শিরোনাম দেখেই হয়তো গায়রে মুকাল্লিদ ভাইদের মন খারাপ হয়ে গিয়েছে। আমার কি দোষ বলে্ন ভাই? সত্যি কথাতো বলতেই হবে। আজকে আমি এ ব্যাপারে এমন দুজন ব্যাক্তির কথাকে পেশ করবো যারা গায়রে মুকাল্লিদ ভাইদের কাছেও গ্রহনযোগ্য আলেম এবং তারাও এ দুজন ব্যাক্তিকে সালাফ মনে করেন।

এ দুই জন বিখ্যাত আলেম হলেন –

  • (১) আলী ইবনুল মাদিনী রহঃ , (ইমাম বুখারী রাহঃ এর বিশিষ্ট উস্তাদ) ।
  • (২) ইবনুল কাইউম জাওজী রহঃ , (ইবনে তাইমিয়া রাহঃ এর বিশিষ্ট ছাত্র) ।

 

এবার তাদের কথাগুলো বলি-

আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম (রহঃ) লিখেছেন,
والذين حفظت عنهم الفتوى من أصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم مائة ونيف وثلاثون نفسا ما بين رجل وامرأة وكان المكثرون منهم سبعة: عمر بن الخطاب وعلي بن أبي طالب وعبد الله بن مسعود وعائشة أم المؤمنين و زيد بن ثابت وعبد الله بن عباس وعبد الله بن عمر.

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহী ওসাল্লাম এর সাহাবীদের মধ্যে যাদের ফতোয়া সংরক্ষণ করা হয়েছে তাদের সংখ্যা  নারী-পুরুষ মিলিয়ে প্রায় একশ’ ত্রিশজন। এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ফতোয়া প্রদান করতেন সাতজন।

১.     উমর ইবনে খাত্তাব (রাঃ)
২.     আলী ইবনে আবী তালেব (রাঃ)
৩.     আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)
৪.     উম্মুল মু’মিনীন আয়েশা (রাঃ)
৫.     যায়দ ইবনে সাবেত (রাঃ)
৬.     আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ)
৭.     আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ)

একশ’ ত্রিশজন সাহাবীর মধ্যে যাদের ফতোয়ার সংখ্যা খুব বেশি নয় আবার খুব কমও নয়, অর্থাৎ যাদের ফতোয়ার সংখ্যা মাধ্যমিক স্তরের, তাদের সংখ্যা হল, তেরজন।

এ বিশজন ব্যতীত একশ’ ত্রিশজন সাহাবীর অবশিষ্ট সকলেই যে ফতোয়া প্রদান করেছেন, তার সংখ্যা খুবই কম। (ই’লামুল মুয়াক্বিয়ীন  আন রাবিক্ষল আলামিন, আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম (রহঃ), খণ্ড-১, পৃষ্ঠা-১২) ।

এখানে বিবেচনার বিষয় হল, কোথায় সোয়া লক্ষ আর কোথায় একশ-দু’শ সাহাবী! অবশিষ্ট সাহাবীরা তাহলে কী করেছেন? স্পষ্টতঃ অন্যান্য সাহাবীরা ফতোয়ার ক্ষেত্রে যে সমস্ত সাহাবী অভিজ্ঞ ছিলেন, তাদের অনুসরণ করেছেন র্অথাৎ মুজতাহীদ সাহাবীর তাকলদি করছেনে।

 

স্পষ্ট হয়ে গেলো প্রায় সকল সাহাবী মুকাল্লিদ ছিলেন।

 

 

এ সম্পর্কে ইমাম আলী ইবনুল মাদীনী রাহ.(১৬১ হি.-২৩৪ হি.)-এর বিবরণ  :

 

তিনি সাহাবায়ে কেরামের সময়ের তিনজন সাহাবীর মাযহাব বর্ননা করেছেন যাদের মাযহাব তরীকার  উপর আমল ফতওয়া জারি ছিল। এই তিন সাহাবীর শাগরিদগণ তাঁদের মত ও সিদ্ধান্তগুলো সংরক্ষণ করেছেন, তা প্রচার প্রসার করেছেন।

যে তিন সাহাবীর মাযহাব ছিলো প্রচলিত ছিলো আর অন্য সাহাবীরা সেই মাযহাবের অনুশরণ করতেন  তারা হলেন

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. (মৃত্যু : ৩২ হিজরী),

যায়েদ ইবনে ছাবিত রা. (জন্ম : হিজরতপূর্ব ১১ ও মৃত্যু : ৪৫ হিজরী) ও

আবদুল্লাহ ইবনে আববাস রা. (জন্ম : হিজরতপূর্ব ৩ ও মৃত্যু : ৬৮ হিজরী)।

 

আলী ইবনুল মাদীনী রাহ.এর আরবী বাক্যটি নিমণরূপ-

ولم يكن في أصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم من له صُحَيْبَةٌ، يذهبون مذهبه، ويفتون بفتواه ويسلكون طريقته، إلا ثلاثة : عبد الله بن مسعود وزيد بن ثابت وعبد الله بن عباس رضي الله عنهم، فإن لكل منهم أصحابا يقومون بقوله ويفتون الناس.

