আল্লাহ তায়ালা তার প্রিয় বান্দাদেরকে তার অসংখ্য নিয়ামত অবলোকন করান। কখনও সেগুলো সাধারণ মানুষের কাছে প্রকাশিত হয়, কখনও গোপন থাকে। আল্লাহর প্রিয় বান্দাগণের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা যেসব অলৌকিক ঘটনা বা অপ্রাকৃতিক বিষয় প্রকাশ করেন, সেগুলোকে কারামত বলা হয়। কারামত কখনও বান্দার নিজস্ব ক্ষমতা বা ইচ্ছায় সংঘঠিত হয় না। একমাত্র আল্লাহর ইচ্ছা ও তার ক্ষমতায় বান্দার হাতে কারামত প্রকাশিত হয়। এক্ষেত্রে বান্দা উপলক্ষ মাত্র। মূল ক্ষমতা ও ইচ্ছা একমাত্র আল্লাহ তায়ালার।  কোন ব্যক্তি যদি প্রকৃত অর্থে আল্লাহর প্রিয় বান্দা হয়, এবং তার থেকে অস্বাভাবিক কোন কারামত প্রকাশিত হয়, তবে এটা অবশ্যই বিশ্বাস করতে হবে। ঐতিহাসিকভাবে বর্ণিত কারামতের সত্যতা যাচাই করাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বর্তমানে সংগঠিত কারামত হোক, কিংবা ঐতিহাসিক সূত্রে বর্ণিত হোক, কারামতে বিশ্বাস স্থাপন আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের মৌলিক আকিদার একটি অংশ। কেউ যদি বস্তুবাদী ধ্যান-ধারণায় বিশ্বাসী হয়ে কারামত অস্বীকার করে তাহলে সে শুধু আহলে সুন্নত ওয়াল জামাত থেকে বের হবে না, সেই সাথে ইমানহারা হওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ পবিত্র কুরআন ও সহীহ হাদীসসমূহে অসংখ্য কারামত বর্ণিত হয়েছে। মৌলিকভাবে কারামত অস্বীকারের অর্থ হল কুরআন ও হাদীসের এসব ঘটনা অস্বীকার করা। কারামত থেকে শিরক অনুসন্ধানের চেষ্টাও একটি ইমান বিধ্বংসী প্রয়াস।

সাধারণ কারামতকে শিরক আখ্যা দিয়ে কাউকে মুশরিক বললেই  বিষয়টি শেষ হয় না, হুবহু একই পর্যায়ের ঘটনা বা এর চেয়েও অস্বাভাবিক ঘটনা কুরআন ও হাদীসে থাকতে পারে। একজন সাধারণ বুজুর্গের একটি করামতকে শিরক আখ্যা দিয়ে তাকে যদি মুশরিক বলেন, তাহলে এর চেয়েও অস্বাভাবিক যেসব ঘটনা কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত হয়েছে সেগুলোকে কেন শিরক বলেন না? একজন সাধারণ বুজুর্গের কারামত কোন কিতাবে উল্লেখ করাকে কেন্দ্র করে যদি উক্ত কিতাবের লেখককে শিরকের অপবাদ দেন, কারামত চর্চার অপবাদ দেন, তাহলে কুরআন ও হাদীস কীভাবে এই অপবাদ থেকে মুক্ত থাকে? কোন সুনির্দিষ্ট কিতাবে কারামত উল্লেখের কারণে সেটাকে যদি শিরকের উৎস বলা হয়, তাহলে এর চেয়ে অস্বাভাবিক কারামত যেই কুরআন ও হাদীসে রয়েছে, সেটা কি তাদের শিরকের অপবাদ থেকে মুক্ত থাকে? নাউযুবিল্লাহ, কারামত অস্বীকারকারীদের মনস্তত্ব  বিশ্লেষণ করতে গিয়েও আমাদের গা শিউরে উঠে। অনেকেই হয়ত প্রশ্ন কররবেন, দেওয়ানবাগী বা আটরশির ভন্ডপীরের নামেও তো অনেক কারামতের কথা শোনা যায়, এগুলোও কি বিশ্বাস করতে হবে?এর উত্তর আল্লামা আমিন সফদর রহ. এর ভাষায় শুনুন: “ওহিদ সাহেব বললেন, মানুষ বুযুর্গদের নামে বিভিন্ন মিথ্যা ও মনগড়া ঘটনা তৈরি করে থাকে। এগুলো কী গ্রহণযোগ্যতা আছে?আমি বললাম, কোথায় মিথ্যা বানানো হয়নি? মানুষ মিথ্যা খোদা বানিয়েছে।মিথ্যা নবি বানিয়েছে। মিথ্যা হাদিস তৈরি করেছে। বাজারে জাল টাকা বানিয়েছে। আপনি কি শুধু মিথ্যা খোদাকেই অস্বীকার করবেন, না কি সাথে সত্য খোদাকেও? শুধু মিথ্যা নবীকে অস্বীকার করবেন, না কি সাথে সত্য নবীকেও? শুধু জাল হাদিস থেকে বেঁচে থাকবেন না কি সহিহ হাদিস থেকেও। জাল নোট থেকে বাঁচতে গিয়ে আসল নোট ব্যবহারও ছেড়ে দিবেন? কারামতের ক্ষেত্রেও আপনাকে মিথ্যা ঘটনা মানতে কে বলেছে? মিথ্যা ঘটনা থাকার কারণে সত্য ঘটনাও অস্বীকার করবেন কোন যুক্তিতে?”

