কারামত অস্বীকারকারীদের মনস্তত্ব হল, যাদের মৃত্যু হয়েছে, তাদের পক্ষ থেকে কারামত সংগঠিত হওয়া সম্ভব নয। তাদের মতে মৃত্যুপরবর্তী কারামতে বিশ্বাস কুফুরী। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একজন মৃত্যুবরণ করেছেন। তার কবর থেকে সালামের উত্তর শোনা সম্ভব নয়। এটা ভ্রান্ত ও কুফুরী। তাকে কবরের মাঝে সরাসরি দেখতে পাওয়া অথবা কবর থেকে তার হাতবের হতে পারে, এধরনের বিশ্বাস রাখা শিরক। কারামত অস্বীকারকারীরা এগুলোকে কুফুরী ও শিরকী আকিদা বলে থাকেন। বিশেষভাবে মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে দুনিয়াতে যে কোন ধরনের ঘটনা প্রকাশিত হওয়া তাদের নিকট কুফুরী ও শিরক। এটা হল, তাদের মৌলিক বিশ্বাস।

হায়াতুন্নবী বাহাসে কারামত অস্বীকারকারী মুরাদ বিন আমজাদ ও তার সঙ্গীরা এধরনের কারামতকে কুফুরী শিরকী আখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেছে। তাদের মতে এগুলো ভ্রান্ত আকিদ। এগুলো ছাটাই করার  মিশনে নেমেছেন তথাকথিত আহলে হাদীস ও সালাফীরা । আল্লাহ এসব কারামত অস্বীকারকারীদের ফেতনা থেকে উম্মাহকে হেফাজত করু।

আমরা আহলে সুন্নত ওয়াল জামাত বিশ্বাস করি, আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছা ও ক্ষমতায় কারামত সংঘঠিত হয়। সুতরাং কেউ মৃত্যুবরণ করলে আল্লাহ তায়ালা তার রুহ, দেহ বা প্রতিচ্ছবির মাধ্যমে যে কোন কারামত প্রকাশ করতে সক্ষম। এধরনের কোন মৃত ব্যক্তি থেকে দুনিয়াতে কোন কারামত প্রকাশিত হলে এটি সম্পূর্ণ শরীযতসম্মত। বিকৃত মস্তিষ্কের কারামত অস্বীকারকারীই কেবল এধরনের কারামতকে অস্বীকার করতে পারে। নতুবা কুরআন-হাদীস ও সালাফ থেকে এধরনের অসংখ্য ঘটনা বর্ণিত আছে।

উদাহরণ হিসেবে নিজের ঘটনাগুলো লক্ষ্য করুন।

১. হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল স. বলেন,

حَدَّثَنَا إِسْحَاقُ بْنُ إِسْمَاعِيلَ ، حَدَّثَنَا وَكِيعٌ ، وَعَبْدُ اللَّهِ بْنُ نُمَيْرٍ , عَنِ الرَّبِيعِ بْنِ سَعْدٍ الْجُعْفِيِّ ، عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ سَابِطٍ ، عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ ، قَالَ : قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : ” حَدِّثُوا عَنْ بَنِي إِسْرَائِيلَ ، فَإِنَّهُ كَانَتْ فِيهِمُ الأَعَاجِيبُ ، ثُمَّ أَنْشَأَ يُحَدِّثُ ، قَالَ : خَرَجَتْ رُفْقَةٌ مَرَّةً يَسِيرُونَ فِي الأَرْضِ فَمَرُّوا بِمَقْبَرَةٍ ، فَقَالَ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ : لَوْ صَلَّيْنَا رَكْعَتَيْنِ ثُمَّ دَعَوْنَا اللَّهَ لَعَلَّهُ يُخْرِجُ لَنَا بَعْضَ أَهْلِ هَذِهِ الْمَقْبَرَةِ فَيُخْبِرُنَا عَنِ الْمَوْتِ ، قَالَ : فَصَلُّوا رَكْعَتَيْنِ ثُمَّ دَعَوْا ، فَإِذَا هُمْ بِرَجُلٍ خِلاسِيٍّ قَدْ خَرَجَ مِنْ قَبْرٍ يَنْفُضُ رَأْسَهُ ، بَيْنَ عَيْنَيْهِ أَثَرُ السُّجُودِ ، فَقَالَ : يَا هَؤُلاءِ مَا أَرَدْتُمْ إِلَى هَذَا ؟ لَقَدْ مِتُّ مُنْذُ مِائَةِ سَنَةٍ فَمَا سَكَنَتْ عَنِّي حَرَارَةُ الْمَوْتِ إِلَى السَّاعَةِ ، فَادْعُوا اللَّهَ أَنْ يُعِيدَنِي كَمَا كُنْتُ ” .

