মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেব হাফিযাহুল্লাহ এর ”উম্মতের ঐক্য পথ ও পন্থা ” থেকে সংগ্রহিত।

অনেকে মনে করেন, অধিকাংশ বিষয়ে মতভিন্নতার মৌলিক কারণ হল, সংশ্লিষ্ট বিষয়ের প্রতিপক্ষের হাদীস সম্পর্কে অবহিত না থাকা বা সহীহ হাদীস পরিত্যাগ করে যুক্তি বা কিয়াসের আশ্রয় গ্রহণ করা। অথচ আইম্মায়ে দ্বীন ও উলামায়ে হকের যে মতভিন্নতা সে সম্পর্কে এ ধারণা মোটেও সঠিক নয়। কেননা তাদের কেউ কিয়াস বা যুক্তিকে হাদীসের উপর প্রাধান্য দেন না। তাদের কোনো কোনো ফতওয়া যদিও সংশ্লিষ্ট বিষয়ের হাদীসের ব্যাপারে অবগতি না থাকার কারণে প্রকাশিত হয়েছে, কিন্তু এর সংখ্যা নিতান্তই কম।

আহলে হক উলামায়ে কেরামের মধ্যে বিদ্যমান মতভিন্নতার অধিকাংশের মূলেই ইখতিলাফে মাহমুদ বা ইখতিলাফে মাশরূ-এর শরীয়ত স্বীকৃত বাস্তবিক কারণ বিদ্যমান রয়েছে। এজন্য হাদীসের ইমামগণের মধ্যেও বহু বিষয়ে ইখতিলাফ হয়েছে। ইমাম আহমদ, ইমাম আলী ইবনুল মাদীনী, ইসহাক ইবনে রাহুয়াহ, ইমাম বুখারী, ইমাম মুসলিম, ইমাম তিরমিযী, ইবনে খুযাইমা, ইবনে হিববান, দাউদ জাহেরী, ইবনে হাযম জাহেরী তাদের ব্যাপারে হাদীসের বিরোধিতা বা হাদীসের ব্যাপারে অনবগতির অভিযোগ কি কেউ করতে পারে?

শুধু তাই নয়, পরবর্তী যুগের এবং বর্তমানের ঐসব আলেমের মধ্যেও ইখতিলাফ হয়েছে, যারা আহলে হাদীস বা সালাফী নামে পরিচিত। এদের ব্যাপারে সকল আহলে হাদীস বা সালাফী বন্ধু একমত যে, এরা সবাই হাদীসবিশারদ এবং হাদীসের অনুসারী ছিলেন। তাঁদের মতপার্থক্যের কিছু উদাহরণ তুলে ধরছি।

প্রথম উদাহরণ

মিসরের প্রসিদ্ধ শায়খ সাইয়েদ সাবেক রাহ. (১৩৩৩-১৪২৫ হি.) ‘ফিকহুস সুন্নাহ’ নামে একটি বেশ বড়, সহজ ও ভালো কিতাব রচনা করেছেন-আল্লাহ তাআলা তাকে উত্তম বিনিময় দান করুন-যা মাশাআল্লাহ নতুন প্রজন্মের মাঝে খুবই প্রসিদ্ধ ও সমাদৃত। অনেক তরুণ-যুবক এটিকে মুতাওয়ারাছ ফিকহী কিতাবের উত্তম বিকল্প মনে করে বরণ করে নিয়েছে! তাফাক্কুহ ফিদ দ্বীনের স্বল্পতার কারণে অনেকে এমনও মনে করে যে, ফিকহের কিতাবগুলোতে আছে ইমামদের ফিকহ আর এই কিতাবে আছে হাদীস ও সুন্নাহর ফিকহ! অথচ মূল বিষয় এই যে, হাদীস ও সুন্নাহর ফিকহ সেটাও এবং এটাও। পার্থক্য শুধু এই যে, এখানে ফকীহ ও লেখক হলেন শায়খ সাইয়েদ সাবেক আর ওখানে ফকীহ হলেন খায়রুল কুরূন বা তার নিকটতম যুগের মুজতাহিদ ইমাম আর লেখক হলেন পরবর্তী সময়ের কোনো ফকীহ বা আলেম।

