ইসলামে ফেকাহ শাস্ত্রের গুরুত্ব অপরিসীম। মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অধিকাংশ আমল ফেকাহশাস্ত্রের সাথে সম্পৃক্ত। মানুষের জন্ম থেকে কবরে কাফন সহ যাবতীয় আমল ফিকহ শাস্ত্রের উপর নির্ভর করে। ঈবাদত ছাড়াও লেন-দেন, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিচার ব্যবস্থা, অর্থনীতি, সমাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি এক কথায় একজন মুসলমানের জীবনের সর্বক্ষেত্রে ফিকহশাস্ত্রের গুরুত্ব অনস্বীকার্য।

ফিকহ শাস্ত্রের বিষয়গুলো এমন যে, এ ব্যাপারে গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন ব্যতীত কোন মতামত দেয়া নিতান্তই বোকামী। আর যারা এ বিষয়ে গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করেছেন, তাদেরক্ষেত্রেও দেখা যায়, এ বিষয়ে কোন মতামত দিতে গেলে খুবই সতর্কতা অবলম্বন করেছেন। রাসূল (সঃ) বলেছেন,

من قال علي ما لم أقل فليتبوأ بيتاً في جهنم ، ومن أُفتى بغير علم كان إثمه على من أفتاه ، ومن أشار على أخيه بأمر يعلم الرشد في غيره فقد خانه

“যে ব্যক্তি এমন কথা বলল, যা আমি বলিনি, তবে সে জাহান্নামে নিজের জন্য একটি ঘর তৈরি করল। আর যাকে ইলম ব্যতীত ফতোয়া প্রদান করা হল, এর গোনাহ ফতোয়া প্রদান কারীর উপর বর্তাবে। আর যে ব্যক্তি তার ভাইকে এমন বিষয়ে পরামর্শ দিল যার বিপরীত বিষয়ের মাঝে সে কল্যাণ দেখছে, তবে সে তার সাথে প্রতারণা করল”

[মুসনাদে আহমাদ, বাইহাকী শরীফ]

বিখ্যাত তাবেয়ী ইবনে আবী লাইলা (রহঃ) বলেছেন,

عن عبد الرحمن بن أبي ليلى قال: أدركت في هذا المسجد (مسجد رسول الله صلى الله عليه وسلم ) مائة وعشرين من أصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم ما منهم احد يسأل عن حديث أو فتيا إلاّ ودّ ان أخاه كفاه ذلك. وفي لفظ آخر: كانت المسالة تعرض على أحدهم فيردها إلى الآخر، ويردها الآخر حتى ترجع الى الذي سأل عنها أول مرة.

“তাবেয়ী আব্দুর রহমান ইবনে আবী লাইলা (রহঃ) বলেন, আমি এই মসজিদে (মসজিদে নববীতে) একশ বিশ জন সাহাবীর সাথে সাক্ষাৎ করেছি। তাদের কাউকে যখন কোন হাদীস বা ফতোয়া জিজ্ঞেস করা হত, প্রত্যেকেই পছন্দ করতেন, তাঁর আরেকভাই এর উত্তর প্রদানে যথেষ্ঠ।

তিনি অন্য বর্ণনায় বলেছেন,

“তাদের নিকট যখন মাসআলা পেশ করা হত, তখন সে আরেকজনের কাছে সেটা পাঠাত, অতঃপর তিনি আরেকজনকে জিজ্ঞেস করতে বলতেন, এভাবে অবশেষে প্রথমে যার নিকট প্রশ্ন করা হয়েছিল, তার নিকট ফিরে আসত”

হযরত আবু বকর এবং হযরত উমর (রাঃ) কোন সমস্যার মুখোমুখি হলে অন্যান্য সাহাবীদের  সাথে পরামর্শ করতেন এবং এ সম্পর্কে রাসূল (সঃ) এর পক্ষ থেকে কোন নির্দেশনা আছে কি না সেগুলো জিজ্ঞেস করতেন।

[আল-ইনসাফ, শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবী (রহঃ), পৃষ্ঠা-১৮]

হযরত উমর (রাঃ) কোন সমস্যার মুখোমুখি হলে, বদরী সাহাবীদেরকে একত্র করে তাদের সাথে পরামর্শ করে  সমাধান দিতেন।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেছেন,

إن كل من أفتى الناس في كل ما يسألونه عنه لمجنون”