“তোমরা বনী ইসরাইলদের ঘটনা বর্ণনা করো। কেননা তাদের মাঝে অনেক আশ্চর্যজনক ঘটনা সংগঠিত হয়েছে। এরপর রাসূল স. একটি ঘটনা বর্ণনা করলেন,

একদা বনী ইসরাইলের কয়েকজন বন্ধু ভ্রমণে বের হল।  তারা একটি কবরস্থান দিয়ে অতিক্রম করছিল । তারা একে -অপরকে বলল, “আমর যদি, দু’রাকাত নামায আদায় করে আল্লাহর কাছে দুয়া করি, তাহলে আল্লাহ তায়ালা হয়তো কবরের কোন ব্যক্তিকে আমাদের সামনে উপস্থিত করবেন। সে মৃত্যু সম্পর্কে আমাদেরকে বলবে।

তারা দু’রাকাত নামায আদায় করল। এরপর আল্লাহর কাছে দুয়া করল। হঠাৎ এক ব্যক্তি মাথা থেকে মাটি পরিষ্কার করতে করতে কবর থেকে বের হয়ে এল। তার কপালে সিজদার চিহ্ন ছিল।  সে বলল, তোমরা কী চাও? আমি একশ বছর পূর্বে মৃত্যুবরণ করেছি। এখনও আমার দেহ থেকে মৃত্যুর যন্ত্রনা উপশমিত হয়নি।  আল্লাহর কাছে দুয়া করো, যেন তিনি আমাকে পূর্বের স্থানে (কবরে) ফেরত পাঠিয়ে দেন”

যেসব বিখ্যাত মুহাদ্দিস হাদীসটি তাদের কিতাবে উল্লেখ করেছেন,

১.  ইবনে আবিদ দুনিয়া রহ., মান আশা বা’দাল মাউত। হাদীস নং ৫৮

২. মুসনাদে আব্দ ইবনে হুমাইদ, হাদীস নং ১১৬৪

৩.ফাওয়াইদু তামাম আর-রাজী, হাদীস নং ২১৭

৪. আল-জামে লি আখলাকির রাবী, খতীব বাগদাদী, হাদীস নং ১৩৭৮

৫. আল-বা’স, ইবনে আবি দাউদ, হা.৫

৬.আজ-জুহদ, ইমাম ওকী ইবনুল জাররাহ, হাদীস নং৮৮

৭. আজ-জুহদ, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ.

৮. মাজালিস মিন আমালি ইবনে মান্দাহ, ইবনে মান্দাহ, হাদীস নং ৩৯৩

৯. আল-মাতালিবুল আলিয়া, ইবনে হাজার আসকালানী রহ. হাদীস নং ৮০৭

১০. ফুনুনুল আজাইব, হা.১৯

১১. শরহুস সুদুর, জালালুদ্দীন সুয়ূতী রহ. পৃ.৪২-৪৩

ঘটনাটি বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত। তামাম আর-রাজী এটি সরাসরি রাসূল স. থেকে বর্ণনা করেছেন। ইবনে হাজার আসকালানী রহ. হযরত জাবির রা. থেকে মওকুফ সূত্রে বর্ণনা করেছেন, যেটি মরফু এর হুকুমে। সুতরাং ঘটনার প্রামাণ্যতার ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই।

কারামত অস্বীকারকারী ভাইদের কাছে, আমাদের প্রশ্ন,

১. রাসূল স. এধরনের ঘটনা বর্ণনা করে উম্মতকে কুফুরী শিক্ষা দিয়েছেন?

২. মুহাদ্দিসগণ ঘটনাটি তাদের কিতাবে উল্লেখ করে কুফুরী প্রচার করেছেন?

৩. বিখ্যাত ইমামগণ এই ঘটনার মূল বিষয় তথা কবর থেকে কেউ বের হয়ে কথা বলার উপর কোন আপত্তি করেননি। এটি অসম্ভব কিংবা এটি কুফুরী-শিরকী বলা তো দূরের বিষয়। সুতরাং নতুনভাবে এটাকে কুফুরী -শিরকী বলে সেসব ইমামদেরকে কেন অভিযুক্ত করছেন?

৪. ঘটনাটি যদি কুফুরী-শিরকী হয়, তাহলে যেসব মুহাদ্দিস এই ঘটনা তাদের কিতাবে উল্লেখ করেছেন, এবং এর উপর কোন অভিযোগ করেননি, তারা সকলেই কি কুফুরী-শিরকী করেছেন?

৫. মূল ঘটনা যদি কুফুরী-শিরকী হয়, তাহলে এর সনদ দেখার কোন প্রয়োজন নেই। কেননা, কুফুরী বিষয় বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত হলেও কুফুরী, দুর্বল সনদে রর্ণিত হলেও কুফুরী। সুতরাং মূল ঘটনা যদি কুফুরী-শিরকী হয়, তাহলে উপর্যুক্ত ইমাম ও মুহাদ্দিসগণ সম্পর্কে আপনাদের ফতোয়া জানতে চাই।

Print Friendly