ভূমিকা:

তাজকিয়া, তাসাউফ, যুহদ বা আত্মশুদ্ধির মেহনত অন্যতম একটি ফরজ বিধান। আত্মার ব্যাধি থেকে মুক্ত না হলে  বাহ্যিক আমলের সত্ত্বেও শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে। রাসূল স. ইরশাদ করেছেন, যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। সুতরাং অহংকার নামক আত্মিক ব্যধিসহ অন্যান্য ব্যাধি থেকে মুক্ত হতে হবে। একেই তাজকিয়া, তাসাউফ বা জুহদ বলে।

আত্মার ব্যাধি থেকে মুক্ত হওয়া ফরজে আইন। প্রত্যেক মুসলিমকে এগুলো থেকে পরিশুদ্ধি অর্জন করতে হবে। লোভ, লালসা, হিংসা-বিদ্বেষ, অহংকার, পরশ্রীকাতরতা, কু-ধারণা, ক্রোধ মানুষের অন্তরে সুপ্ত মারাত্মক কিছু রোগ। এগুলো থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য প্রয়াসী হওয়া আবশ্যক।

তাসাউফ বা তাজকিয়ার সারমর্ম হলো,

১. প্রকাশ্য ও গোপনে তাকওয়া অবলম্বন । (আল্লাহর ভয়ে সকল গোনাহ থেকে দূরে থাকা)

২. কথা ও  কাজে সর্বদা সুন্নাহর  অনুসরণ।

৩. সর্বদা আল্লাহর প্রতি ভরসা ও সৃষ্টি থেকে বিমুখ থাকা।

৪.সুখ-দুখে সদা-সর্বদা আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট থাকা।

৫. সুখে-দুখে আল্লাহর প্রতি মনোনিবেশ করা। (বিপদে আল্লাহকে স্মরণ করা আর সুখের সময় ভুলে যাওয়ার মতো অকৃতজ্ঞ আচরণ না করা)

 

একটু গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখবেন, এগুলোই হলো শরীয়তের মূল। ইসলাম একজন মু’মিন থেকে এগুলোই চায়।  আমাদের প্রত্যেকের কাংখিত মনজিল উল্লেখিত পাচটি মৌলিক বিষয়।  এজন্যই সালাফে-সালেহীন জুহদ, তাকওয়া ও তাজকিয়ার প্রতি সীমাহীন গুরুত্ব দিয়েছেন।

ইবনুল কাইয়্যিম রহ. বলেন,

ومنها أن هذا العلم (التصوف) هو من أشرف علوم العباد وليس بعد علم التوحيد أشرف منه وهو لا يناسب إلا النفوس الشريفة

অর্থ: বান্দার জন্য অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইলম হলো তাসাউফের ইলম।  তাউহীদের ইলমের পরে এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ কোন ইলম নেই।  সম্মানিত অন্তর কেবল এটি অর্জন করতে পারে।

[ত্বরিকুল হিজরাতাইন, ইবনুল কাইয়্যিম রহ. পৃ. ২৬০-২৬১]

 

ইবনুল কাইয়্যিম রহ. বুজুর্গদের মজলিশ সম্পর্কে  গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা বলেছেন। এই বক্তব্যে তাসাউফের মৌলিক বিষয়গুলি উঠে এসেছে। সেই সাথে তাসাউফের প্রকৃত চর্চাকারীদের পরিচয় স্পষ্ট হয়েছে। কেননা যাদের মজলিশে বসলে নীচের বিষয়গুলি অর্জিত হয় না, তাহলে বাস্তবে কোন ওলী-বুজুর্গ নয়।

ইবনুল কাইয়্যিম রহ. বলেন,

وقيل : مجالسة العارف تدعوك من ست الي ست : من الشك إلي اليقين , ومن الرياء الي الإخلاص , ومن الغفلة الي الذكر , ومن الرغبة في الدنيا الي الرغبة في الاخرة , ومن الكبر الي التواضع , ومن سوء الطوية الي النصيحة

অর্থ: সূফীগণ বলেন, বুজুর্গ ব্যক্তির মজলিশ তোমাকে ছয়টি বিষয় থেকে মুক্ত হয়ে ছয়টি গুণ অর্জনে উদ্বুদ্ধ করবে।

১. সন্দেহ থেকে ইয়াকীনের দাওয়াত দিবে।

২. রিয়া (লৌকিকতা) থেকে ইখলাসের দাওয়াত দিবে।

৩. গাফলত (উদাসীনতা) থেকে জিকরের দাওয়াত দিবে।

৪. দুনিয়ার আসক্তি থেকে  পরকালের আসক্তির দিকে দাওয়াত দিবে।

৫. অহংকার থেকে বিনয়ের দাওয়াত দিবে।

৬. পরশ্রীকাতরতা ও হিংসা থেকে অন্যের কল্যাণকামিতার দাওয়াত দিবে।

[মাদারিজুস সালিকীন, ইবনুল কায়্যিম রহ. খ.৩, পৃ.৩৩৫]

 