“যে ব্যক্তি মানুষের সকল প্রশ্নের উত্তর দেয় এবং সকল বিষয়ে ফতোয়া প্রদান করে সে অবশ্যই পাগল”

এটি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকেও বর্ণিত আছে।

আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম (রহঃ) বলেছেন,

الجرأة على الفتيا تكون من قلة العلم ومن غزارته وسعته فإذا قل علمه أفتى عن كل ما يسأل عنه بغير علم

“ফতোয়া প্রদান করতে উদ্দত হওয়াটা কম ইলমের কারণেও হতে পারে আবার অধিক ইলমের কারণেও হতে পারে। অতএব যখন কারও ইলম কম থাকে, তখন তাকে যে বিষয়েই প্রশ্ন করা হয়, না জেনে সে সকল বিষয়ে সমাধান দেয়।

তাবেয়ী মুহাম্মাদ বিন সিরিন (রহঃ) বলেন-

لأن يموت الرجل جاهلاً خير له من أن يقول بلا علم

“অজ্ঞতাবশতঃ কথা বলার চেয়ে কোন ব্যক্তির জন্য মূর্খ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করা শ্রেয়”

[আদাবুশ শরইয়্যাহ, আল্লামা ইবনু মুফলিহ্ (রহঃ), খ.২, পৃষ্ঠা-৬৫]

আল্লামা ইবনে ওহাব (রহঃ) বলেন,

وعن ابن  وهب قال : سمعت مالكاً يقول :وذكر قول القاسم : لأن يعيش الرجل جاهلاً خير له من أن يقول على الله مالا يعلم ، فقال مالك : هذا كلام ثقيل ثم ذكر مالك أبا بكر الصديق وما خصه الله به من الفضل وآتاه إياه قال مالك : يقول أبو بكر في ذلك الزمان : لا يدري ولا يقول هذا لا أدري قال : وسمعت مالك بن أنس رحمه الله يقول : من فقه العالم أن يقول لا أعلم فإنه عسى أن يهيأ له الخير

“অর্থাৎ আমি ইমাম মালেক (রহঃ) কে বলতে শুনেছি, তিনি কাসেম (রহঃ) এর উক্তি উল্লেখ করেছেন- “আল্লাহর ব্যাপারে অজ্ঞতাবশতঃ কোন কথা বলার চেয়ে কোন ব্যক্তির জন্য অজ্ঞ-মূর্খ থাকাটা অধিক শ্রেয়।” একথা উল্লেখ করে ইমাম মালেক (রহঃ) বলেন, এটি অনেক ভারী কথা। অতঃপর তিনি হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ) এর ফযিলত ও বৈশিষ্ট্য এবং বিশেষভাবে তাঁকে যে ইলম ও মর্যাদা দান করা হয়েছে, সেটি আলোচনা করলেন। অতঃপর বললেন, “হযরত আবু বকর (রাঃ) এর সময়ে তিনি বলতেন যে, “আমি জানি না”। কিন্তু বর্তমানে এরা কেউ বলে না যে, আমি জানি না।”

ইবনে ওহাব (রহঃ) বলেন, আমি ইমাম মালেক (রহঃ) কে বলতে শুনেছি, “বুদ্ধিমান আলেমের কর্তব্য হল সে যেন বলে দেয় যে, “আমি জানি না”। কেননা এর দ্বারা হয়ত তার জন্য উত্তম কোন বিষয়ের ব্যবস্থা করা হবে”

আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম (রহঃ) বলেন-

من أفتى الناس وليس بأهل للفتوى فهو آثم عاص ومن أقره من ولاة الأمور على ذلك فهو آثم أيضاً.

“যে ব্যক্তি মানুষকে ফতোয়া দেয়ার যোগ্য নায় হয়েও ফতোয়া প্রদান করল, সে গোনাহগার ও আল্লাহর অবাধ্য। এবং শাসকদের যারা তাকে তার এ কর্মের সমর্থন করবে তারাও গোনাহগার হবে”

[ই’লামুল মুয়াক্বিয়ীন, আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম (রহঃ), খণ্ড-৪, পৃষ্ঠা-১৬৬]

হযরত আবু ইসহাক (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

“كنت أرى الرجل في ذلك الزمان وإنه ليدخل يسأل عن الشيء فيدفعه الناس عن مجلس إلى مجلس حتى يدفع إلى مجلس سعيد بن المسيب كراهية للفتيا”