কোন কিতাবে প্রসিদ্ধ কোন বুজুর্গের কারামত বর্ণিত হলে সেটাকে কুফুরী শিরকের অপবাদ দেয়ার অর্থ হল কুরআন ও হাদীসকেও কুফুরী শিরকের উৎস বলা।  হ্যা, কারামত বর্ণিত হলে সেটার বিশুদ্ধতা সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে, কিন্তু কারামতে গায়েবের কোন বিষয়, অস্বাভাবিক ক্ষমতা প্রকাশ ইত্যাদির কারণে অমুক গায়েব জানার দাবী করেছে বলে তাকে শিরকের অপবাদ মূর্খতা ছাড়া কিছুই নয়। কারণ কারামত অর্থই হল অলৌকিক ঘটনা। যেসব বিষয় সাধারণ নিয়ম বহির্ভূত সেগুলোই কারামত। সুতরাং অস্বাভাবিক ঘটনা হলেই সর্বশক্তিমান, বা গায়েব জানার দাবী করেছে বলে অপবাদ দেয়া হলে সকল কারামতই শিরক হবে। কেননা প্রত্যেক কারামতের মাঝেই অস্বাভিবক কুদরত বা গায়েব সংশ্লিষ্ট বিষয় থাকে। কারামত অস্বীকারকারীদের এই মনস্তত্ব অনুযায়ী সকল কারামতই শিরক হতে বাধ্য।

ইবনে তাইমিয়া রহ. কারামতের বাস্তবতা ও প্রকার   সম্পর্কে বলেন,

 “পূর্ণতা মূলত: তিনটি বিষয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট। ১.ইলম বা জ্ঞান  ২. কুদরত বা ক্ষমতা।  ৩. গিনা বা অমুখাপেক্ষীতা।.. এই তিনটি বিষয়ের পরিপূর্ণতা একমাত্র আল্লাহর রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা তার ইচ্ছায় কোন বান্দাকে এই তিনটি বিষয়ের কিছু অংশ কারামত হিসেবে দান করে থাকেন। ….ইলম বা জ্ঞানের সাথে সংশ্লিষ্ট কারামতের উদাহরণ হল, কেউ এমন কিছু শ্রবণ করা  যা অন্য কেউ শোনে না। জাগ্রত বা ঘুমন্ত অবস্থায় এমন কিছু দেখা অন্য অন্যরা দেখে না।  ওহী (নবীদের ক্ষেত্রে) বা ইলহাম (ওলীদের ক্ষেত্র) এর মাধ্যমে এমন কিছু জানা, যা অন্যরা জানতে পারে না। অথবা কারও উপর আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ ইলম অবতীর্ণ হওয়া। অথবা এমন বিচক্ষণতা যা আল্লাহ তায়ালা দান করে থাকেন। এগুলোকে কাশফ ও মুশাহাদা (অদৃশ্য বা গায়েবী বিষয় অবলোকন), মুকাশাফা (অদৃশ্য বিষয় উন্মোচন) , মুখাতাবা (অদৃশ্য কথোপকথন) ও বলা হয়ে থাকে। কুদরতের সাথে সংশ্লিষ্ট কারামতের উদাহরণ হল, কোন কিছুর উপর তা’সীর বা ক্ষমতা প্রয়োগ। কখনও এটি মনোবল, সত্যবাদীতা বা দুয়া কবুলের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। কখনও আল্লাহর পক্ষ থেকে কাজটি সম্পন্ন হয়। এক্ষেত্রে উক্ত ব্যক্তির নিজস্ব প্রভাব থাকে না। যেমন, কোন ব্যবস্থা নেয়া ছাড়াই শত্রু মৃত্যুবরণ করা। যেমন হাদীসে কুদসীতে রয়েছে, আল্লাহ তায়ালা বলেন, যে আমার ওলীর সাথে শত্রুতা রাখে, আমি তার সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করি…….। একইভাবে কোন বুজুর্গের প্রতি কারও মনকে আকৃষ্ট করে দেয়া বা তার মহব্বত কারও অন্তরে সৃষ্টি করা। এসকল ক্ষেত্রে বুজুর্গের কোন নিজস্ব প্রভাব থাকে না। একইভাবে কাশফের কিছু বিষয়ও কুদরতের সাথে সংশ্লিষ্ট। যেমন বুজুর্গের বিভিন্ন হালত অন্যের সামনে প্রকাশিত হওয়া। “সূত্র: আল-মু’জিযা ওয়াল কারামত, পৃ.৯-১০-১১।

