বিষয়ঃ আযানের দোয়ার শেষে ‘ইন্নাকালা তুখলিফুল মি’আদ’ বলা প্রসঙ্গ। 

বাংলাদেশের আহলে হাদীস ভাইয়েরা তাদের শায়খদেরকে অন্ধভাবে তাকলিদ করার একটা দৃষ্টিভঙ্গি হল আহলে হাদীস আলেমদের তাহকীক আরবের আলেমদের তাহকীকের বরারব। কিন্তু বাস্তবতা অনেকটাই বিপরীত। যে সকল ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আহলে হাদীস আলেম ও আরবের আলেমদের মধ্যে মতপার্থক্য হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম একটি হল আযানের দোয়ার শেষে ইন্নাকালা তুখলিফুল মি’আদ’ বলা প্রসঙ্গ।

বাংলাদেশের আহলে হাদীস আলেমদের তাহকীকঃ


শায়খ মুরাদ বিন আমযাদ সাহেব বলেন –

“আযানের দু’আ প্রচলিত ভুলঃ আমাদের দেশে রেডিও, টিভি ইত্যাদি প্রচার মাধ্যমে এবং বিভিন্ন ফকহী গ্রন্থে কিছু অতিরিক্ত শব্দ বলা হয়, যেমন ‘ওয়াদারাজাতির রাফিয়া’ এবং ‘ইন্নাকালা তুখলিফুল মি’আদ’”(বেহেশতী জেওর, ২/১২২, মাসআলা-৯)(প্রচলিত ভুল বনাম রসূলুল্লা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওসাল্লামের সালাত আদায়ের পদ্ধতি পৃ-১৪)

মুজাফর বিন মুহসিন সাহেব বলেন –

“দোয়া নির্দৃষ্ট ইবাদাত। এর সাথে বারতি অংশ যোগ করার অধিকার কারো নেই। মানব রচিত তথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহী ওসাল্লামের নামে চালিয়ে দিলে এর পরিনাম হবে জাহান্নাম।অথচ সর্বত্র রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওসাল্লামের দোয়ার সাথে মানুষের তৌরি করা শব্দ যোগ করে আযানের দোয়া পাঠ করা হচ্ছে। যেমন –বায়হাকীতে বর্ণিত একটি হাদীসের শেষে ইন্নাকালা তুখলিফুল মিয়াদ শব্দগুলো এসেছে কিন্তু হাদীসটি সহীহ নয়।”
(জাল হাদীসের কবলে রসূলুল্লা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওসাল্লামের ছালাত পৃ-১৫৮)

আব্দুল হামীদ ফাইযী সাহেব বলেন –

এবং শেষে বায়হাকীর বর্ণনায় ইন্নাকালা তুখলিফুল মিয়াদ প্রভৃতি শুদ্ধ নয়।
(স্বলাতে মুবাশশির সাল্লাল্লাহু আলাইহী ওসাল্লাম পৃ-৯১)

আরবের আলেমদের তাহকীকঃ


আমরা উপরের আলোচনা থেকে দেখেছি যে বাংলাদেশের আহলে হাদীস আলেমগন আযানের দোয়ার শেষে ইন্নাকালা তুখলিফুল মি’আদ’ বলাকে ভূল এবং মানুষের তৌরি বলেছেন। মুযাফফর বিন মুহসিন সাহেবতো এটুকু অংশের সিকৃতি দাতাদের জাহান্নামের ভয়ও দেখিয়েছেন। এবার আমরা দেখবো এ ব্যাপারে আরবের আলেমগণ কি বলেন।

