর্যন্ত দুয়া করতেন।

১.সিয়ারু আলামিন নুবালা, খ.৩, পৃ.২৩৫

২. হিলয়াতুল আউলিয়া, খ.১, পৃ.৩০৩।

হযরত তামীম দারী রা. এর আমল :

 ইমাম ইবনে আব্দুল বার তার আল-ইস্তেজকার কিতাবে লিখেছেন,

وقد كان عثمان وتميم الداري وعلقمة وغيرهم يقرؤون القرآن كله في ركعة وكان سعيد بن جبير وجماعة يختمون القرآن مرتين وأكثر في ليلة

অর্থ: হযরত উসমান রা, তামীম দারী রা, হযরত আলকমাসহ অন্যান্যরা এক রাকাতে সম্পূর্ণ কুরআন তেলাওয়াত করতেন।  হযরত সাইদ ইবনে জুবাইর ও একদল তাবেয়ী একই রাতে দু’বার বা এর চেয়ে কুরআন খতম করেছেন।

আল-ইস্তেজকার, খ.২, পৃ.৪৭৫

ইমাম ত্বহাবী রহ. হযরত উসমান রা, হযরত তামীম দারী রা, আব্দুল্লাহ ইবনে জুবাইর রা.  সাইদ ইবনে জুবাইর সম্পর্কে  শরহু মায়ানিল আসারে উল্লেখ করেছেন যে, তারা সকলেই এক রাকাতে সম্পূর্ণ কুরআন খতম করতেন।

-শরহু মাযানিল আসার, খ.১, পৃ.৩৪৮ ।

বিখ্যাত মুহাদ্দিস ইবনে আবি শাইবা রহ. মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাতে তামীম দারী রা. এর একই রাকাতে কুরআন খতমের বর্ণনা উল্লেখ করেছেন।  মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, খ.১, পৃ.৩২৩।

তিরমিজী শরীফের ২৯৪৬ নং হাদীসের মন্তব্যে ইমাম তিরমিজী রহ. লিখেছেন,

و قَالَ بَعْضُ أَهْلِ الْعِلْمِ لَا يُقْرَأُ الْقُرْآنُ فِي أَقَلَّ مِنْ ثَلَاثٍ لِلْحَدِيثِ الَّذِي رُوِيَ عَنْ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَرَخَّصَ فِيهِ بَعْضُ أَهْلِ الْعِلْمِ وَرُوِي عَنْ عُثْمَانَ بْنِ عَفَّانَ أَنَّهُ كَانَ يَقْرَأُ الْقُرْآنَ فِي رَكْعَةٍ يُوتِرُ بِهَا وَرُوِي عَنْ سَعِيدِ بْنِ جُبَيْرٍ أَنَّهُ قَرَأَ الْقُرْآنَ فِي رَكْعَةٍ فِي الْكَعْبَةِ وَالتَّرْتِيلُ فِي الْقِرَاءَةِ أَحَبُّ إِلَى أَهْلِ الْعِلْمِ

অর্থ: কোন কোন আলেম বলেন, তিন দিনের কমে কুরআন খতম করা হবে না। এ বিষয়ে রাসূল স. এর হাদীস রয়েছে। আবার কিছু আলেম এর অনুমতি দিয়েছেন।  হযরত উসমান রা. থেকে বর্ণিত, তিনি  বিতরের এক রাকাতে সম্পূর্ণ কুরআন তেলাওয়াত করতেন।  হযরত সাইদ ইবনে জুবাইর সম্পর্কে বর্ণিত আছে, তিনি কা’বা ঘরে এক রাকাতে সম্পূর্ণ কুরআন তেলাওয়াত করেছেন। আলেমদের নিকট তারতীলের সাথে কুরআন তেলাওয়াত অধিক পছন্দনীয়।

ইমাম তিরমিজীর এ বক্তব্যের ব্যাখ্যা  হিসেবে আহলে হাদীস আলেম আব্দুর রহমান মুবারকপুরী তুহফাতুল আহওয়াজীতে লিখেছে,