ডাউনলোড লিংক:http://ia600409.us.archive.org/10/items/waq50062/50062.pdf

ইবনে তাইমিয়া রহ. এর উপর্যুক্ত বক্তব্য অনুযায়ী প্রত্যেকটি কারামতে অস্বাভাবিক ক্ষমতা বা গায়েবী বিষয়ের ইলম সংশ্লিষ্ট। সুতরাং কারামতকে যারা শিরক আখ্যা দেয়, তাদের মনস্তত্ব অনুযায়ী সকল কারামতই শিরক। নাউযুবিল্লাহ। কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত কারামত ও অন্যন্য কিতাবে বর্ণিত কারামতের মাঝে তাদের নিকট পার্থক্য এটুকু যে কুরআন ও হাদীসের কারামতকে মুখ ফুটে সরাসরি শিরক আখ্যা দেয় না, কিন্তু অন্যান্য কিতাবের কারামতকে অবলীলায় শিরক আখ্যা দেয়। এছাড়া শিরকের কারণ বর্ণনার ক্ষেত্রে এদুয়ের মাঝে তাদের নিকট কোন পার্থক্য নেই। মোটকথা, তথাকথিত সালাফী ও আহলে হাদীসদের যারা কারামতকে শিরক আখ্যা দেয়, তাদের মনস্তত্ব অনুযায়ী  সকল কারামতই শিরক।  সেটি কুরআন-হাদীসে বর্ণিত হোক, কিংবা অন্য কোন ঐতিহাসিক গ্রন্থে বর্ণিত হোক। তবে পার্থক্য এতটুকু যে, ঐতিহাসিক গ্রন্থে বর্ণিত কারামতকে সরাসরি শিরক বলে কিন্তু সাধারণ মানুষের ভয়ে  কুরআন-হাদীসের কারামতকে শিরক বলা থেকে বিরত থাকে। আল্লাহ এসকল কারামত অস্বীকারকারীদেরকে  হেদায়াত দান করুন। আমিন।

কারামত অস্বীকারকারীদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী আফগান জিহাদের কিছু কারামত নিয়ে আসুন আলোচনা করি। তারা যেসকল বিশ্লেষণের আলোকে কারামতকে শিরক বলে, আমরা তাদের দেখানো পদ্ধতি প্রয়োগ করে কিছু বিশ্লেষণ উল্লেখ করছি। রাশিয়ার সাথে আফগানিস্তানের মুজাহিদরা দীর্ঘ সময় যুদ্ধ করেছে।  সহায়-সম্বলহীন আফগান মুজাহিদরা তৎকালীন সুপার-পাওয়ারকে নাকানি -চুবানি দিয়ে পালাতে বাধ্য করেছে। এটি মুজাহিদদের অস্ত্র বা পেশীবলে ঘটেনি। একমাত্র আল্লাহর সাহায্যেই এ বিজয় অর্জিত হয়েছিল। আফগান জিহাদে মুজাহিদগণ  আল্লাহর অসংখ্য কুদরত ও নিদর্শন অবলোকন করেছেন। অনেক বুজুর্গ মুজাহিদদের হাতে প্রকাশিত হয়েছে অসংখ্য অলৌকিক কারামত। এ ধরনের কিছু কারামত সংকলন করেছেন জানবাজ মুজাহিদ শহীদ ড. আব্দুল্লাহ আজজাম। তার সংকলিত গ্রন্থটির আরবী নাম, আয়াতুর রহমান ফি জিহাদিল আফগান (আফগান জিহাদে আল্লাহর নিদর্শন)। এই কিতাবের ভূমিকায় তিনি কারামত অস্বীকারকারীদের মনস্তত্ব নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেছেন। বিশেষভাবে আফগান মুজাহিদ আব্দে রব্বির রাসূল সাইয়্যাফ  এই কিতাবের ভূমিকা লিখে দিয়েছেন। কিতাবের ভূমিকায় তিনি বলেন, وأما الذين يشككون في هذه الكرامات فأنا لا ألومهم لأنهم غارقون في نظراتهم المادية بعيدون عن واقع الجهادঅর্থ: “যারা এসব কারামতের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করে, আমি তাদেরকে ভর্সৎসনা করি না। কেননা তারা তাদের “বস্তুবাদী ধ্যান-ধারণায়” নিমজ্জিত আছে। তারা জিহাদের বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে। “

আব্দে রব্বির রাসূল সাইয়্যাফ একটি ধ্রুব সত্য তুলে ধরেছেন। বাস্তবে যারা কারামত অস্বীকার করে কিংবা একে কুফুরী শিরকী আখ্যা দেয়, হয়ত এদের মাথায় তথাকথিত ‘সহীহ আকিদার’ ভূত চেপেছে নতুবা এরা ইউরোপের বস্তুবাদী চেতনায়  নিমজ্জিত রয়েছে। মূল আলোচনা শুরুর পূর্বে  ড. আব্দুল্লাহ আজজামের এই কিতাব সম্পর্কে কারামত অস্বীকারকারীরা কী মনোভাব পোষণ করে তার একটি ছোট্র উদাহরণ উল্লেখ করব।

