আরশ কি খালি হয়ে যায়?

তথাকথিত সালাফীরা আজব আজব আকিদা রাখে। এসব আকিদা কীভাবে তারা ইসলামী আকিদা হিসেবে প্রচার করে আল্লাহ পাকই ভালো জানেন।  এদের আকিদা হলো, আল্লাহ তায়ালা স্বশরীরে প্রথম আসমানে নেমে আসেন। আল্লাহ তায়ালা যদি প্রথম আসমানে নেমে আসেন, তাহলে কি আরশ তখন খালি থাকে? আরশ খালি থাকে কি না, এটা নিয়ে তাদের মাঝে ব্যাপক মতবিরোধ রয়েছে।

আসলে আরশ খালি থাকার প্রশ্ন তখনই দেখা দেয়, যখন কেউ বিশ্বাস করে যে, আল্রাহ তায়ালা আরশের মতো দৈঘ্য-প্রস্থের। তিনি আরশকে পরিপুর্ণ বেষ্টন করে আছেন। তিনি যখন নেমে আসেন, তখন আরশ আল্লাহ তায়ালা থেকে খালি হয়ে যায়। এরা শুধু আরশ খালি হওয়ার আকিদা নিয়ে কথা বলে না, আল্লাহ তায়ালা উঠেন, বসেন, দৌড়ান, নামেন ইত্যাদি আকিদাও রাখে।

প্রথম কথা হলো, সালাফীরা বলে, কোন সৃষ্টির মাঝে আল্লাহর প্রবেশের আকিদা কুফুরী। এই কুফুরী আকিদাকে হুলুল বলে। হুলুলের আকিদা কুফুরী এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই। আমি বহুবার জিজ্ঞাসা করেছি, আপনারা আসলে আল্লাহ তায়ালাকে কোথায় বিশ্বাস করেন? আরশে না কি আসমানে? এরা দলিল দেয়ার সময় বলে,আল্লাহ আসমানে রয়েছেন। বিশ্বাসের সময় বলে, আল্লাহ আরশে বসে আছেন। আবার কিছুক্ষণ পরে বলে, আল্লাহ প্রথম আসমানে নেমে আসেন। সেদিন এক সালাফী আমাকে প্রশ্ন করলো, দেওবন্দীরা হুলুলের আকিদা রাখে। আমি বললাম, আস্তাগফিরুল্লাহ। হুলুলের আকিদা তো আপনারা রাখেন। তাকে বললাম, আসমান মাখলুক কি না? সে বলল, হ্যা, মাখলুক। আমি বললাম, আসমান যদি মাখলুক হয়ে থাকে, তাহলে আল্লাহ তায়ালাকে কোন মাখলুকের মাঝে বিশ্বাস করাই তো হলো হুলুল? সে একেবারে লা জওয়াব। এদের কাছে বড় মাখলুকের মধ্যে আল্লাহ তায়ালাকে বিশ্বাস করলে হুলুল হয় না, কিন্তু ছোট মাখলুকের মধ্যে বিশ্বাস করলে হুলুল হয়।

দ্বিতীয় কথা হলো, সালাফীদের আকিদা হলো, আল্লাহ তায়ালা আরশে বসে আছেন। আবার তারা এটাও বিশ্বাস করে যে, শেষ রাতে আল্লাহ তায়ালা প্রথম আসমানে নেমে আসেন। আমরা জানি, পৃথিবীর কোথাও না কোথাও চব্বিশ ঘন্টার প্রত্যেকটি মুহূর্তে শেষ রাত থাকে। অর্থাৎ ভৌগলিক অবস্থানের কারণে সব সময় কোথাও না কোথাও শেষ রাত থাকবে। এবার মূল প্রশ্ন হলো, আল্লাহ তায়ালা সব সময় প্রথম আসমানে থাকেন, না কি আরশেও থাকেন? শেষ রাত হিসেবে সব সময় প্রথম আসমানে থাকার কথা। আবার আপনাদের বক্তব্য অনুযায়ী,আল্লাহ তায়ালা আরশে বসে আছেন।  সালাফী আলেমরা ত্রিমুখী সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে, আল্লাহ তায়ালা যখন আসমানে নেমে আসেন, তখন কি আরশ খালি থাকে?

১. আসমানে নেমে আসার আকিদাটি স্পষ্ট হলো হুলুল। অথচ তাদের নিকট হুলুলের আকিদা কুফুরী।

২. আল্লাহ তায়ালা শেষ রাথে প্রথম আসমানে নেমে আসেন। অথচ পৃথিবীর কোথাও না কোথাও চব্বিশ ঘন্টার প্রতিটি মুহূর্তে শেষ রাত থাকে। তাহলে কি আল্লাহ তায়ালা প্রতি মুহূর্তে প্রথম আসমানে নেমে আসেন?

৩. আল্লাহ তায়ালা প্রথম আসমানে নেমে আসার পর কি আরশ খালি থাকে? 

