আহলে হাদীসদের বর্তমান মুখপাত্র মুতিউর রহমান মাদানী বিভিন্ন ইসলামী দলের বিরুদ্ধে লেকচার দিয়ে থাকেন। এসব ইসলামী দলকে কাফের-মুশরিক, খারেজী, বাতিল, গোমরাহ  আখ্যা দেয়া তার মূল কাজ। এই লোকটি বর্তমান বিশ্বে দ্বীনের খেদমতে সবচেয়ে বেশি অগ্রণী ভূমিকা পালনকারী দেওবন্দী উলামায়ে কেরাম সম্পর্কেও  লেকচার দিয়েছে। সে দেওবন্দী আকিদা নামে একটি লেকচার দিয়েছে। আহলে হাদীসদের নিকট এ লেকচারটি খুবই পরিচিতি লাভ করেছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই তথাকথিত আহলে হাদীস মাদানী দুনিয়ার অন্য সবার বিরুদ্ধে লেকচার দিলেও আহলে হাদীস আলেমদের সম্পর্কে কখনও কোন লেকচার দেয় না। সালাফী আলেমদের বাতিল আকিদার বিরুদ্ধে কোন লেকচার সে দেয় ন। সৌদি আরবের নিয়মিত বেতন-ভাতা ভোগ করার কারণে সৌদি সরকারের অন্যায়ের বিরুদ্ধেও মুখ খোলে না। এই দরবারী আলেম যেসব কারণ দেওবন্দী আলেমদের সমালোচনা করেছে, হুবহু সেসব আকিদা তথাকথিত সালাফী বা আহলে হাদীস আলেমরা পোষণ করলেও সে কখনও এদের বিরুদ্ধে কিছু বলে না। নিজের দলের হাজারটা ভুল থাকলেও সে অন্যের ভুল ধরতে উস্তাদ।

দেওবন্দী আলেমরা যদি কুফুরী-শিরকী আকিদা রাখে, তাহলে তাদের চেয়ে জঘন্য আকিদা রেখে তথাকথিত সালাফী-আহলে হাদীসরা তুলসী পাতা হয় কী করে? আমরা এবারের আলোচনায় ভারত উপমহাদেশের আহলে হাদীসদের বিখ্যাত আলেমদের আকীদা সম্পর্কে আলোচনা করবো। মতিউর রহমান ও তার ভক্তদের কাছে নিবেদন থাকবে, এসব আহলে হাদীসদের বিরুদ্ধেও  লেকচার তৈরি করুন। তাদেরকে কাফের-মুশরক, বাতিল-গোমরাহ ইত্যাদি আখ্যা দিয়ে লেকচার দিন। আমরা আপনাদের উত্তরের অপেক্ষায় রইলাম। আমরা এ পর্বগুলোতে মতি মাদানীর মিথ্যাচারের জওয়াব দিবো না। শুধু আহলে হাদীসদের সেসব আকিদা বর্ণনা করবো, যেগুলো মাদানী আহলে হাদীসদের নিকট কুফুরী ও শিরকী। ইনশাআল্লাহ পরবর্তীতে দেওবন্দী আকিদার নামে মতি মাদানী দেওবন্দী আলেমদের সম্পর্কে যে মিথ্যাচার করেছ তার বিস্তারিত উত্তর দেয়া হবে।

মৃত ব্যক্তিদের নিকট সাহায্য প্রার্থনা

আহলে হাদীস  একজন শীর্ষস্থানীয় আলেম হলো ওহিদুজ্জামান হাইদ্রাবাদী। ভারত উপমহাদেশে আহলে হাদীস মতবাদ প্রতিষ্ঠা ও প্রচারে যাদের অবদান স্বীকৃত, ওহিদুজ্জামান তাদেরই একজন। আহলে হাদীস আলেমরা  অত্যন্ত সম্মানের সাথে তার এই অবদানের স্বীকৃতি দিয়েছেন। ওহিদুজ্জামান হাইদ্রাবাদী তিরমিজী শরীফ সিহাহ সিত্তার সবগুলো হাদীসের কিতাব অনুবাদ করেছেন। আহলে হাদীস মাদ্রাসা ও পরিবারগুলোতে ওহিদুজ্জামানের অনুবাদই প্রচলিত ছিলো। আহলে হাদীসদের নিকট ওহিদুজ্জামানের অবস্থান জানতে দেখুন,