” ২০০৭ সালের আগস্ট মাসে সৌদি আরব থেকে প্রকাশিত আর-রিয়াদ পত্রিকায় ফারিস বিন হাজজাম একটি আর্টিকেল প্রকাশ করেন। তিনি এর নাম দেন, আকাজিবুশ শায়খ বা শায়খের মিথ্যাচার।  প্রবন্ধের সূচনা করেছেন তিনি এভাবে,

 “حدثني محمد منجل، قال: رأيت بعينيء الدبابة مرت على “أختر محمد” فلم يمت، ثم أخذوه مع اثنين من المجاهدين وأطلقوا على الثلاثة النار من الرشاش، فلم يمت”.هذا بعض من الكتاب الخرافي “آيات الرحمن في جهاد الأفغان”، لمؤلفه الشيخ عبدالله عزام، يرحمه الله، عراب القتال في أفغانستان. وما لم يأت في سير الأنبياء، عليهم السلام، تجده في حكاوي الشيخ عن القتلى.”

মুহাম্মাদ মুনজিল আমার কাছে বর্ণনা করেছে, আমি নিজ চোখে এই ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছি যে, মুজাহিদ আখতার মুহাম্মাদের শরীরের উপর দিয়ে শত্রুরা ট্যাংক চালিয়েছে, কিন্তু সে শহীদ হয়নি। এরপর তারা আখতার মুহাম্মাদ ও আরও দু’জন মুজাহিদকে ধরে নিয়ে তাদের উপর বিস্ফোরণ নিক্ষেপ করে। এরপরেও তারা শহীদ হয়নি। ‘এই হল শায়খ আব্দুল্লাহ আজজামের লেখা কুসংস্কারে ভরা  কিতাব আয়াতুর রহমান ফি জিহাদিল আফগান (আফগান জিহাদে আল্লাহর নিদর্শন) এর কুসংস্কারের কিছু নমুনা। নবীদের জীবনে যেসব ঘটনা ঘটেনি, শায়খের বর্ণনায়  আফগানিস্তানে মৃত মুজাহিদদের ক্ষেত্রে সেগুলো ঘটতে দেখবেন।

“সূত্র: http://www.alriyadh.com/275872

আমাদের দেশের সহীহ আকিদার ভাইয়েরা যেই যুক্তিতে কারামত অস্বীকার করেন, একই যুক্তি এই লেখক দেখিয়েছেন। নবী বা সাহাবীদের ক্ষেত্রে যেটি ঘটেনি, সেটি অমুক ওলীর ক্ষেত্রে ঘটেছে? এটা কি সম্ভব? ওমুক কি তাহলে নবী বা সাহাবীদের চেয়ে সম্মানিত হয়ে গেছে?এধরনের খোড়া যুক্তি দেখিয়ে তথাকথিত সহীহ আকিদার ভাইয়েরা কারামত অস্বীকার করে থাকে।  প্রিয় পাঠক,  লক্ষ করুন, কত ঔদ্ধত্যের সাথে  কারামতকে কুসংস্কার আখ্যা দিয়েছে ! ট্যাংকের নীচে কারও শহীদ না হওয়া যদি কুসংস্কার হয়, তাহলে ইবরাহীম আ. এর আগুনে পড়ার পরে সুস্থ থাকাকে কী বলা হবে? এভাবেই মানুষকে সালাফী আকিদার নামে, সহীহ আকিদার নামে পথভ্রষ্ট করা হচ্ছে। আকিদা বিশুদ্ধির নামে ঈমানহারা হওয়ার দাওয়াত দেয়া হচ্ছে।