“আমি সেই যুগে দেখেছি, যখন এক ব্যক্তি কোন একটা বিষয়ে কাউকে জিজ্ঞেস করতো, তখন একজন আরেকজনের নিকট প্রেরণ করত। অবশেষে লোকটি সাইদ ইবনুল মুসাইয়্যিব (রঃ) এর মজলিশে এসে উপনীত হতো। ফতোয়া প্রদানে তাদের অপছন্দ থাকায় মানুষ তখন এটা করত,।

وعن مالك : قال أخبرني رجل أنه دخل على ربيعة بن أبي عبد الرحمن فوجده يبكي فقال له : ما يبكيك وارتاع لبكائه فقال له  : أمصيبة دخلت عليك ؟ فقال : لا ولكن أستفتي من لا علم له ، وظهر في الإسلام أمر عظيم قال ربيعة : وبعض من يفتي ههنا أحق بالسجن من السراق

হযরত ইমাম মালেক (রহঃ) থেকে বর্নিত তিনি বলেনে, আমাকে জনৈক ব্যক্তি সংবাদ দিয়েছে যে, সে হযরত রবীয়া ইবনে আবু আব্দুর রহমান (রহঃ) এর নিকট গিয়ে দেখল যে, তিনি ক্রন্দন করছেন। সে তাঁকে জিজ্ঞাসা করল, কি কারণে ক্রন্দন করছেন? আপনার উপর কি কোন মুসীবত আপতিত হয়েছে? রবীয়া ইবনে আবু আব্দুর রহমান উত্তর দিলেন, আমি অযোগ্য লোকের নিকট ফতোয়া জিজ্ঞেস করেছি। “ইসলামের মাঝে মারাত্মক একটি জিনিসের আবির্ভাব হয়েছে। তিনি বলেন- বর্তমানে যারা ফতোয়া দেয়, তাদের কেউ কেউ চোরদের চেয়েও বেশি জেলে আবদ্ধ থাকার যোগ্য”

রবিয়া ইবনে আবু আব্দুর রহমান মদীনার বিখ্যাত ফকীহ ছিলেন। এবং হাফেযে হাদীস ছিলেন। তাঁর নিকট থেকে ইমাম মালেক (রহঃ) ফিকহ শিখেছেন।  তিনি ১৩৬ হি: সনে মৃত্যু বরণ করেছেন। ইসলামের দ্বিতীয় শতকে যদি তিনি একথা বলে থাকেন, তবে আমাদের সময়ের অজ্ঞ-মূর্খদের যুগে কী বলা হবে?

এপ্রসঙ্গে আহমাদ বিন হামদান হারানী রহ. [মৃত্যু-৬৯৫ হিঃ]  লিখেছেন-

فكيف لو رأى ربيعة زماننا هذا وإقدام من لا علم عنده على الفتيا مع قلة خبرته وسوء سيرته وشؤم سريرته وإنما قصده السمعة والرياء ومماثلة الفضلاء والنبلاء والمشهورين المستورين والعلماء الراسخين والمتبحرين السابقين ومع هذا فهم ينهون فلا ينتهون وينبهون فلا ينتبهون قد أملي لهم بانعكاف الجهال عليهم وتركوا ما لهم  في ذلك وما عليهم ، فمن أقدم على ما ليس له أهلاً من فتيا أو قضاء أو تدريس أثم ، فإن أكثر منه وأصر واستمر فسق ولم يحل قبول قوله ولا فتياه ولا قضاؤه هذا حكم دين الإسلام ،

“যদি রবীয়া ইবনে আবু আব্দুর রহমান আমাদের এ সময়টি দেখতেন? তিনি যদি বর্তমান সময়ের অজ্ঞ লোকদের ফতোয়া প্রদানের অবস্থা প্রত্যক্ষ করতেন? নিজেদের অযোগ্যতা-অনভিজ্ঞতা, নিকৃষ্ট চারিত্রিক অবস্থা, অভ্যন্তরীণ কলুষতা, লৌকিকতা ও প্রশংসা-প্রিয়তা এবং পূর্ববর্তী গভীর পাণ্ডিত্যের অধিকারী যুগশ্রেষ্ঠ উলামায়ে কেরামের পথ থেকে বিচ্যুত থাকা সত্ত্বেও তাদের নিকট অজ্ঞ লোকদের ভিড় তাদেরকে জরাগ্রস্ত করেছে, ফলে তারা তাদের গ্রহণীয়-বর্জণীয় সকল বিষয় পরিত্যাগ করেছে; অথচ তাদেরকে নিষেধ করা সত্ত্বেও তারা নিবৃত্ত হয় না,  তাদেরকে সতর্ক করা সত্ত্বেও তারা সতর্ক হয় না। সুতরাং কেউ ফতোয়া, বিচার কিংবা পাঠদানের যোগ্য না হয়েও যদি সে কাজে অগ্রসর হয়, তবে সে গোনাহগার হবে। এধরণের বিষয় যদি তার নিকট থেকে বারংবার প্রকাশ পেতে থাকে অথবা সে যদি এর উপর অটল থাকে, তবে সে ফাসেক হয়ে যাবে। এধরণের ব্যক্তির কোন কথা, ফতোয়া এবং কোন ফয়সালা গ্রহণ করা জায়েয নয়। এটি ইসলামের শাশ্বত বিধান।”