যাই হোক, আমি যা বলতে চাই তা হচ্ছে, এ কিতাবের শুরুতে লেখক লেখেন-
أما بعد! فهذا الكتاب “فقه السنة” يتناول مسائل من الفقه الإسلامي مقرونة بأدلتها من صريح الكتاب وصحيح السنة، ومما أجمعت عليه الأمة …
والكتاب في مجلداته مجتمعة يعطي صورة صحيحة للفقه الإسلامي الذي بعث الله به محمدا صلى الله عليه وسلم، ويفتح للناس باب الفهم عن الله وعن رسوله، ويجمعهم على الكتاب والسنة، ويقضي على الخلاف وبدعة التعصب للمذاهب، كما يقضي على الخرافة القائلة : بأن باب الاجتهاد قدسد.
উপরোক্ত কথায় যে চিন্তাগত বিচ্ছিন্নতা রয়েছে সে সম্পর্কে আলোচনায় না গিয়ে শুধু এটুকু বলছি যে, তাঁর দাবি, এই কিতাবের মাসআলাগুলো সরাসরি কুরআনের আয়াত, সহীহ সুন্নাহ ও ইজমায়ে উম্মাহর দলিলনির্ভর।
এ কিতাবটি যখন বর্তমান যুগের একজন প্রসিদ্ধ আলেম শায়খ নাসিরুদ্দীন আলবানী রাহ. (১৩৩২-১৪২০ হি.)-এর সামনে এল, যিনি চিন্তা-চেতনায় সাইয়েদ সাবেকের থেকে আলাদা নন, একই ঘরানার। শায়খ আলবানীর কিতাবাদি; বিশেষত ‘ছিফাতুস সালাহ’র ভূমিকা পাঠ করলেই তা বোঝা যাবে। তিনি যখন এই কিতাবটি অধ্যয়ন করলেন তখন এর উপর টীকা লেখার প্রয়োজন অনুভব করলেন এবং ‘তামামুল মিন্নাহ ফিততালীকি আলা ফিকহিস সুন্নাহ’ নামে তা লিখলেন। পৃষ্ঠাসংখ্যা চার শরও অধিক। এর পঞ্চম সংস্করণ (১৪২৬ হি.) আমার সংগ্রহে আছে।
এতে তিনি ফিকহুস সুন্নাহর মাত্র সিয়াম অধ্যায়-পর্যন্ত টীকা লিখেছেন, যা মূল কিতাবের চার ভাগের এক ভাগ। ১ রজব ১৪০৮ হিজরীর তথ্য অনুযায়ী তিনি শুধু এটুকুরই টীকা লিখতে পেরেছেন। অবশিষ্ট অংশের টীকা লেখার জন্য দুআ করেছেন।

শায়খ আলবানী রাহ. ‘তামামুল মিন্নাহ’র ভূমিকায় ‘ফিকহুস সুন্নাহ’র ভুল-ত্রুটির প্রকার সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত সূচি উল্লেখ করেছেন, যাতে চৌদ্দটি প্রকার রয়েছে। নিমেণ তার কিছু উল্লেখ করা হল :