কারামত সম্পর্কে আলোচনা ও কিতাবে কারামত উল্লেখ করাকে যারা কুসংস্কার ও বিদয়াত প্রচারের কারণ বলে মনে করেন, তাদের অভিযোগ খন্ডন করে ড. আব্দুল্লাহ আজজাম লিখেছেন, ” এই কিতাবের উপর চতুর্থ অভিযোগ হল, এধরনের ঘটনা প্রচারের মাধ্যমে মানুষের মাঝে কুসংস্কার ও বিদয়াত প্রসারিত হবে।  আমি বলব, সন্দেহ নেই, কুসংস্কারাচ্ছন্ন কেউ হয়ত একে কুসংস্কারের উৎস বানিয়ে এর দ্বারা ব্যাবসা করবে, কিংবা তার কুসংস্কারে ভরা চেতনার খোরাক যোগাবে, কিন্তু বাস্তবতা হল, সাহাবায়ে কেরাম রা. তাদের জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বদর প্রান্তে অবতীর্ণ ফেরেশতাদের কথা আলোচনা করতেন; তাদের আকিদায় তো কুসংস্কার বাসা বাধেনি? তাদের আকিদা তো ভ্রষ্ট হয়নি। মুসলমান ঐতিহাসিকগণ বিশেষভাবে ঐতিহাসিকদের মাঝে যারা মুহাদ্দিস ছিলেন যেমন ইবনে কাসীর তার আল-বিদায়াতে  এবং  ইবনুল আসীরসহ অন্যরা তাদের কিতাবে অসংখ্য কারামত উল্লেখ করেছেন।  হাদীসের এমন কোন কিতাব নেই যে কিতাবে সাহাবায়ে কেরামের ফজীলত ও মর্যাদা, তাদের কারামত ও বৈশিষ্ট উল্লেখ করা হয়নি। এগুলোকি পরবর্তী প্রজন্মের আকিদায় কোন প্রভাব ফেলেছে? এগুলোর কারণে কি মুসলিম উম্মাহের মাঝে বিদয়াত ছড়িয়ে পড়েছে? আমরা আমাদের এসব সালাফের (পূর্ববর্তীগণ) উত্তরসূরী। এক্ষেত্রে আমরা নতুন কিছুর অবতারণা করিনি, আমরা কেবল তাদের অনুসারী।” [সূত্র: আয়াতুর রহমান ফি জিহাদিল আফগান, শহীদ ড. আব্দুল্লাহ আজজাম, পৃ.৩৬]

ডাউনলোড লিংক: http://ia600508.us.archive.org/32/items/waq38881/38881.pdf

আলোচনা দীর্ঘ হওয়া আফগান মুজাহিদদের কারামত সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হল না। পরবর্তী পর্বে ইনশাআল্লাহ বিস্তারিত লিখব।

শহীদ হওয়ার তিন দিন পরে পিতার সাথে মুসাফাহা

শহীদ ড. আব্দুল্লাহ আজজাম রহ. তার আয়াতুর রহমান কিতাবের ১০২ নং পৃষ্ঠায় একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন।

ঘটনার বিবরণ নিম্নরূপ,

“আমার নিটক বিশিষ্ট মুজাহিদ ওমর হানিফ বর্ণনা করেছে, ১৯৮০ সালে রাশিয়া আফগানিস্তানে একটি বড় সেনাদল পাঠায়। তাদের সাথে সত্তরটি ট্যাং ছিল। সাথে বিপুল পরিমাণ অন্যান্য সমরাস্ত্র ছিল। এ সেনাদলকে বারটি হেলিকপ্টার নিরাপত্তা দিচ্ছিল।  তাদের মোকাবেলায় ১১৫ জনের একটি মুজাহিদ বাহিনী অগ্রসর হয়।  কাফেরদের সাথে প্রচন্ড লড়াই হয়। অবশেষে শত্রু পরাজিত হয়ে পলায়ন করে। মুজাহিদ বাহিনী তাদের ১৩ টি ট্যাং ধ্বংস করে।  মুজাহিদদের মাঝে ৪ জন শাহাদাৎ বরণ করে।  এদের মাঝে ইবনে জান্নাত গুল নামে এক ভাই ছিলেন। আমরা তাকে যুদ্ধের ময়দানে দাফন করে আসি। তিন দিন পরে আমরা সেখানে গিয়ে তাকে তার পিতার কবরস্থানে দাফনের জন্য স্থানান্তর করি। তার পিতা জান্নাত গুল এসে ছেলেকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

” প্রিয় ছেলে !, তুমি যদি শহীদ হয়ে থাকো, তাহলে আমাকে তোমার শাহাদাতের একটি নিদর্শন দেখাও? হঠাৎ শহীদ ছেলেটি হাত  বাড়িয়ে তার পিতার সাথে মুসাফাহা করল এবং তাকে সালাম দিল। এমনকি  মুসাফাহা করে পনের মিনিট যাবৎ পিতার হাত ধরে রাখল। এরপর হাত তার ক্ষতস্থানে রাখল। শহীদের পিতা পরে বলেছেন, ছেলে মুসাহাফা করার সময় এতো জোরে চাপ দিচ্ছিল যে আমার হাত ভেঙ্গে যাওয়ার আশংকা হচ্ছিল।  উমর হানিফ বলেন, এই ঘটনা আমি নিজের চোখে দেখেছি।

[সূত্র:আয়াতুর রহমান ফি জিহাদিল আফগান, পৃ. ১০২-১০৩ , লিংক: http://ia600508.us.archive.org/32/items/waq38881/38881.pdf ]

 

 

একজন তথাকথিত সহীহ আকিদার সালাফী-আহলে হাদীস ভাইয়েরা এই ঘটনাকে কীভাবে শিরকের অভিযোগে অভিযুক্ত করে, তার একটি নমুনা দেখি। ১. প্রথমত ইবনে জান্নাত গুল শহীদ হয়ে গিয়েছে।  সুতরাং তার পক্ষে নড়া-চড়া করাই সম্ভব নয়। সে কীভাবে হাত উঠিয়ে মুসাফাহা করবে?