[সিফাতুল ফাতাওয়া, পৃষ্ঠা-১১-১২]

আহমাদ ইবনে হামদান রহ. মৃত্যুবরণ করেছেন-৬৯৫ হি: সনে। অর্থাৎ এখন থেকে সাত শ’ বছর পূর্বে তিনি একথাগুলো বলেছেন। সুতরাং বর্তমান যুগের যে কী করুণ অবস্থা তা সহজেই অনুমেয়।

তাবেয়ী মুহাম্মাদ ইবনে সিরিন (রহঃ) বলেন,

“قال حذيفة: إنما يفتي الناس أحد ثلاثة رجل يعلم ناسخ القرآن ومنسوخه وأمير لا يجد بدا وأحمق متكلف” قال ابن سيرين: فأنا لست أحد هذين وأرجو أن لا أكون أحمق متكلفا”.

হযরত হুযাইফা (রাঃ) বলেন, মানুষকে ফতোয়া প্রদান করে তিন ব্যক্তির কোন এক ব্যক্তি-

১.    কুরআনের নাসেখ-মানসুখ সম্পর্কে অবগত ব্যক্তি।

২.    ফতোয়া প্রদানে বাধ্য আমীর বা শাসক।

৩.    অথবা নিরেট মূর্খ লোক।

মুহাম্মদ ইবনে সিরিন (রহঃ) বলেন, আমি প্রথম দু’শ্রেণীর অন্তর্ভূক্ত নই। সুতরাং আমি তৃতীয় ব্যক্তি হতে চাই না।

পূর্ববর্তী বুযুর্গদের স্বভাব ছিল, যখন তাদেরকে কোন ফতোয়া জিজ্ঞেস করা হতো, তারা যদি এর সুস্পষ্ট উত্তর জানতেন, তখন তা বলে দিতেন। কিন্তু যদি এ বিষয়ে কোন উত্তর জানা না থাকত, সাথে সাথে বলে দিতেন, আমি জানি না। আর যদি একই প্রশ্নের বিভিন্ন উত্তরের সম্ভাবনা থাকত, তখন তারা  বলতেন, এটি আমার নিকট পছন্দনীয়। আমার নিকট এটি ভাল মনে হয়। যেমন ইমাম মালেক (রহঃ) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি ফতোয়া প্রদান করলে অনেক সময় বলতেন,

إن نظنُّ إلاَّ ظنَّاً وما نحن بمستيقنين

“আমি শুধু ধারণাই রাখি, এ ব্যাপারে সুনিশ্চিত নই”

১.    হযরত আলী (রাঃ) বলেন,

وابردها على الكبد إذا سئل أحدكم عمَّا لا يعلم ، أن يقول : الله أعلم [تعظيم الفتيا لابن الجوزي/৮১

“আমার নিকট অধিক প্রশান্তিকর হল, তোমাদের নিকট কেউ যদি কোন প্রশ্ন করে, আর তোমরা সে সম্পর্কে না জেনে থাকো, তবে বলে দিবে, “আল্লাহই ভাল জানেন”

ইমাম মালেক (রহঃ) বলেন,

إني لأفكر في مسألة منذ بضع عشرة سنة ، فما اتَّفق لي فيها رأي إلى الآن

“আমি প্রায় দশ বছর যাবৎ একটি মাসআলা নিয়ে চিন্তা করছি, এখনও পর্যন্ত উক্ত মাসআলায় সমাধানে আসতে পারিনি।