১. সাইয়েদ সাবেক অসংখ্য যয়ীফ হাদীস সম্পর্কে নীরব থেকেছেন।
২. অন্যদিকে অনেক ‘ওয়াহী’ (মারাত্মক যয়ীফ) হাদীসকে শক্তিশালী বলেছেন।
৩. কিছু হাদীসকে যয়ীফ বলেছেন, অথচ তা সহীহ।
৪. সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের উদ্ধৃতিতে হাদীস উল্লেখ করেছেন অথচ তাতে সে হাদীস নেই।
৫. এমন কিছু হাদীস উল্লেখ করেছেন, যা হাদীসের কোনো কিতাবেই নেই।
৬. যাচাই বাছাই ছাড়া কোনো কিতাবের উদ্ধৃতিতে কোনো হাদীস উল্লেখ করেছেন অথচ খোদ ঐ কিতাবের লেখকই তাতে হাদীসটি সম্পর্কে এমন মন্তব্য করেছেন, যা তার সহীহ হওয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
৭. কখনো কখনো দলিল ছাড়া মাসআলা উল্লেখ করেছেন, কখনো কিয়াসের ভিত্তিতে মাসআলা প্রমাণ করেছেন। অথচ সে বিষয়ে সহীহ হাদীস বিদ্যমান। আবার কখনো সাধারণ দলিল উল্লেখ করেছেন, অথচ সেই মাসআলার সুনির্দিষ্ট দলিল রয়েছে।
৮. কখনো কখনো এমন মত বা সিদ্ধান্তকে প্রাধান্য দিয়েছেন, যার প্রমাণ দুর্বল। অথচ বিপরীত মতটির দলিল শক্তিশালী।
৯. সবচেয়ে আপত্তিকর কাজ এই যে, যে কিতাব সুন্নাহ মোতাবেক আমলের প্রতি দাওয়াত দেওয়ার জন্য লেখা হয়েছে তাতে এমন অনেক মাসআলা আছে, যা সহীহ হাদীসের বিপরীত। অথচ ঐ সহীহ হাদীসগুলোর বিরোধী কোনো হাদীসও নেই।

শায়খ আলবানী রাহ.-এর সব আপত্তি সঠিক নাও হতে পারে। তবে তার গবেষণা ও বিশ্লেষণ অনুযায়ী তো ‘ফিকহুস সুন্নাহ’য় এ ধরনের অনেক ভুল রয়েছে।
তামামুল মিন্নাহ প্রকাশিত হওয়ার পরও শায়খ সাইয়েদ সাবেক রাহ. দীর্ঘ সময় জীবিত ছিলেন। কিন্তু দু’/চারটি স্থান ব্যতীত তিনি ‘ফিকহুস সুন্নাহ’য় কোনো পরিবর্তন করেননি। এর দ্বারা বোঝা যায়, তার দৃষ্টিতে শায়খ আলবানী রাহ.-এর এই আপত্তিগুলো সঠিক নয়। কিংবা তা গ্রহণ করা অপরিহার্য নয়।
এই দুই ব্যক্তিত্বের কেউই হানাফী নন। অন্য কোনো মাযহাবেরও অনুসারী নন। তারা ছিলেন (অনুসৃত ফিকহের সাহায্য ছাড়াই সরাসরি) সুন্নাহর অনুসরণ ও হাদীস অনুযায়ী আমলের প্রতি আহবানকারী নিষ্ঠাবান দুই ব্যক্তি। দুজনই ছিলেন হাদীসের আলেম এবং নির্ঘণ্ট ও কম্পিউটার যুগের আলেম। তারা উভয়েই উম্মতের সামনে (তাদের ভাষায়) ‘ফিকহুল মাযাহিব’-এর স্থলে ‘ফিকহুস সুন্নাহ’ পেশ করতে চেয়েছেন।
প্রশ্ন এই যে, ফিকহি মতভিন্নতার প্রধান কারণ যদি শুধু এই হয় যে, যাদের মাঝে মতভিন্নতা হয়েছে তাদের একজন হয়তো হাদীস জানতেন না কিংবা হাদীস মানতেন না, অন্তত ঐ মাসআলার হাদীসটি তিনি জানতেন না তাহলে এই দুই শায়খের মাঝে এত বড় বড় এবং এত অধিক মাসআলায় মতভেদ কেন হল?