১. জামাআয়াতে আহলে হাদীস কি তাসনিফী খেদমাত, লেখক, মাওলানা মুহাম্মাদ মুস্তাকীম সালাফী বেনারসী।

২. হিন্দুস্তান মে আহলে হাদীস কি ইলমী খিদমাত, লেখক, মাওলানা মুহাম্মাদ আবু ইয়াহইয়া ইমাম খান।

৩. ২০০৩ সালে প্রকাশিত চালিস উলামায়ে আহলে হাদীস (চল্লিশজন আহলে হাদীস আলেমের জীবনী) নামে একটি কিতাব বের হয়েছে। এই কিতাবের দশ নাম্বার আলেম হিসেবে ওহিদুজ্জামান হাইদ্রাবাদীর জীবনী আলোচনা করা হয়েছে। তার উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে হাদইয়াতুল মাহদী, নুজুলুল আবরার ইত্যাদী কিতাব সম্পর্কেও আলোচনা করা হয়েছে। এছাড়াও লেখক আহলে হাদীস আলেম হিসেবে ওহিদুজ্জামানের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।

৪. পীর বদিউদ্দীন রাশেদী হাদইয়াতুল মুস্তাফীদ (খ.১, পৃ.৯৫) এ ওহিদুজ্জামানের জীবনী আলোচনা করেছে। এখানে সে ওহিদুজ্জামান সম্পর্কে লিখেছে, তিনি একজন আমলওয়ালা আলেম ছিলেন,যুগশ্রেষ্ঠ ফকীহ ও সুন্নত প্রেমী ছিলো।

৫. আহলে হাদীস আলেম মাওলানা আব্দুর রহমান ফারিয়াবী জুহুদুন মুখলাসা নামে একটি আরবী কিতাব লিখেছেন। এই কিতাবে তিনি ওহীদুজ্জামানের জীবনী আলোচনা করেছেন। তিনি লিখেছেন, “তিনি হিন্দুস্তানের শীর্ষস্থানীয় আলেম ও আহলে হাদীস আলেম নজীর হুসাইন দেহলবীর বিশিষ্ট ছাত্র ছিলেন। তিনি সারা জীবন রাসূল স. এর সুন্নতের প্রচারে ব্যয় করেছেন। “

ওহিদুজ্জামান হাইদ্রাবাদী সাহেবের একটি বিথ্যাত কিতাব হলো, হাদইয়াতুল মাহদী। হাদইয়াতুল মাহদী কিতাবের ২৩ পৃষ্ঠায় তিনি নওয়াব সিদ্দিক হাসান খানের একটি আমল বর্ণনা করেছেন।  নওয়াব সিদ্দিক হাসানের খানের পরিচয় দেয়ার প্রযোজন আছে বলে মনে করি না। তিনি উপ মহাদেশে আহলে হাদীসদের প্রথম সারির আলেম। কাজী শাওকানীর বিখ্যাত ছাত্র ছিলেন। এমনকি শায়খ নাসিরুদ্দীন আল-বানী তার জীবনে দীর্ঘ দিন নওয়াব সিদ্দিক হাসান খানের লেখা আর-রওজাতুন নাদিয়্যা কিতাবটি ক্লাসে পড়িয়েছেন। এর উপর তিনি এর উপর একটা ব্যাখ্যাও লিখেছেন, আত-তা’লীকাতুর রজীয়্যা নামে।

ওহিদুজ্জামান হাইদ্রাবাদী নওয়াব সিদ্দিক হাসান খানের একটি বক্তব্য হাদইয়াতুল মাহদী কিতাবের ২৩ পৃষ্ঠায় লিখেছেন,

” নওয়াব সিদ্দিক হাসান খান বলেছেন,  হে আমার দ্বীনের কেবলা, সাহায্য করো।  হে আমার ঈমানের কা’বা সাহায্য করো।  হে ইবনুল কাইয়্যিম সাহায্য করো।  হে কাজী শাওকানী সাহায্য করো”

স্ক্রিনশট দেখুন,

আমরা আহলে হাদীসদের কাছে এই দুই আলেম  সম্পর্কে জানতে চাই। নওয়াব সিদ্দিক হাসান খান যা বলেছেন, এটা তাউহীদ না শিরক? যদি শিরক হয়ে থাকে, তাহলে সিদ্দিক হাসান খান ও ওহিদুজ্জামান সম্পর্কে আপনাদের বক্তব্য কী?

আর আলবানী সাহেব কি এধরনের একজন শিরকে বিশ্বাসীর কিতাব ক্লাসে পড়িয়েছেন?

আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত অন্যদের কাছে সাহায্য চাওয়া শিরক না তাউহীদ এই প্রশ্নের জবাব চাই। সাথে সাথে আহলে হাদীসদের দু’জন বিখ্যাত আলেম সম্পর্কেও জানতে চাই, তারা শিরক করেছে কি না।

আহলে হাদীসদের নবীদের তালিকা:

আহলে হাদীস আলেম ওহিদুজ্জামান হাইদ্রাবাদী তার হাদইয়াতুল মাহদী কিতাবে লিখেছে,

অর্থাৎ আমাদের জন্য অন্যান্য নবীদের নবুওয়াত অস্বীকার করা উচিৎ নয়, যাদের কথা কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত হয়নি, কিন্তু তাওয়াতুর বা অসংখ্য লোকের বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত যে, তারা নেককার নবী ছিলো; যদিও এসব বর্ণনাকারী কাফের হয়। যেমন, হিন্দুদের রামচন্দ্র, লক্ষণ, কিশান জী, পারস্যের ঝারাতুশত, চীন ও জাপানের গৌতম বুদ্ধ ও কনফুসিয়াস। গ্রিকদের সক্রেটিস, পিথাগোরাস (এরা সবাই নবী ছিলো)। 

[হাদইয়াতুল মাহদী, পৃ.৮৫, মাতবুয়া শাওকাতুল ইসলাম, বেঙ্গলোর]

মূল কিতাবের স্ক্রিনশট দেখুন,

মূল কিতাবের ডাউনলোড লিংক

এতো দিন পিথাগোরাসকে একজন গণিতবিদ হিসেবে জানতাম। আহলে হাদীস আলেমের ওসিলায় সে যে একজন নবী (?) ছিলো, তাও জানা গেল। গৌতম বুদ্ধও যে একজন নবী, এই অজানা সত্য আহলে আলেমরাই জাতিকে জানিয়েছেন। এছাড়াও হিন্দুদের রামচন্দ্র, লক্ণণ ও কিশান জীর প্রতি তিনি যে সহানুভূতি দেখিয়েছেন, তাতে শুধু আমরা (?) কেন খুশি হবো, হিন্দুরাও এই আহলে হাদীস আলেমকে বাহবা দিবে। এদেরকে যে নবী বলল, এর বিচারের ভার পাঠকের হাতে অর্পণ করলাম। সক্রেটিস, পিথাগোরাসকে যারা নবী বলে বিশ্বাস করে, তাদের সহীহ আকিদার (?) স্বরুপ জানতে ইচ্ছা করে।

রাসূল স. সর্বত্র বিরাজমান:

আহলে হাদীসদের মাঝে পরিচিত একটি কিতাব হলো বুলুগুল মারাম। বুলুগুল মারামের বিখ্যাত অনেক ব্যাখ্যা রয়েছে। বুলগুল মারামের একটি ব্যাখ্যা লিখেছেন নওয়াব সিদ্দিক হাসান খান। আহলে হাদীসদের এই বিখ্যাত আলেম বলুগুল মারামের এই ব্যাখ্যা নাম দিয়েছেন, মিসকুল খিতাম। মিসকুল খিতাম কিতাবের ১ ম খন্ডের ২৪৪ পৃষ্ঠায় রাসূল কে সর্বত্র বিরাজমান বলেছে। সৃষ্টির প্রত্যেক অণু-পরমাণুতে রাসূল স. বিদ্যমান।  নওয়াব সিদ্দিক হাসান খান লিখেছে,

” রাসূল স. প্রত্যেক মুহূর্তে এবং সর্ববস্থায় মু’মিন ও আবেদ বান্দাদের অন্তরের প্রফুল্লতা ও চোখের শীতলতার মাধ্যম। বিশেষভাবে ইবাদতের সময়। কারণ এ অবস্থায় মানুষের সামনে উর্ধ্বজগতে উন্মোচিত হয়ঁ এবং নূরের প্রবাহ অধিক শক্তিশালী হয়। কিছু কিছু বুজুর্গ বলেছেন, তাশাহুদে রাসূল স. কে “ইয়া আইয়ূহান নাবিউ” ( হে নবী) বলে সম্বোধন মূলত: সৃষ্টির প্রত্যেক বস্তুর মাঝে রাসূল স. এর সত্ত্বার অনুপ্রবেশের কারণে বলা হয়ে থাকে। সুতরাং রাসূল স. নামাজী ব্যক্তির সত্ত্বার  মাঝে বিদ্যমান থাকে। এজন্য নামাজী ব্যক্তির জন্য কর্তব্য হলো, নামায অবস্থায় এ বিষয়টির প্রতি লক্ষ্য রাখবে এবং রাসূল স. এর উপস্থিতির ব্যাপারে উদাসীন থাকবে না। এর মাধ্যমে সে রাসূল স. এর নৈকট্য, নুরানিয়াত ও সান্নিধ্য লাভে ধন্য হবে। “