এধরনের একটি ঐতিহাসিক ঘটনা রয়েছে আহমাদ রিফায়ী রহ. সম্পর্কে। রাসূল স. তার রওজা থেকে হাত বের করে আহমাদ রিফায়ী রহ. এর সাথে মুসাফা করেন। ঘটনাটি জালালুদ্দিনী সূয়ূতী রহ. সহ অনেকেই বর্ণনা করেন। সম্প্রতি এই ঘটনার উপর তাহকীক করে তিন শ পৃষ্ঠার অধিক একটি গবেষণাপত্র বের হয়েছে। আমাদের আলোচ্য বিষয় এটি নয়।  ড. আব্দুল্লাহ আজজামের বর্ণনা ও আহমাদ রিফায়ী রহ. এর ঘটনা মৌলিক দিক থেকে একই।  আহমাদ রিফায়ী রহ. এর ঘটনা সম্পর্কে  তথাকথিত সালাফী মতবাদের অনুসারী সৌদি মুফতী বোর্ডের কাছে একটি ফতোয়া জিজ্ঞাসা করা হয়। ফাজাইলে আমলে যেহেতু আহমাদ রিফায়ী রহ. এর ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে, একারণে ফাজায়েলে আমল সম্পর্কে ফতোয়া জিজ্ঞাসা করা হয়। ফতোয়ার সার-সংক্ষেপ হল,

১.   الأصل في الميت نبيًّا كان أم غيره أنه لا يتحرك في قبره بمد يد أو غيرها

 “মৃত মানুষের ক্ষেত্রে মূল বিষয় হল, তিনি নবী হোক বা অন্য কেউ, তিনি নড়া-চড়া করতে পারেন না। হাত-নাড়ানো বা অন্য কোন ধরনের নড়া-চড়া সম্ভব নয়।

 ২. রাসূল স. আবু বকর ও উমর রা. এর সাথে হাত বাড়িয়ে মুসাফা করলেন না, অথচ আহমাদ রিফায়ী এর সাথে মুসাফা করলেন?

 ৩.  ولا تجوز الصلاة خلف من يعتقد صحة هذه القصة؛ لأنه مصدق بالخرافات ومختل العقيدة”

এই ঘটনা যে বিশ্বাস করে, তার পিছে নামায হবে না। কেননা সে কুসংস্কারপূর্ণ ঘটনায় বিশ্বাস রাখে এবং তার আকিদা বিকৃত”.

 ولا تجوز قراءة كتاب (فضائل أعمال) وغيره مما يشتمل على الخرافات والحكايات المكذوبة على الناس في المساجد أو غيرها؛ لما في ذلك من تضليل الناس ونشر الخرافات بينهم.”

ফাজায়েলে আ’মাল বা এজাতীয় যেসব কিতাবে এধনরের কুসংস্কারপূর্ণ ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে, সেগুলো পড়া জায়েজ নয়। মসজিদে বা অন্য কোথাও সাধারণ মানুষের সামনে এগুলো পড়া জায়েজ হবে না। কেননা এগুলোর দ্বারা তাদেরকে পথভ্রষ্ট করা হবে এবং তাদের মাঝে কুসংস্কার ছড়ানো হবে।”

ফতোয়ায় সাক্ষর করেছেন, ড.বকর আবু যায়েদ,সালেহ আল-ফাউজান,আব্দুল আজিজ বিন আব্দুল্লাহ আলুশ শায়খ,আব্দুল্লাহ গাদইয়ান

[সূত্র:http://www.alifta.net/fatawa/fatawaDetails.aspx?BookID=3&View=Page&PageNo=5&PageID=11014&languagename=]

এই ফতোয়ায় তথাকথিত সালাফী শায়খরা যেসব ধৃষ্টতাপূর্ণ বক্তব্য লিখেছে, এর বিস্তারিত জবাব ইনশাআল্লাহ অন্য কোন সময় লিখব। সংক্ষেপে কয়েকটি বিষয় লিখছি।প্রথমত: তারা একটি মূলনীতি উল্লেখ করেছে যে, মৃতের পক্ষে নড়া-চড়া সম্ভব নয়। সে নবী হোক বা অন্য কেউ।     এসব সালাফী শায়খদেরকে ছোট্র একটি প্রশ্ন করতে চাই, রাসূল স. মিরাজের রাতে মুসা আ.কে তার কবরে ‘দাড়িয়ে’ নামাজ পড়তে দেখেছেন। মুসলিম শরীফসহ বহু হাদীসের কিতাবে হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে।  হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত এই হাদীসের আরবী পাঠ,

مررت على موسى ليلة أسري بي عند الكثيب الأحمر وهو قائم يصلي في قبره

[রেফারেন্স,http://library.islamweb.net/hadith/hadithServices.php?type=1&cid=1256&sid=720 ]