৪.আল্লাহ তায়ালা যদি প্রথম আসমানে নেমে আসেন, তাহলে আল্লাহ তায়ালা যে উপরে রয়েছেন, একথা বলা সঠিক হয় না। কারণ আল্লাহর উপরেও অন্যান্য আসমান বা আরশ থাকে। সুতরাং উলু বা উপরে থাকার ব্যাপারটি আর সঠিক থাকে না। 

এরা হয়তো বলবে, আল্লাহ তায়ালা তার শান অনুযায়ী প্রথম আসমানে নেমে আসেন। সুতরাং এটি হলুল হবে না বা কুফুরী হবে না। তাহলে যারা আল্লাহ তায়ালাকে সর্বত্র বিরাজমান মনে করে, তারাও একই উত্তর দিবে। আল্লাহ তায়ালা তার শান অনুযায়ী সর্বত্র বিরাজমান। তার শান অনুযায়ী প্রথম আসমানে নেমে আসাটা যদি সহীহ আকিদা হয়, তাহলে আল্লাহ তায়ালা তার শান অনুযায়ী সর্বত্র বিরাজমান এটাও সহীহ আকিদা হওয়ার কথা। এই দুই আকিদার মধ্যে সামান্যতম কোন পার্থক্য নেই। অথচ এই সালাফীরাই আবার দ্বিতীয় আকিদাকে কুফুরী সাব্যস্ত করে। এধরনের হাস্যকর দ্বিমুখী আচরণ তারা কেন করে আল্লাহ পাকই ভালো জানেন।

যাই হোক, আমাদের আজকের আলোচ্য বিষয়, আল্লাহ তায়ালা প্রথম আসমানে নেমে এলে আরশ কি খালি থাকে?  ইবনে তাইমিয়া এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। ইবনে তাইমিয়ার মত আল্লাহ তায়ালা প্রথম আসমানে নেমে এলেও আরশ খালি হয় না। একই বিশ্বাসের কথা বলেছে শায়খ নাসীরুদ্দিন আলবানী। এ বিষয়ে সালাফী আলেমদের মাঝে মতবিরোধ হয়েছে। আমরা তাদের মতবিরোধ উল্লেখ করছি।

মুফতী ইব্রাহীম আলুশ শায়খের বক্তব্য:

সৌদি আরবের সাবেক প্রধান মুফতী ইব্রাহিম আলুশ শায়খের মতে আল্লাহ তায়ালার জন্য এজাতীয় শব্দ ব্যবহার অনুচিৎ। আরশ খালি হয় কি না, এটা নিয়ে আলোচনা করাই ঠিক নয়। তার মতে, আল্লাহ তায়ালা তার শান অনুযায়ী নেমে আসেন এটা বলা উচিৎ। 

[ফতোয়া ও রসাইল, পৃ.২১২]

স্ক্রিনশট:

ইবনে উসাইমিনের বক্তব্য:

ইবনে উসাইমিন লিখেছে,

” আল্লাহর আরশে ইস্তাওয়া হলো একটি কাজ। এটি আল্লাহর সত্ত্বাগত কোন গুণ নয়। আমার মতে, আমাদের এই অধিকার নেই যে, আমরা আরশ খালি হয় কি না, এবিষয়ে আলোচনা করবো। বরং আমরা এ বিষয়ে চুপ থাকবো, যেমন সাহাবায়ে কেরাম চুপ ছিলেন।”

[শরহুল আকিদাতিল ওয়াসিতিয়া, খ.২, পৃ.১৬]

স্ক্রিনশট:

ইবনে জিবরীনের বক্তব্য:

শায়খ ইবনে জিবরীন বলেন,

” এ বিষয়ে আমরা আলোচনা করতে বাধ্য নই। এ বিষয়ে আলোচনা করার প্রয়োজনও নেই।”

[আত-তা’লীকাতুয যাকিয়্যা, খ.২, পৃ.১১]

স্ক্রিনশট:

শায়খ আব্দুর রাজ্জাক আফিফীর বক্তব্য:

সালাফী শায়খ আব্দুর রাজ্জাক আফিফী বলেন,

” এ ব্যাপারে সঠিক বক্তব্য হলো, কোন মতামত ব্যক্ত না করা। আমরা বিশ্বাস করি, আল্লাহ আরশে আছেন। আমরা বিশ্বাস করি, আল্লাহ অবতরণ করেন। আমরা বলবো না, আরশ খালি হয়ে যায় অথবা আরশ খালি হয় না। কেননা, এ আলোচনা আল্লাহর কাইফিয়াত  সম্পর্কে আলোচনার অন্তর্ভূক্ত”

[ফতোয়া ও রসাইল, খ.১,পৃ.১৬৩]

স্ক্রিনশট:

ইবনে তাইমিয়ার বক্তব্য:

ইবনে তাইমিয়ার মতে আল্লাহ তায়ালা প্রথম আসমানে নেমে এলেও আরশ থেকে তিনি খালি থাকেন না বা আরশ তার থেকে খালি থাকে না।

[মাজমুয়াতুল ফাতাওয়া, খ.৫, পৃ.২১৯]

স্ক্রিনশট:

শায়খ আলবানীর বক্তব্য:

শায়খ আলবানী ইবনে তাইমিয়ার অনুরুপ মত প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, আল্লাহ তায়ালা প্রথম আসমানে নেমে এলেও আরশ থেকে খালি হন না। 

[মাউসুয়াতুল আলবানী, খ.২, পৃ.৬৮৮]

স্ক্রিনশট:

 

Print Friendly