সৌদি ফতোয়া বোর্ডের ফতোয়া –
“ মৃতব্যাক্তি সম্বন্ধে সাধারণ নিয়ম হচ্ছে, নবী-রাসুল বা সাধারণ মুসলিম যেই হোন না কেন, তিনি তাঁর কবরে নড়া-চড়া করতে পারেন না।” (ফতোয়া নং ২১৪১২)

কিন্তু সহীহ হাদীস অনুযায়ী আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের আক্বিদা হল –

তায়ালা চাইলে মৃত্যুর পরও রুহ,দেহ বা প্রতিচ্ছবির মাধ্যমে কারামত সংগঠিত করতে পারেন। অর্থাৎ আল্লাহ চাইলে মৃত্যুর পরও কারো জন্য কবরে নাড়াচড়ার ব্যাবস্থা করতে পারেন যেমন কবর থেকে কারো হাত বা সম্পূর্ণ দেহও বের হয়ে আসতে পারে। এটা কারামত হিসেবেও করতে পারেন আবার কোন কিছুর নিদর্শণ হিসেবেও করতে পারেন।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওসাল্লামের হাদীস

রাসূল স. মিরাজের রাতে মুসা আ.কে তার কবরে ‘দাড়িয়ে’ নামাজ পড়তে দেখেছেন। মুসলিম শরীফসহ বহু হাদীসের কিতাবে হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। বর্ণনাটি নিম্নরুপ –

مَرَرْتُ عَلَى مُوسَى لَيْلَةَ أُسْرِيَ بِي عِنْدَ الْكَثِيبِ الأَحْمِرِ وَهُوَ قَائِمٌ يُصَلِّي فِي قَبْرِهِ
রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেনঃ-

যেই রাতে আমাকে মি’রাজে নেয়া হলো সেই রাতে যখন আমি মূসা (আ.) এর নিকট এলাম এমতাবস্থায় যে, তিনি লাল বালুকাস্তুপের নিকট স্বীয় কবরে দাঁড়িয়ে নামায পড়ছিলেন।

( দেখুনঃ- সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৫৯৮১ । মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১২৫০৪ । সুনানে নাসায়ী, হাদীস নং ১৬৩১ । )
নামায পড়া কি নাড়াচড়ার মধ্যে পড়ে না ??????

শুধু মুসা আঃ নয় , নামাযের ব্যাপারে সকল নবীকে এ সম্মানে সম্মানিত করা হয়েছে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

الأَنْبِيَاءُ أَحْيَاءٌ فِي قُبُورِهِمْ يُصَلُّون.
‘নবীগণ কবরে জীবিত, নামায আদায় করেন’।

-মুসনাদে আবু ইয়ালা, হাদীস ৩৪২৫; হায়াতুল আম্বিয়া লিল বাইহাকী, হাদীস ১-৪

  • যারা এ বর্ণনাকে সহীহ বলেছেন:
    ১. ইমাম বাইহাকী রাহ. (হায়াতুল আম্বিয়া, পৃ. ৫)
    ২. হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রাহ. (ফাতহুল বারী ৬/৬০৫)
    ৩. হাফেজ ইবনুল মুলাক্কিন রাহ. (আল-বাদরুল মুনীর ৫/২৮৫)
    ৪. হাফেজ নূরুদ্দীন হাইসামী রাহ. [এর বর্ণনাকারীগণ বিশ্বস্ত] (মাজমাউয যাওয়াইদ, ৮/২১১, হাদীস ১৩৮১২)
    ৫. আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতী রাহ. (ইম্বাউল আযকিয়া বিহায়াতিল আম্বিয়া, আল-হাবী, পৃ. ৫৫৫)
    ৬. আল্লামা মুনাবী রাহ. (ফায়জুল কাদীর, হাদীস ৩০৮৯)
    ৭. শাওকানী রাহ. (তুহফাতুয যাকিরীন পৃ. ২৮; নাইলুল আউতার, ৩/২৪৭)
    ৮. শায়খ নাসীরুদ্দীন আলবানী রাহ., সিলসিলাতুস সহীহা, হাদীস ৬২১; সহীহুল জামিইস সাগীর; আলজানাইয; আত-তাওয়াসসুল ইত্যাদি)

 