তিনি আরও বলেন,

ربما وردت علي المسألة فأفكر فيها ليالي

“অনেক সময় আমার নিকট মাসআলা পেশ করা হয়, আমি রাতের পর রাত সেগুলো নিয়ে গবেষণা করি।”

এই হল, আমাদের পূর্ববর্তীদের অবস্থা। এটিকে বর্তমান অবস্থার সাথে একটু তুলনা করুন। টি.ভি, রেডিও, পত্র-পত্রিকা এবং বিভিন্ন টকশোতে অবাধে ফতোয়ার ছড়াছড়ি। প্রত্যেকের নিজের মত মতো ফতোয়া দিচ্ছে। যার যা মনে চাচ্ছে, শরীয়তের বিষয়ে অবলীলায় তা বলে দিচ্ছে। শরীয়ত যেন লা-ওয়ারিস সম্পদ!

আল্লামা ইবনে আবিদীন (রহঃ) উত্তম কথা বলেছেন-

لا تَحْسَبِ الفِقه تَمْراً أنْتَ آكِلُه     ***   لَنْ تَبْلُغِ الفِقْهَ حَتَّى تَلْعَقَ الصَبْرَا

“ফিকহ শাস্ত্রকে তুমি একটি খেজুর মনে করো না যে, তা মুখে পুরে খেয়ে ফেলবে। তুমি কখনও ফিকহ অর্জন করতে পারবে না, যতক্ষণ না তুমি ধৈর্য্য ধারণ ও অধ্যবসায় গ্রহণ করবে।”

তিনি বলেছেন-

إذ لو كان الفقه يحصل بمجرد القدرة على مراجعة المسألة من مظانها لكان أسهل شيء ولما احتاج إلى التفقه على أستاذ ماهر وفكر ثاقب باهر.

لَو كَانَ هَذَا العِلمُ يُدركُ بالمُنى مَا كُنْتَ تُبصِرُ في البَرِيِّةِ جَاهِلا

“কেননা কিতাব দেখে মাসআলা প্রদানের যোগ্যতার নাম যদি ফিকহ হত, তবে এটি সর্বাধিক সহজ বিষয় হত এবং এর জন্য কোন দক্ষ, অভিজ্ঞ এবং গভীর পাণ্ডিত্যের অধিকারী উস্তাদের সংস্পর্শের প্রয়োজন হত না।” “এই ইলম যদি এমনিতেই অর্জিত হত, তবে তুমি পৃথিবীতে কোন অজ্ঞ লোক দেখতে পেতে না।”

বর্তমানে অনেককে দেখা যায়, প্রশ্ন করার পূর্বেই উত্তর প্রদানে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। শরীয়তের বিষয়ে তাদের এ ধরণের সবজান্তা ভাব কখনও কাম্য নয়। তাদের ভাবখানা এমন যে, তারা জানে না, এমন কোন বিষয় পৃথিবীতে নেই। অথচ এ ব্যাপারে পূর্ববর্তীদের অবস্থা কী ছিল?

হযরত উকবা ইবনে মুসলিম (রহঃ) বলেন-

وعن عقبة بن مسلم قال : صحبت عبد الله بن عمر أربعة وثلاثين شهراً فكثيراً ما كان يسأل فيقول : لا أدري ، ثم يلتفت إلي فيقول : تدري ما يريد هؤلاء ؟ يريدون أن يجعلوا ظهورنا جسراً لهم إلى جهنم

“আমি ৩৪ বছর হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) সংস্পর্শে থেকেছি। তাকে যে প্রশ্ন করা হত, তার অধিকাংশ ক্ষেত্রে তিনি বলতেন-“লা আদরি” (আমি জানি না)। অতঃপর তিনি আমাকে লক্ষ্য করে বলতেন- “এরা আমাদের পিঠকে জাহান্নামের সেতু বানাতে চায়”

[জামেউ বয়ানিল ইলমি ও ফাযলিহি, আল্লামা ইবনু আব্দিল বার (রহঃ), খ.২, পৃষ্ঠা-৮৪১]

তাবেয়ী হযরত আতা (রহঃ) বলেন-

أدركت أقواماً إن كان أحدهم ليسأل عن الشيء فيتكلم وإنه ليرعد

“আমি এমন সম্প্রদায়কে দেখেছি, যাদের নিকট কোন বিষয় জিজ্ঞেস করা হলে, তারা সে বিষয়ে কোন কথা বলতে গিয়ে কাঁপতেন”

