খতীব বাগদাদী (রহঃ) “ আল-ফকীহ ও য়াল মুতাফাক্কিহ” নামক কিতাবে লেখেছেন,

قيل لبعض الحكماء : إن فلانا جمع كتبا كثيرة! فقال : هل فهمه علي قدر كتبه؟ قيل : لا، قال فما صنع شئا، ما تصنع البهيمة بالعلم.

কোন এক বিজ্ঞজনকে বলা হল, অমুক ব্যক্তি অনেক কিতাব সংগ্রহ করেছে। তিনি তাকে বললেন, তার বুঝ কি তার সংগৃহীত কিতাবের সমান? লোকটি উত্তর দিল, না। তখন তিনি বললেন, প্রকৃতপক্ষে সে কিছুই করেনি। চুতষ্পদ জন্তু ইলেম দিয়ে কী করবে!

অর্থাৎ বুঝ অর্জন না করে, কিতাব সংগ্রহ করা আর একটি জন্তুর নিকট অনেক কিতাব থাকা সমান।

সুতরাং কিতাব সংগ্রহের নাম ইলম নয়। কারও নিকট অধিক হাদীস থাকার কারণে সে যদি বড় হালেম হয়ে যেত, তবে যার নিকট এক ডিস্কের মধ্যে সমস্ত হাদীসের কিতাব রয়েছে, সেই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আলেম হয়ে যেত। চল্লিশ টাকার একটা ডিস্ক সংগ্রহ করা, আর ইলমের পিছে চল্লিশ বৎসর সাধনা করা এক জিনিস নয়। সুতরাং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতির দোহাই দিয়ে একথা বলা যথেষ্ঠ নয় যে, আমার নিকট এক মিলিয়ন হাদীসের একটি ডিস্ক আছে, সুতরাং কাউকে অনুসরণের প্রয়োজনীয়তা নেই। বিষয়টি যদি এমনই হত, তবে পৃথিবীর যে কেউ ডিস্ক সংগ্রহ করবে, সেই স্বয়ংসম্পূর্ণ আলেম হয়ে যাবে।

খতীব বাগদাদী (রহঃ) ইয়াহইয়া ইবনে মুইন (রহঃ) এর উক্তি বর্ণনা করেছেন, তাঁকে জিজ্ঞেস করা হল,

কেউ যদি এক লক্ষ হাদীস মুখস্থ করে, তবে কি সে ফতওয়া দিতে পারবে? তিনি উত্তর দিলেন, না। পুনরায় প্রশ্ন করা হল, দু’লক্ষ হাদীস মুখস্থ করলে কি ফতোয়া দিতে পারবে? তিনি বললেন, না। পুনরায় প্রশ্ন করা হল, যদি তিন লক্ষ হাদীস মুখস্থ করে? তিনি উত্তর দিলেন, না। চার লক্ষ? তিনি বললেন, না?। যদি পাঁচ লক্ষ হাদীস মুখস্থ করে? তিনি উত্তর দিলেন, আশা করা যায়।

খতীবে বাগদাদী (রহঃ) এ উক্তি বর্ণনা করে বলেছেন, পাঁচ লক্ষ হাদীস শুধু মুখস্থ করাটাই উদ্দেশ্য নয়। বরং প্রত্যেকটি হাদীসের মর্ম উপলব্ধি করা এবং সে সম্পর্কে ব্যুৎপত্তি অর্জন করা আবশ্যক। তিনি লিখেছেন,

وليس يكفيه إذا نصب نفسه للفتيا أن يجمع في الكتب ما ذكره-يحي بن معين-دون معرفته به و نظره فيه، و إتقانه له، فإن العلم هو الفهم و الدراية و ليس با لإكثار و التوسع في الرواية

“কারও পক্ষে নিজেকে ফতোয়ার আসনে সমাসীন করার জন্য ইয়াহ্ইয়া ইবনে মুঈন (রহঃ) যে পরিমাণ হাদীসের কথা বলেছেন, সেগুলো সম্পর্কে ব্যুৎপত্তি অর্জন এবং তীক্ষ্ম জ্ঞান অর্জন ব্যতীত তা সংগ্রহ করাটাই যথেষ্ঠ নয়। কেননা ইলম হল, প্রকৃত বুঝ ও ব্যুৎপত্তি অর্জনের নাম। অধিক সংখ্যক হাদীস বর্ণনা করার নাম ইলম নয়”

[আল-জামে, খণ্ড-২, পৃষ্ঠা-১৭৪]

সুতরাং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতির দোহাই দিয়ে শুধু হাদীস সংগ্রহ করাটা ইসলামের উদ্দেশ্য নয়। আর কেউ যদি অনেক হাদীস সংগ্রহ করেও, তবুও কি সে সরাসরি কুরআন ও হাদীসের উপর আমর করতে সক্ষম হবে? ইজতেহাদের অন্যান্য যে সমস্ত শর্ত রয়েছে সেগুলো অর্জন করা আবশ্যক নয় কি?

বোখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত আছে, নবী কারীম (সঃ) বলেছেন,

إنَّ الله لا يقبض العلم انتزاعاً ينتزعه من العباد ، ولكن يقبض العلم بقبض العلماء حتَّى إذا لم يُبق عالماً اتخذ الناس رؤوساً جهَّالاً فسئلوا فأفتوا بغير علم فضلُّوا وأضلُّوا

“আল্লাহ্ তায়ালা ইল্মকে তার বান্দাদের থেকে উঠিয়ে নেবেন না। বরং তিনি আলেমদেরকে উঠানোর মাধ্যমে ইলম উঠিয়ে নেবেন। এমনকি একসময় কোন আলেমই অবশিষ্ট থাকবে না। মানুষ তখন অজ্ঞ-মুর্খ লোকদের নিকট প্রশ্ন করবে, তারা ইলম ব্যতীত ফতোয়া দিবে। ফলে তারাও পথভ্রষ্ট হবে, অন্যদেরকেও পথভ্রষ্ট করবে।

[বোখারী শরীফ, হাদীস নং ৬৮৭৭, ১০০মুসলিম হাদীস নং২৬৭৩]

এ হাদীসে রাসূল (সঃ) সুস্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছেন যে, ইলমের অস্তিত্ব নির্ভর করে উলামাদের অস্তিত্বের উপর। আলেম এবং ইলম পরস্পর ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সুতরাং ইলমকে টেকনোলজির অনুগামী মনে করা কতটা যুক্তিসঙ্গত?

ইমাম আবু হাইয়্যান উন্দুলুসী (রহঃ) বলেছেন,

يظن الغمر ان الكتب تهدي … اخا جهل لادراك العلوم و لا يدري الجهول بان فيها …غوامض حيرت عقل الفهيم

ا ذا رمت العلوم بغير شيخ…ضللت عن الصراط المستقيم

“মূর্খ, অনভিজ্ঞ লোক মনে করে থাকে যে, কিতাব তাকে ইলম অর্জনে পথ প্রদর্শন করবে।কিন্তু মূর্খ লোকেরা জানে না যে, তাতে এমন দুর্বোধ্য বিষয় থাকে যে, তীক্ষ্ম-বুদ্ধিসম্পন্ন লোকও বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। যদি তুমি উস্তাদ ব্যতীত ইলম অর্জন করো, তুমি সরল সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়বে”

হাফেযে হাদীস আবু বকর খতীবে বাগদাদী (রহঃ) বলেন,

لا يؤخذ العلم الا من افواه العلماء ..فلابد من تعلم امور الدين من عارف ثقه اخذ عن ثقه وهكذا الي الصحابه فالذي ياخذ الحديث من الكتب يسمي صحافيا. والذي ياخذ القرأن من المصحف يسمي مصحفيا ولا يسمي قارئا.

“আলেমদের থেকে শ্রবণ ব্যতীত ইলম শিক্ষা করা যায় না। সুতরাং ইলম অর্জনের পথে এমন একজন বিশ্বস্ত আলেম থেকে ইলম অর্জন করতে হবে, যিনি আরেকজন সিকা (বিশ্বস্ত) আলেম থেকে ইলম অর্জন করেছেন, এভাবে সাহাবীদের পর্যন্ত ইলমের ধারা পেীঁছে যাবে। যে ব্যক্তি কিতাব পড়ে, হাদীস গ্রহণ করে তাকে “সাহাফী” বলা হয়। (তাকে মুহাদ্দিস বলা হয় না)। আর যে ব্যক্তি মাসহাফ থেকে কুরআন গ্রহণ করে তাকে “মাসহাফী” বলা হয়, তাকে ক্বারী বলা হয় না।”

কামালুদ্দিন শামানী এর বিখ্যাত কবিতা-

من يأخذ العلم عن شيخ مشافهةً *** يكن من الزيف والتصحيف في حرمِ

ومن يكن آخذاً للعلم من صحف *** فعلمه عند أهل العلم كالعدم

“যে ব্যক্তি তাঁর শায়েখের নিকট থেকে সরাসরি ইলম শিক্ষা করে, সে বিকৃতি ও জালিয়াতি থেকে পবিত্র থাকে।

আর যে ব্যক্তি কিতাব পড়ে ইলম অর্জন করে, আলেমদের নিকট তার ইলম কোন ইলমই নয়”

কাজী শাওকানী  লিখেছেন,

إنَّ إنصاف الرجل لا يتمُّ حتَّى يأخذ كلَّ فنٍّ عن أهله كائناً ما كان

“কোন ব্যক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত ন্যায়-নিষ্ঠার উপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে জ্ঞানের প্রত্যেক শাখায় অভিজ্ঞ লোকদের কাছ থেকে জ্ঞান অর্জন করবে।”

কাজী শাওকানী  আরও বলেছেন,

وأمَّا إذا أخذ العلم عن غير أهله، ورجَّح ما يجده من الكلام لأهل العلم في فنون ليسوا من أهلها ، فإنَّه يخبط ويخلط

“আলেম যদি অযোগ্য লোকের কাছ থেকে ইলম শিক্ষা করে এবং জ্ঞানের সংশ্লিষ্ট শাখায় পারদর্শী নয় এমন লোকের বক্তব্যকে সে প্রাধান্য দেয়, তবে সে অনুমান নির্ভর এবং অবিমৃশ্যকারী।” [আদাবুত তলাব ও মুনতাহাল আরাব, পৃষ্ঠা-৭৬]

আল্লামা সাখাবী (রহঃ) লিখিত “আল-জাওয়াহিরু ওয়াদ দুরারু” নামক কিতাবে রয়েছে,

“من دخل في العلم وحده؛ خرج وحدَه”

“যে ব্যক্তি একাকী ইলমের পথে প্রবেশ করল, সে একাকী সেখান থেকে বের হয়ে গেল”

[আল জাওয়াহির ওয়াদ দুরার, খণ্ড-১, পৃষ্ঠা-৫৮]

Print Friendly