মুসা আ. যে তার কবরে দাড়িয়ে নামাজ পড়ছিলেন, এটা কি আপনারা বিশ্বাস করেন না কি অস্বীকার করেন? এটা কে সম্ভব বলেন না কি অসম্ভব বলেন? এছাড়াও মিরাজের রাতে সমস্ত নবী বাইতুল মুকাদ্দাসে উপস্থিত হলেন এবং বোখারী মুসলিম সহ প্রায় সকল হাদীসের কিতাবে বিভিন্ন আসমানে নবীদের সাথে রাসূল স. এর কথোপকথন রয়েছে। এগুলো বিশ্বাস করেন না কি এগুলোও অস্বীকার করেন? এগুলোকে কি কুসংস্কার বলে ছুড়ে ফেলার ফতোয়া দেন? এধরনের ঘটনা বিশ্বাস করলে তার পিছে নামায হবে না। রাসূল স. মুসা আ. এর কবরে নামাযের ঘটনা বর্ণনা করেছেন, রাসূল স. এর পিছে কি সাহাবাদের নামায হয়েছে? রাসূল স. নিজে মি’রাজের ঘটনা বর্ণনা করেছেন, তাহলে কি রাসূল স. এর পিছে সাহাবীদের নামায হত না? এধরনের ঘটনা বর্ণনা করে হাদীসের কিতাবগুলো কি উম্মতের মাঝে কুসংস্কার ছড়িয়েছে? হাদীসের কিতাব কি তাহলে উম্মতের আকিদা নষ্ট করেছে? আপনারা ফতোয়া দিয়েছেন, যেসব কিতাবে এই জাতীয় ঘটনা থাকবে সেগুলো পড়া জায়েজ নয়। তাহলে বোখারী-মুসলিম পড়া কি বৈধ? আপনাদের ফতোয়াটি শুধু আহমাদ রিফায়ী রহ. এর ঘটনা সংশ্লিষ্ট নয়, আপনারা স্পষ্ট লিখেছেন,  যেসব কিতাবে এজাতীয় ঘটনা থাকবে সেগুলো মসজিদে বা অন্য কোথাও পড়া জায়েয নয়। বোখারী-মুসলিমের কথা না হয় বাদই দিলাম, পবিত্র কুরআনে মৃত জীবিত হওয়ার যেসব ঘটনা বর্ণিত হয়েছে, সেগুলো সম্পর্কে আপনাদের ফতোয়া কি ? সেগুলোকেও কি কুসংস্কার বলে ছুড়ে ফেলবেন?  গাভীর গোশ্তের স্পর্শে মুসা আ. এর এক উম্মত জীবিত হওয়ার ঘটনা সূরা বাকারায় রয়েছে। এটাও কি খুরাফাত বা কুসংস্কার? এধরনের অসংখ্য উদাহরণ কুরআন ও হাদীসে রয়েছে। মূল কথা হল, তথাকথিত সহীহ আকিদার ধোয়া তুলে মানুষকে যারা মূল কুরআন-সুন্নাহের প্রতি আস্থাহীন করে তুলছে, তাদের বাস্তবতা বড় ভয়ংকর।

ইবনে তাইমিয়া রহ. তার কিতাবে লিখেছেন,

وقد يكون إحياء الموتى على يد أتباع الأنبياء (ع) كما وقع لطائفة من هذه الأمة

“কখনও নবীদের অনুসারী উম্মতের হাতেও মৃতকে জীবিত করার ঘটনা ঘটতে পারে। যেমন, রাসূল স. এর উম্মতের অনেকের ক্ষেত্রে এই ঘটনা ঘটেছে। “[আন-নুবুওয়াত, পৃ.২৯৮]ইবনে তাইমিয়া রহ. এর এই ফতোয়ার কারণে কিন্তু এসব সালাফী শায়খরা কখনও এই ফতোয়া দেননি যে, ইবনে তাইমিয়া রহ. এর নিজের নামায হত না, এবং তার পিছে যারা নামায পড়ত তাদেরও নামায হত না। সেই সাথে ইবনে ইবনে তাইমিয়া রহ. এর কিতাবও পড়া জায়েজ নয়, কারণ এগুলো মানুষের আকিদা নষ্ট করে এবং এতে কুসংস্কার রয়েছে। মৃত ব্যক্তি নড়া-চড়া করা তো দূরে থাক, ওলী-বুজুর্গের হাতে মৃত ব্যক্তি জীবিত হলেও তাদের নিকট আকিদা নষ্ট হয় না। তবে শর্ত হল, উক্ত আলেম তাদের ঘরানার হতে হবে। কিন্তু অন্য কোন মতের অনুসারী কোন আলেম যদি এই কথা লিখত, তাহলে ঠিকই মুফতী বোর্ড ফতোয়া বের করত, অমুকের কিতাব পড়া জায়েজ নয়। তার কিতাব বাতিল আকিদা ও কুসংস্কারে ভরা। কিন্তু তাদের অনুসরণীয় ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. এর চেয়েও মারাত্মক কোন বিষয় লিখলেও সেগুলো সহীহ আকিদা হিসেবেই বিবেচিত হয়। আসলে এখানে হিন্দু সমাজে প্রচলিত প্রবাদই প্রতিপাদ্য। যত দোষ নন্দ-ঘোষ।