[কোন ধরণের ত্র“টি হওয়ার ভয়ে কাঁপতেন]

[মুয়াফাকাত, আল্লামা শাতবী (রহঃ), খ.৪, পৃষ্ঠা-২৮৬]

হযরত সুফিয়ান সাউরী (রহঃ) বলেন-

أدركت الفقهاء وهم يكرهون أن يجيبوا في المسائل والفتيا حتى لا يجدوا بداً من أن يفتوا وقال : أعلم الناس بالفتيا أسكتهم عنها وأجهلهم بها أنطقهم

“আমি এমন ফকীহদেরকে পেয়েছি যারা মাসআলা ও ফতোয়া প্রদান করতে অপছন্দ করতেন। নিতান্ত নিরূপায় হলে তারা ফতোয়া প্রদান করতেন। ফতোয়ার ক্ষেত্রে সর্বাধিক জ্ঞাত সেই ব্যক্তি, যে চুপ থাকে, আর এক্ষেত্রে যে অধিক কথা বলে, সে হল চরম মূর্খ”

[আল-আদাবুশ শরইয়্যাহ, আল্লামা ইবনে মুফলিহ (রহঃ), খ.২, পৃষ্ঠা-৬৬]

হযরত আব্দুল মালিক বিন আবি সুলাইমান (রহঃ) বলেন-

سئل سعيد بن جبير عن شيء فقال : لا أعلم ثم قال : ويل للذي يقول لما لا يعلم : إني أعلم

“হযরত সাইদ ইবনে জুবাইর (রহঃ) কে কোন একটা বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন- “আমি জানি না”। অতঃপর তিনি বলেন- সে ধ্বংস হোক! যে জানে না অথচ বলে যে, আমি জানি”

ইমাম মালেক (রহঃ) কে কখনও পঞ্চাশটি প্রশ্ন করা হলে তিনি একটিরও উত্তর দিতেন না। তিনি বলতেন-

من أجاب في مسألة فينبغي قبل الجواب أن يعرض نفسه على الجنة والنار وكيف يكـون خلاصه في الآخرة ثم يجيب فيها

“যে ব্যক্তি কোন মাসআলার সমাধান দিল, উত্তর প্রদানের পূর্বে তার জন্য কর্তব্য হল, সে নিজেকে জান্নাত ও জাহান্নামের সম্মুখে উপস্থিত করবে এবং পরকালে তার কিভাবে মুক্তি হবে এটি চিন্তা করবে, অতঃপর তার উত্তর প্রদান করবে”

ইমাম মালেক (রহঃ) বলেন-

ذل وإهانة للعلم أن تجيب كل من سألك

“প্রত্যেক ব্যক্তির প্রশ্নের উত্তর প্রদান ইলমের প্রতি অবমাননা ও লাঞ্ছনা প্রদর্শন।”

এ বিষয়ে সাহাবায়ে কেরামের যুগ থেকেই যারপর নাই সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে এবং এভাবেই যুগে যুগে উলামায়ে কেরাম ইসলামকে বিকৃতির হাত থেকে রক্ষা করেছেন। শরীয়তের বিষয়ে কারও জন্য যেমন সবজান্তা হওয়া সম্ভব নয়, তেমনি ফতোয়া বা মাসআলা দেয়ার যোগ্য না হয়েও মাসআলা দেয়া জায়েয নয়। কিন্তু আমাদের সমাজে মূর্খ লোকেরাই নিজেদেরকে সবচেয়ে যোগ্য মনে করে থাকে। এদের সম্পর্কে ইমাম যাহাবী (রহঃ) এর উক্তি প্রণিধানযোগ্য-

الجَاهِلُ لاَ يَعلَمُ رُتْبَةَ نَفْسِه ، فَكَيْفَ يَعْرِفُ رُتْبَةَ غَيْرِهِ

“মূর্খ লোকেরা নিজের অবস্থা সম্পর্কেই অবগত নয়, তবে তারা অন্যের মর্যাদা সম্পর্কে কিভাবে অবগত হবে।”

অতএব, ফতোয়া বা মাসআলা প্রদানের ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম নিজের অবস্থান সম্পর্কে সচেতন হওয়া উচিৎ এবং এ বিষয়ে চিন্তা করা উচিৎ যে, এটি আমার জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হতে পারে। আল্লাহ পাক আমাদেরকে হিফাজত করুন! আমীন।

Print Friendly