” ( وَرَخَّصَ فِيهِ بَعْضُ أَهْلِ الْعِلْمِ ) أَيْ رَخَّصَ بَعْضُهُمْ فِي أَنْ يَقْرَأَ الْقُرْآنَ فِي أَقَلَّ مِنْ ثَلَاثٍ . قَالَ مُحَمَّدُ بْنُ نَصْرٍ فِي قِيَامِ اللَّيْلِ : وَكَانَ سَعِيدُ بْنُ الْمُسَيِّبِ يَخْتِمُ الْقُرْآنَ فِي لَيْلَتَيْنِ , وَكَانَ ثَابِتٌ الْبُنَانِيُّ يَقْرَأُ الْقُرْآنَ فِي يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ وَيَصُومُ الدَّهْرَ . وَكَانَ أَبُو حَرَّةَ يَخْتِمُ الْقُرْآنَ كُلَّ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ , وَكَانَ عَطَاءُ بْنُ السَّائِبِ يَخْتِمُ الْقُرْآنَ فِي كُلِّ لَيْلَتَيْنِ . ( وَرُوِيَ عَنْ عُثْمَانَ بْنِ عَفَّانَ أَنَّهُ كَانَ يَقْرَأُ الْقُرْآنَ فِي رَكْعَةٍ يُوتِرُ بِهَا ) رَوَاهُ مُحَمَّدُ بْنُ نَصْرٍ فِي قِيَامِ اللَّيْلِ , وَرَوَى الطَّحَاوِيُّ بِإِسْنَادِهِ عَنْ اِبْنِ سِيرِينَ قَالَ : كَانَ تَمِيمٌ الدَّارِيُّ يُحْيِي اللَّيْلَ كُلَّهُ بِالْقُرْآنِ كُلِّهِ فِي رَكْعَةٍ , عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ الزُّبَيْرِ أَنَّهُ قَرَأَ الْقُرْآنَ فِي رَكْعَةٍ , وَعَنْ سَعِيدِ بْنِ جُبَيْرٍ أَنَّهُ قَرَأَ الْقُرْآنَ فِي رَكْعَةٍ فِي الْبَيْتِ , وَقَالَ مُحَمَّدُ بْنُ نَصْرٍ فِي قِيَامِ اللَّيْلِ : وَخَرَجَ صَالِحُ بْنُ كَيْسَانَ إِلَى الْحَجِّ فَرُبَّمَا خَتَمَ الْقُرْآنَ مَرَّتَيْنِ فِي لَيْلَةٍ بَيْنَ شُعْبَتَيْ رَحْلِهِ , وَكَانَ مَنْصُورُ بْنُ زَاذَانَ خَفِيفَ الْقِرَاءَةِ , وَكَانَ يَقْرَأُ الْقُرْآنَ كُلَّهُ فِي صَلَاةِ الضُّحَى , وَكَانَ يَخْتِمُ الْقُرْآنَ بَيْنَ الْأُولَى وَالْعَصْرِ وَيَخْتِمُ فِي يَوْمٍ مَرَّتَيْنِ , وَكَانَ يُصَلِّي اللَّيْلَ كُلَّهُ , وَكَانَ إِذَا جَاءَ شَهْرُ رَمَضَانَ خَتَمَ الْقُرْآنَ بَيْنَ الْمَغْرِبِ وَالْعِشَاءِ خَتْمَتَيْنِ ثُمَّ يَقْرَأُ إِلَى الطَّوَاسِينِ قَبْلَ أَنْ تُقَامَ الصَّلَاةُ . وَكَانُوا إِذْ ذَاكَ يُؤَخِّرُونَ الْعِشَاءَ لِشَهْرِ رَمَضَانَ إِلَى أَنْ يَذْهَبَ رُبْعُ اللَّيْلِ اِنْتَهَى مَا فِي قِيَامِ اللَّيْلِ بِقَدْرِ الْحَاجَةِ , وَلَوْ تَتَبَّعْت تَرَاجِمَ أَئِمَّةِ الْحَدِيثِ لَوَجَدْت كَثِيرًا مِنْهُمْ أَنَّهُمْ كَانُوا يَقْرَءُونَ الْقُرْآنَ فِي أَقَلَّ مِنْ ثَلَاثٍ , فَالظَّاهِرُ أَنَّ هَؤُلَاءِ الْأَعْلَامَ لَمْ يَحْمِلُوا النَّهْيَ عَنْ قِرَاءَةِ الْقُرْآنِ فِي أَقَلَّ مِنْ ثَلَاثٍ عَلَى التَّحْرِيمِ , وَالْمُخْتَارُ عِنْدِي مَا ذَهَبَ إِلَيْهِ الْإِمَامُ أَحْمَدُ وَإِسْحَاقُ بْنُ رَاهْوَيْهِ وَغَيْرُهُمَا وَاَللَّهُ تَعَالَى أَعْلَمُ “.