দ্বিতীয় উদাহরণ

সম্প্রতি ১৪৩০ হি., মোতাবেক ২০০৯ ঈ. সালে ড. সাদ ইবনে আবদুল্লাহ আলবারীকের দুই খন্ডের একটি কিতাব প্রকাশিত হয়েছে, যার নাম
الإيجاز في بعض ما اختلف فيه الألباني وابن عثيمين وابن باز رحمهم الله تعالى
কিতাবটির পৃষ্ঠা সংখ্যা ৮ শ’র অধিক।
কিতাবটির নাম থেকেই বোঝা যায়, এই কিতাবে তিনি এমন কিছু মাসআলা উল্লেখ করেছেন, যেসব মাসআলায় এ যুগের তিনজন সম্মানিত সালাফী আলেম : শায়খ আবদুল আযীয বিন আবদুল্লাহ বিন বায রাহ. (১৩৩০-১৪২০ হি.), শায়খ মুহাম্মাদ ইবনে সালেহ ইবনে উছাইমীন রাহ. (১৪২১ হি.) ও শায়খ (মুহাম্মাদ ইবনে নূহ) নাসিরুদ্দীন আলবানী রাহ. (১৩৩২-১৪২০ হি.)-এর মাঝে মতভেদ হয়েছে।
কিতাবের নাম থেকে এ বিষয়টিও স্পষ্ট যে, তিনজনের মাঝে যেসব মাসআলায় মতপার্থক্য হয়েছে তার সবগুলো লেখক এখানে উল্লেখ করেননি। তাছাড়া তিনি শুধু ‘কিতাবুর রাযাআ’ দুগ্ধপান অধ্যায় পর্যন্ত মাসআলাগুলো এখানে এনেছেন। এরপরও এতে মাসআলার মোট সংখ্যা দঁড়িয়েছে ১৬৬। আকীদা সংক্রান্ত কিছু মাসআলাও এতে রয়েছে, যেগুলো আকীদার মৌলিক নয়, শাখাগত মাসআলা এবং যার কিছু নমুনা উদ্ধৃতিসহ
البشارة والإتحاف بما بين ابن تيمية والألباني في العقيدة من الاختلاف
নামক পুস্তিকায়ও রয়েছে।
জেনে রাখা দরকার যে, ‘আলইজায’ কিতাবে ‘মাসাইলুল ইজতিহাদে’র উভয় প্রকারের মাসআলাই উল্লেখিত হয়েছে। অর্থাৎ কিছু মাসআলা এমন, যার কোনো শরঈ নস নেই অথবা শরঈ নস পাওয়া গেলেও তা থেকে সংশ্লিষ্ট মাসআলার বিধান আহরণ করতে হলে ইজতিহাদ প্রয়োজন।

তৃতীয় উদাহরণ

ড. বকর ইবনে আবদুল্লাহ আবু যায়েদ রিয়ায-এর পুস্তিকা ‘লা-জাদীদা ফী আহকামিস সালাহ’। ইন্টারনেট সংস্করণ (তৃতীয় সংস্করণ) অনুযায়ী এতে তিনি নামাযের এমন আটটি মাসআলা উল্লেখ করেছেন, যে সম্পর্কে কিছু সালাফী আলেমের ফতওয়া বা আমল তার দৃষ্টিতে প্রমাণহীন ও সুন্নাহবিরোধী।

চতুর্থ উদাহরণ

ড. ইউসুফ কারযাবী-হাফিযাহুল্লাহু তাআলা ওয়া রাআহু-এর কিতাব ‘আলহালাল ওয়াল হারাম ফিলইসলাম’-এর সাথে ড. সালেহ ফাওযানের পুস্তিকা ‘আলই’লাম বিনাকদি কিতাবিল হালালি ওয়াল হারাম’ এবং শায়খ আলবানী রাহ.-এর কিতাব ‘গায়াতুল মারাম ফী তাখরজি আহাদীসিল হালালি ওয়াল হারাম’ অধ্যয়ন করা যেতে পারে।

Print Friendly