ঠিক একই ভাবে আরেকটি সহীহ হাদীসে কবর থেকে এক ব্যাক্তির সম্পূর্ণ দেহ বের হওয়ার ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে।
হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল স. বলেন,
حَدَّثَنَا إِسْحَاقُ بْنُ إِسْمَاعِيلَ ، حَدَّثَنَا وَكِيعٌ ، وَعَبْدُ اللَّهِ بْنُ نُمَيْرٍ , عَنِ الرَّبِيعِ بْنِ سَعْدٍ الْجُعْفِيِّ ، عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ سَابِطٍ ، عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ ، قَالَ : قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : ” حَدِّثُوا عَنْ بَنِي إِسْرَائِيلَ ، فَإِنَّهُ كَانَتْ فِيهِمُ الأَعَاجِيبُ ، ثُمَّ أَنْشَأَ يُحَدِّثُ ، قَالَ : خَرَجَتْ رُفْقَةٌ مَرَّةً يَسِيرُونَ فِي الأَرْضِ فَمَرُّوا بِمَقْبَرَةٍ ، فَقَالَ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ : لَوْ صَلَّيْنَا رَكْعَتَيْنِ ثُمَّ دَعَوْنَا اللَّهَ لَعَلَّهُ يُخْرِجُ لَنَا بَعْضَ أَهْلِ هَذِهِ الْمَقْبَرَةِ فَيُخْبِرُنَا عَنِ الْمَوْتِ ، قَالَ : فَصَلُّوا رَكْعَتَيْنِ ثُمَّ دَعَوْا ، فَإِذَا هُمْ بِرَجُلٍ خِلاسِيٍّ قَدْ خَرَجَ مِنْ قَبْرٍ يَنْفُضُ رَأْسَهُ ، بَيْنَ عَيْنَيْهِ أَثَرُ السُّجُودِ ، فَقَالَ : يَا هَؤُلاءِ مَا أَرَدْتُمْ إِلَى هَذَا ؟ لَقَدْ مِتُّ مُنْذُ مِائَةِ سَنَةٍ فَمَا سَكَنَتْ عَنِّي حَرَارَةُ الْمَوْتِ إِلَى السَّاعَةِ ، فَادْعُوا اللَّهَ أَنْ يُعِيدَنِي كَمَا كُنْتُ ” .
“তোমরা বনী ইসরাইলদের ঘটনা বর্ণনা করো। কেননা তাদের মাঝে অনেক আশ্চর্যজনক ঘটনা সংগঠিত হয়েছে। এরপর রাসূল স. একটি ঘটনা বর্ণনা করলেন,
একদা বনী ইসরাইলের কয়েকজন বন্ধু ভ্রমণে বের হল। তারা একটি কবরস্থান দিয়ে অতিক্রম করছিল । তারা একে -অপরকে বলল, “আমরা যদি, দু’রাকাত নামায আদায় করে আল্লাহর কাছে দুয়া করি, তাহলে আল্লাহ তায়ালা হয়তো কবরের কোন ব্যক্তিকে আমাদের সামনে উপস্থিত করবেন। সে মৃত্যু সম্পর্কে আমাদেরকে বলবে।
তারা দু’রাকাত নামায আদায় করল। এরপর আল্লাহর কাছে দুয়া করল। হঠাৎ এক ব্যক্তি মাথা থেকে মাটি পরিষ্কার করতে করতে কবর থেকে বের হয়ে এল। তার কপালে সিজদার চিহ্ন ছিল। সে বলল, তোমরা কী চাও? আমি একশ বছর পূর্বে মৃত্যুবরণ করেছি। এখনও আমার দেহ থেকে মৃত্যুর যন্ত্রনা উপশমিত হয়নি। আল্লাহর কাছে দুয়া করো, যেন তিনি আমাকে পূর্বের স্থানে (কবরে) ফেরত পাঠিয়ে দেন”

  • যেসব বিখ্যাত মুহাদ্দিস হাদীসটি তাদের কিতাবে উল্লেখ করেছেন,
    ১. ইবনে আবিদ দুনিয়া রহ., মান আশা বা’দাল মাউত। হাদীস নং ৫৮
    ২. মুসনাদে আব্দ ইবনে হুমাইদ, হাদীস নং ১১৬৪
    ৩.ফাওয়াইদু তামাম আর-রাজী, হাদীস নং ২১৭
    ৪. আল-জামে লি আখলাকির রাবী, খতীব বাগদাদী, হাদীস নং ১৩৭৮
    ৫. আল-বা’স, ইবনে আবি দাউদ, হা.৫
    ৬.আজ-জুহদ, ইমাম ওকী ইবনুল জাররাহ, হাদীস নং৮৮
    ৭. আজ-জুহদ, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ.
    ৮. মাজালিস মিন আমালি ইবনে মান্দাহ, ইবনে মান্দাহ, হাদীস নং ৩৯৩
    ৯. আল-মাতালিবুল আলিয়া, ইবনে হাজার আসকালানী রহ. হাদীস নং ৮০৭
    ১০. ফুনুনুল আজাইব, হা.১৯
    ১১. শরহুস সুদুর, জালালুদ্দীন সুয়ূতী রহ. পৃ.৪২-৪৩

ঘটনাটি বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত। তামাম আর-রাজী এটি সরাসরি রাসূল স. থেকে বর্ণনা করেছেন। ইবনে হাজার আসকালানী রহ. হযরত জাবির রা. থেকে মওকুফ সূত্রে বর্ণনা করেছেন, যেটি মরফু এর হুকুমে। সুতরাং ঘটনার প্রামাণ্যতার ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই।

আল্লাহ তায়ালার হুকুমে কবর থেকে কেউ বের হয়ে গেলে সেটাও কি নাড়াচড়া নয় ?????

মূল কথা হল সৌদি আরবের ফতোয়া বোর্ডের এ ফতোয়া ভুল। এটা আক্বিদার ক্ষেত্রে তাদের বাড়াবাড়ির বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু আমার কথা হল বাংলাদেশের যে ভায়েরা বলে বেড়ায় দলিল ছাড়া কারো কথা মানবো না তারা এ ফতোয়ার প্রচার করে কিভাবে ????? এ ফতোয়ার পক্ষে কোন দলিলতো নেই বরং সরাসরি হাদীসের বিপরীত। বাংলাদেশের এ ভায়েরা ‘দলিল ছাড়া কাউকে মানি না’ এ শ্লোগান শুধুমাত্র মানুষদের ধোঁকা দেওয়ার জন্য দেয়। কিন্তু হাকিকত এর উলটা।

Print Friendly