শায়খ আব্দুল আযিয আব্দুল্লাহ বিন বায রাহঃ বলেন –

ইমাম বুখারী সহীহ বুখারীতে জাবের রাযিঃ থেকে বলেছেন –নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওসাল্লাম বলেছেন- যে ব্যাক্তি আযান শুনে দু’য়া করবে – আল্লাহুম্মা রব্বা হাযিহিদ দা’ওয়াতিত তাম্মাহ,……মাক্বা-মাম মাহমূদানিল্লাযী ওয়া আত্ত্বাহ।’ তার জন্য কেয়ামতের দিন আমার শাফায়াত ওয়াজিব হবে।(বুখারী)
ইমাম বাইহাকী রাহঃ উত্তম(জাইইদ) সনদে জাবের রাযিঃ থেকে এরপর আরাকটু অংশ বর্ণনা করেছেন তা হল ‘ইন্নাকালা তুখলিফুল মিয়াদ’।
(মাজমাউল ফতোয়া লিস শায়খ বিন যাব ২৯/১৪১, ১০/৩৩৬)

শায়খ মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমিন রাহঃ বলেন –

“ অনেক মুহাদ্দিসিনে কেরাম আযানের দোয়ায় ইন্নাকালা তুখলিফুল মিয়াদ অংশটুকু সংযোজন করেছেন এবং এ বিষয়টি নিয়ে মুহাদ্দীসেনে কেরামের মধ্যে ইখতেলাফ রয়েছে যে এ অংশটুকুক সহীহ কি না? আমার শায়খ আব্দুল আযিয বিন আব্দুল্লাহ বিন বায রাহঃ এটাকে সহীহ বলেছেন এবং ইলমুল হাদীসে তার সহীহ বলাটাই যতেষ্ঠ।কেননা আরবে আমি তার মত কোন উপমা খুজে পাই নি।তবে তিনি এ রেওয়াতকে এক কিতাবে সহীহ বলেছেন আবার অন্য কিতাবে হাসান বলেছেন। যেটাই হোক কোরআনে ইন্নাকালা তুখলিফুল মিয়াদ রয়েছে যা এ হাদিসের সাথে মিলে গিয়েছে। সুতরাং কেউ যদি এ অংশটুকু বাড়িয়ে বলেন তাহলে তার উপর কোন আপত্তি করা যাবে না।বরং তার প্রসংশা করা উচিত।” (ফতহু জিল জালালি ওয়াল ইকরাম ২/২৪৮ , আশশরহুল মুমতিঈ ২/১০৭)

শায়খ মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমিন রাহঃ কে প্রশ্ন করা হয়েছে –

প্রশ্নঃ আযানের পরের দোয়ায় ইন্নাকালা তুখলিফুল মিয়াদ বৃদ্ধি করে পড়া কি সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমানিত?
উত্তরঃ হাদীস সাস্ত্রের পন্ডিদদের মধ্যে এ বাক্যটি নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন এটা সহীহ না , এটা সায। কেননা আযানের দোয়ার ব্যাপারে যারা হাদীস বর্ণনা করেছেন তাদের অধিকাংশ এ বাক্যটি উল্লেখ করেন নি। বিশুদ্ধ হলেতো তা বাদ দেওয়া বৈধ নয়। দোয়া ও প্রসংশার বাক্যে বা অনুরুপ কিছুতে কোন শব্দ ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়।কেননা এটার দ্বারা এবাদাত সম্পন্ন করা হয়। আর বিধ্যানদের মধ্যে অন্যরা বলেছেন এর সনদ সহীহ। এটা বলা যায় এতে কোন বাধা নেই।শায়খ আব্দুল আযিয বিন বায বলেছেন এর সনদ সহীহ। বায়হাকী সহীহ সনদে এটি বর্ণনা করেছেন। (ফাতওয়া আরকানুল ইসলাম পৃ-৩৪২ , তাওহীদ পাবলিকেশন)
শায়খ এখানে আবারও বিন বায রাও এর হাওয়ালায় বায়হাকীর হাদীসকে সহীহ বললেন।

সুতরাং আরবের এ দু শায়খের মতে আযানের দোয়ায় “ইন্নাকালা তুখলিফুল মি’য়াদ” বাড়িয়ে পড়া সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমানিত। কিন্তু বাংলাদেশের আহলে হাদীসরা এটাকে অস্বিকার করে থাকে।

Print Friendly