অর্থ: কিছু  আলেম তিন দিনের কম সময়ে কুরআন খতমের অনুমতি দিয়েছেন। ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে নসর তার কিয়ামুল লাইল কিতাবে লিখেছেন,  তাবেয়ী হযরত সাইদ ইবনুল মুসায়্যিব দু’দিনে কুরআন খতম করতেন।  হযরত সাবেত বুনানী রহ. একদিন ও এক রাতে কুরআন খতম করতেন এবং লাগাতার রোজা রাখতেন। হযরত আবু হাররা প্রত্যেক রাত ও দিনে কুরআন খতম করতেন।  হযরত আতা ইবনে সায়েব দু’রাতে কুরআন খতম করতেন। (হযরত উসমান রা. সম্পর্কে বর্ণিত আছে, তিনি বিতরের এক রাকাতে কুরআন খতম করতেন।) মুহাম্মাদ ইবনে নসর তার কিয়ামুল লাইল কিতাবে এটি উল্লেখ করেছেন।  ইমাম ত্বহাবী রহ. নিজ সনদে ইবনে সিরীন রহ. থেকে বর্ণনা করেছেন,  সাহাবী হযরত দামীম দারী রা. এক রাকাতে সম্পূর্ণ কুরআন খতম করতেন এবং সারা রাত নামাযে কুরআন তেলাওয়াত করতেন।  হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে জুবাইর রা. সম্পর্কে বর্ণিত আছে, তিনি এক রাকাতে কুরআন খতম করেছেন।  হযরত সাইদ ইবনে জুবাইর রহ. সম্পর্কে বর্ণিত আছে,  তিনি কাবা ঘরে এক রাকাতে সম্পূর্ণ কুরআন খতম করেছেন। ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে নসর তার কিয়ামুল লাইল গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ইমাম সালেহ ইবনে কাইসান হজ্জের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। কখনও বাহনে আরোহী অবস্থায়  একই রাতে দু’বার কুরআন খতম করতেন। হযরত মানসুর ইবনে যাজান রহ. ধীরে ধীরে তেলাওয়াত করতেন। কখনও তিনি চাশতের নামাযে কুরআন খতম করতেন। তিনি যোহর ও আসরের মাঝে কখনও কুরআন খতম করতেন।  তিনি এক দিনে দু’বার কুরআন খতম করতেন। সারা রাত জেগে তিনি নামায আদায় করতেন।  যখন রমজান মাস আসতো, মাগরিব ও ইশার নামাযের মধ্যবর্তী সময়ে দু’বার কুরআন খতম করতেন। এরপর ইশার নামাযের পূর্বে তাসিন পর্যন্ত তেলাওয়াত করতেন।  রমজানে তিনি ইশার নামায একটু বিলম্বে রাতের এক চতুর্থাংশের পরে আদায় করতেন।  তুমি যদি মুহাদ্দিসগণের জীবনী দেখো, তাহলে তাদের অনেকের জীবনীতে পাবে, তারা তিন দিনের কম সময়ে কুরআন খতম করতেন। সুতরাং স্পষ্ট কথা হল, যে হাদীসে তিন দিনের কমে কুরআন খতম করতে নিষেধ করা হয়েছে, এসব মুহাদ্দিস সেটা দ্বারা হারাম নিষেধাজ্ঞা উদ্দেশ্য নেননি। আমার নিকট প্রাধান্য মত হল, ইমাম আহমাদ ও ইমাম ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ ও অন্যদের মত। আল্লাহ তায়ালা ভালো জানেন।

-তুহফাতুল আহওয়াজী খ.৮, পৃ.২১৯।

এই  সিরিজটি কোন ভূমিকা ছাড়াই শুরু করেছি। ইনশাআল্লাহ প্রত্যেকটি বিষয়ে বিস্তারিত লিখবো। অনেকের মনে প্রশ্নের পাহাড় জমে গেছে।  আহলে হাদীস আলেম আব্দুর রহমান মুবারকপুরী তাবেয়ীদের থেকে বর্ণান করলেন, সেটা কীভাবে সম্ভব? মাগরিব থেকে ইশার মধ্যবর্তী সময়ে দু’খতম কুরআন তেলাওয়াত? এক রাকাতে সম্পূর্ণ কুরআন তেলাওয়াত কীভাবে সম্ভব? প্রত্যেকটি বিষয়ে লিখবো ইনশাআল্লাহ। এ বিষয়ে কেন লিখছি, কী কী থাকবে, সেগুলো স্পষ্ট করবো ইনশাআল্লাহ।

Print Friendly