যুহদ ও তাজকিয়া মূলত: সাহাবায়ে কেরামের মাঝে সবচেয়ে বেশি ছিলো।  পরবর্তীতে তাবেয়ীগণও এগুলো চর্চা করে উম্মাহের মাঝে শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করেন।  গোনাহমুক্ত জীবন, অধিক ইবাদত, দুনিয়া বিমুখতা এগুলো যেমন সাহাবায়ে কেরামের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিলো, একইভাবে তাবেয়ী ও তাবে-তাবেয়ীগনও এগুলো দ্বারা নিজেদের জীবনকে অলংকৃত করেছেন।

“সালাফে-সালেহীনের ইবাদতময় জীবন (১-৩)”  শিরোনামে আমরা তাদের যুহদের সামান্য চিত্র তুলে ধরেছি। পরবর্তীতে আরও বিস্তারিত আলোচনার নিয়ত রয়েছে। তাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত ছিল তাকওয়ার রঙে উজ্জল।  মূল ধারার তাসাউফ মূলত: সাহাবা ও তাবেয়ীগণের মাধ্যমে বিকশিত হয়েছে।  তাসাউফের মৌলিক বিষয়গুলো তাদের থেকেই উম্মত গ্রহণ করেছে। যেকোন একজন তাবেয়ীর জীবনী পর্যালোচনা করে দেখুন, তাদের ইবাদত, দুনিয়া বিমুখতা ও গোনাহমুক্ত সুন্নাহ সম্মত জীবন আপনাকে বিস্মিত করবে।  জীবনের ছোট্র একটি গোনাহের কারণে  তারা বছরের পর বছর কান্নাকাটি করে তৌবা করেছেন।  এগুলোই হলো প্রকৃত তাসাউফ।

 

মূল ধারার তাসাউফ থেকে বিচ্যুত মাজারপূজারী ভন্ড পীর-ফকিরদের শরীয়ত বিরোধী কর্মকান্ডের সাথে তাসাউফের দূরতম কোন সম্পর্ক নেই। এরা মূল ধারার তাসাউফ থেকে যোজন যোজন দূরে। বাস্তবতা হলো, শরীয়ত বিরোধী কর্মকান্ডে লিপ্ত ব্যক্তি যে নামেই সমাজে আত্মপ্রকাশ করুক, সে পরিত্যাজ্য। তাসাউফের বিখ্যাত ইমামগণ বলেছেন, তুমি যদি কাউকে বাতাসে উড়তে কিংবা পানিতে হাঁটতে দেখো, শরীয়তের মানদন্ডে উত্তীর্ণ না হওয়া পর্যন্ত তাকে ওলী-বুজুর্গ ভেবো না।  বাহ্যিকভাবে কুরআন-সুন্নাহ ও শরীয়ত বিরোধী ব্যক্তি থেকে সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ঘটনা প্রকাশিত হলেও সে ভন্ড প্রতারক। শরীয়ত বিরোধী কেউ কখনও আল্লাহর প্রিয়ভাজন হতে পারে না।

মূল ধারার তাসাউফ চর্চাকারী সালাফে- সালেহীন শরীয়তের সকল বিধি-বিধান পালন করতেনা।  শরীয়তের গুরুত্বপূর্ণ একটি বিধান হলো কিতাল ও জিহাদ। আল্লাহর জন্য নিজেকে উৎসর্গ করার সর্বোচ্চ স্তর এটি।  মূল ধারার  সূফীগণ এই সর্বোচ্চ সুযোগকে হাত ছাড়া করতেন না।  এজন্যই তো সালাফে-সালেহীন সম্পর্কে প্রবাদ রয়েছে,  তারা ছিলেন রুহবানুল-লাইল, ফুরসানুন নাহার (রাতে আবেদ, দিনে অশ্বারোহী)।

 

নফস বা প্রবৃত্তি দুনিয়ার লোভ-লালসা ও ভোগ-বিলাসে মত্ত থাকার দাওয়াত দেয়। নফসের এই দাওয়াত উপেক্ষা করে, নফসের জিহাদে জয়ী হয়েই কেবল নিজেকে কিতালের ময়দানে পেশ করা সম্ভব।  নফসের গোলাম কখনও কিতালের ময়দান মাড়ায় না। মূল ধারার সুফীগণ নিজেদের প্রবৃত্তি দমন করেছিলেন। প্রবৃত্তির চাহিদা উপেক্ষা করে জীবনে মায়া ত্যাগ করে কিতালের ময়দানে নিজেদেরকে সঁপে দিতেন। নফসের সাথে জিহাদ করে পরাজিত হয়ে ময়দান থেকে দূরে থাকতেন না। বেঁচে থাকার সীমাহীন আকাঙ্খা ও প্রবৃত্তির তাড়নাকে গলাটিপে হত্যা করে বীরদর্পে এগিয়ে যেতেন তারা। প্রবৃত্তির জিহাদকে মূল বানিয়ে নফসের কাছে আত্মসমর্পণ করে বসে থাকতেন না।  গোনাহমুক্ত, যুহদ ও তাকওয়ার রঙে রঙ্গিন এসব সংগ্রামী সূফীদের সংক্ষিপ্ত জীবনী  তুলে ধরতেই আমাদের এই ক্ষুদ্র প্রয়াস।  পরবর্তী পর্বগুলোতে ইনশাআল্লাহ তাদের জীবনী আলোচনা করা হবে।

 

Print Friendly