 

এরপর আলী ইবনুল মাদীনী রাহ. তাঁদের প্রত্যেকের মাযহাবের অনুসারী ও তাঁদের মাযহাব মোতাবেক ফতওয়া দানকারী ফকীহ তাবেয়ীগণের নাম উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন,

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.-এর যে শাগরিদগণ তাঁর কিরাত অনুযায়ী মানুষকে কুরআন শেখাতেন, তাঁর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মানুষকে ফতওয়া দিতেন এবং তাঁর মাযহাব অনুসরণ করতেন তারা হলেন এই ছয়জন মনীষী :

  • আলকামাহ (মৃত্যু : ৬২ হিজরী),
  • আসওয়াদ (মৃত্যু : ৭৫ হিজরী),
  • মাসরূক (মৃত্যু : ৬২ হিজরী),
  • আবীদাহ (মৃত্যু : ৭২ হিজরী),
  • আমর ইবনে শুরাহবীল (মৃত্যু : ৬৩ হিজরী) ও
  • হারিস ইবনে কাইস (মৃত্যু : ৬৩ হিজরী)।

ইবনুল মাদীনী রাহ. বলেছেন, ইবরাহীম নাখায়ী রাহ. (৪৬-৯৬ হিজরী) এই ছয়জনের নাম উল্লেখ করেছেন।

ইমাম আলী ইবনুল মাদীনী রাহ.-এর উপরোক্ত বিবরণের সংশ্লিষ্ট  আরবী পাঠ নিমণরূপ-

الذين يقرؤن الناس بقراءته ويفتونهم بقوله وبذهبون مذهبه …

 

এরপর আলী ইবনুল মাদীনী রাহ. লিখেছেন, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.-এর (ফকীহ) শাগরিদদের সম্পর্কে এবং তাঁদের মাযহাবের বিষয়ে সবচেয়ে বিজ্ঞ ছিলেন ইবরাহীম (নাখায়ী) (৪৬-৯৬ হিজরী) এবং আমের ইবনে শারাহীল শাবী (১৯-১০৩ হিজরী)। তবে শাবী মাসরূক রাহ.-এর মাযহাব অনুসরণ করতেন।

আরবী পাঠ নিমণরূপ-

وكان أعلم أهل الكوفة بأصحاب عبد الله ومذهبهم إبراهيم والشعبي إلا أن الشعبي كان يذهب مذهب مسروق.

 

এরপর লিখেছেন-

وكان أصحاب زيد بن ثابت الذين يذهبون مذهبه في الفقه ويقومون بقوله هؤلاء الاثنى عشر …

অর্থাৎ যায়েদ ইবনে ছাবিত রা.-এর যে শাগরিদগণ তাঁর মাযহাবের অনুসারী ছিলেন এবং তাঁর মত ও সিদ্ধান্তসমূহ সংরক্ষণ ও প্রচার প্রসার করতেন তাঁরা বারো জন।

তাঁদের নাম উল্লেখ করার পর ইবনুল মাদীনী রাহ. লেখেন, এই বারো মনীষী ও তাদের মাযহাবের বিষয়ে সবচেয়ে বিজ্ঞ ছিলেন-

  • ইবনে শিহাব যুহরী (৫৮-১২৪ হিজরী),
  • ইয়াহইয়া ইবনে সায়ীদ আনসারী (মৃত্যু : ১৪৩ হিজরী),
  • আবুয যিনাদ (৬৫-১৩১ হিজরী) এবং
  • আবু বকর ইবনে হাযম (মৃত্যু ১২০ হিজরী)।
  • এদের পরে ইমাম মালেক ইবনে আনাস রাহ. (৯৩-১৭৯ হিজরী)।

 

এরপর ইবনুল মাদীনী রাহ. বলেছেন-

‘তদ্রূপ আবদুল্লাহ ইবনে আববাস রা.-এর যে শাগরিদগণ তাঁর মত ও সিদ্ধান্তসমূহ সংরক্ষণ ও প্রচার করতেন, সে অনুযায়ী ফতওয়া দিতেন এবং তার অনুসরণ করতেন, তাঁরা ছয়জন।

وكما أن أصحاب ابن عباس ستة الذين يقومون بقوله ويفتون به ويذهبون مذهبه.

এরপর তিনি তঁদের নাম উল্লেখ করেন।

 

ইমাম ইবনুল মাদীনী রাহ.-এর পূর্ণ আলোচনা তাঁর ‘কিতাবুল ইলালে’ (পৃষ্ঠা : ১০৭-১৩৫, প্রকাশ : দারুবনিল জাওযী রিয়ায, ১৪৩০ হিজরী।) বিদ্যমান আছে এবং ইমাম বায়হাকী রাহ.-এর ‘আলমাদখাল ইলাস সুনানিল কুবরা’তেও (পৃষ্ঠা : ১৬৪-১৬৫) সনদসহ উল্লেখিত হয়েছে।

 

সুতরাং মনে রাখতে হবে, ইমামগণের ফিকহী মাযহাবের যে মতপার্থক্য তাকে বিভেদ মনে করা অন্যায় ও বাস্তবতার বিকৃতি এবং সাহাবায়ে কেরামের নীতি ও ইজমার বিরোধিতা। আর এ পার্থক্যের বাহানায় মাযহাব অনুসারীদের থেকে আলাদা হয়ে তাদের নিন্দা-সমালোচনা করা সরাসরি বিচ্ছিন্নতা, যা দ্বীনের বিষয়ে বিভেদের অন্তর্ভুক্ত।

 

এই নোটটি লিখার ক্ষেত্রে আমি আমার প্রিয় শ্রদ্ধেয় শায়েখ আব্দুল মালেক সাহেব দা,বা এর “উম্মতের ঐক্য পথ ও পন্থা” কিতাব ও প্রিয় বন্ধুবর শ্রদ্ধেয় আলেম ইজহারুল ইসলাম এর “মাযহাব প্রসঙ্গে ডাঃ জাকির নায়েক” কিতাবে রসহযোগিতা নিয়েছি। আল্লাহ তাদের জাজায়ে খায়ের নসিব করেন আর উম্মতের খেদমতে তাদের কলমকে বরকতে পরিপূর্ণ করে দিক।-আমিন।

Print Friendly