[মিসকুল খিতাম, বুলুগুল মারাম এর ব্যাখ্যা, ১ম খন্ড, পৃ.২৪৪]

মূল কিতাবের স্ক্রিনশট:

মূল কিতাবের ডাউনলোড লিংক

আমরা আহলে হাদীস ভাইদের কাছে প্রশ্ন রাখতে চাই, আপনাদের এই মহান গুরু যে কথাটি বললেন, এটা তাউহীদ না শিরক? শুধু এই একটা প্রশ্নের উত্তর চাই। বিস্তারিত কোন ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই।

স্রষ্টা যে কোন রুপ গ্রহণ করেন:

আহলে হাদীসদের বিখ্যাত আলেম ওহিদুজ্জামান খান তার হাদইয়াতুল মাহদী কিতাবে লিখেছে,

অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা যে কোন আকৃতিতে প্রকাশিত হন। 

[হাদইয়াতুল মাহদী, পৃ.৭, ৯]

মূল কিতাবের স্ক্রিনশট

পৃষ্ঠা-৭

পৃষ্ঠা-৯

খ্রিষ্টানদের বিশ্বাস হলো, আল্লাহ তায়ালা ঈসা আ. এর আকৃতিতে প্রকাশিত হয়েছেন। হিন্দুরা বিশ্বস করে, আল্লাহ তায়ালা শুয়োর, গরু, রামচন্দ্র, কৃষ্ন ইত্যাদির আতৃতিতে প্রকাশিত হয়েছেন।  মুসা আ. এর সময়ে সামেরী বলেছিলো, আল্লাহ তায়ালা বাছুরের আকৃতিতে প্রকাশিত হয়েছেন। আহলে হাদীসদের মতবাদ অনুযায়ী এগুলো সবই সঠিক। কারণ আল্লাহ তায়ালা যে কোন আকৃতি গ্রহণ করে থাকেন। আল্লা্হ তায়ালার বিভিন্ন আকৃতি গ্রহণ আর হিন্দুদের অবতারের ধারণার মাঝে কোন পার্থক্য নেই। আল্লাহ পাক ভালো জানেন, এধরনের স্পষ্ট কুফুরী আকিদা রাখার পরেও মানুষ কীভাবে সহীহ আকিদার দাবী করে?

নবী ও ওলীগণ একই সাথে আসমান ও জমিনের সমস্ত কথা শুনতে পারে:

আহলে হাদীস আলেম ওহিদুজ্জামান হাইদ্রাবাদী তার হাদইয়াতুল মাহদী কিতাবের ২৫ পৃষ্ঠায় লিখেছেন,  

অর্থাৎ  কেউ যদি এ বিশ্বাস রাখে যে, রাসূল স. অথবা হযরত আলী বা অন্য কোন ওলী সাধারণ মানুষ থেকে বেশি শুনতে পারে, এমনকি আসমান জমিনের সব কিছু এবং জমিনের দূর-দূরান্তের কথাও তারা শোনেন, তাহলে এটি শিরক হবে না। 

মূল কিতাবের স্ক্রিনশট: 

ইয়া আলী, ইয়া রাসূলুল্লাহ বা ইয়া গাউস বলা সঠিক:

” উক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্ট যে,  মানুষ  বলে থাকে, ইয়া রাসূলুল্লাহ (হে আল্লাহর রাসূল), ইয়া আলী ( হে আলী) অথবা ইয়া গাউস ( হে গাউস) এগুলোর কারণে আমরা তাদের ব্যাপারে শিরকের ফয়সালা দেই না।”

আহলে হাদীস, সালাফী ও তথাকথিত সহীহ আকিদার ভাইদের কাছে জানতে চাই, আপনাদের গুরুদের যেসব আকিদা উপরে প্রমাণসহ উল্লেখ করা হয়েছে, এগুলো সহীহ আকিদা না কি শিরক?

Print Friendly