যাই হোক, সৌদি মুফতী বোর্ডের উক্ত ফতোয়া অনুযায়ী আমরা যেই উপসংহার টানতে পারি,  শহীদ ড. আব্দুল্লাহ আজজামের পিছে নামায পড়া বৈধ নয়। তার কিতাব  আয়াতুর রহমান পড়া জায়েজ নয়। ড. আব্দুল্লাহ আজজামের আকিদা বাতিল ও বিকৃত ছিল। এধরনের ঘটনা কুসংস্কার। এগুলো বর্ণনা করার মাধ্যমে ড. আব্দুল্লাহ আজজাম সাধারণ মানুষের মাঝে কুসংস্কার ছড়িয়েছেন, এবং তাদের আকিদা বিনষ্ট করেছেন।

২. তথাকথিত সালাফী-আহলে হাদীসদের মনস্তত্ব অনুযায়ী শহীদ আব্দুল্লাহ আজজামের উক্ত ঘটনায় সহীহ আকিদা বিরোধী আরেকটি বিষয় হল, মৃত ব্যক্তি শুনতে পায় না। দাফনের তিন দিন পরে যাকে উঠানো হয়েছে সে কীভাবে তার পিতার কথা শুনল?৩. তথাকথিত সহীহ আকিদার ভাইদের মনস্তত্ব অনুযায়ী উক্ত ঘটনার উপর তৃতীয় অভিযোগ হল, শহীদ হওয়ার তিন দিন পরে সে কীভাবে টের পেল যে তার পিতা তার সাথে কথা বলছে? সে কি গায়েব জানে?  সে যদি গায়েব না জানত, তাহলে তো তার পিতাকে চেনার কথা নয়। সুতরাং এটি সহীহ আকিদা বিরোধী শিরকী ঘটনা। ৪. তিন আগে মারা যাওয়া ব্যক্তি সালাম দিয়ে হাত বাড়িয়ে মুসাফাহা করার মত কুসংস্কার যে কিতাবে রয়েছে সেটি পড়া বা প্রচার করা বৈধ নয়। সুতরাং ড. আব্দুল্লাহ আজজামের এই কুসংস্কারপূর্ণ কিতাব পড়া ও প্রচার করা জায়েয নয়। এটি হল তথাকথিত কারামত অস্বীকারকারীদের সর্বশেষ মনস্তত্ব।

আল্লাহ তায়ালা সহীহ আকিদার নামে সাধারণ মানুষকে যারা ভ্রান্তির অতল তলে নিমজ্জিত করার চেষ্টা করছে, তাদের সবাইকে হেদায়াত দান করুন। আমীন।

জানবাজ মুজাহিদ শহীদ ড. আব্দুল্লাহ আজজাম রহ. এর বিখ্যাত কিতাব “আয়াতুর রহমান ফি জিহাদিল আফগান”(আফগান জিহাদে আল্লাহর নিদর্শনসমূহ)। আফগান মুজাহিদদের অলৌকিক কারামতসমূহের সংকলন। জিহাদের ময়দানে মুজাহিদরা কী পরিমাণ আল্লাহর রহমত ও আল্লাহর নিদর্শন অবলোকন করেন, তার জীবন্ত প্রতিচ্ছবি একেছেন শায়খ। ইমানের বলে বলীয়ান মুজাহিদদের কারামতগুলো দুর্বল ইমানের মুসলমানদেরকে অনুপ্রাণিত করে। তাদেরকে রহমত ও নুসরাতের আশায় উজ্জীবিত করে।

কিন্তু দু:কজনক হলেও সত্য, উম্মাহের মাঝে বিচ্ছিন্নতা ও বিভক্তি সৃষ্টিকারী একটি দল এসব কারামত নিয়ে তামাশা করতে ব্যস্ত। এগুলো তাদের কাছে শুধু তামাশাই নয়, নিয়মিত কুফুরী-শিরকীও। এগুলোকে তারা অবলীলায় শিরকের তকমা  লাগান। আমরা  পূর্বের দু’পর্বে  তাদের মনস্তত্ব নিয়ে আলোচনা করেছি।

আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের একটি স্বীকৃত আকিদা হল, মৃত ব্যক্তি শুনতে পায়। কবরের কাছে গিয়ে সালাম দিলে শুনতে পায়। কবরের কাছে কথা বললে মৃত ব্যক্তি শুনতে পায়, এটা আহলে সুন্নতের সুস্পষ্ট আকিদা। কুরআন ও হাদীস দ্বারা প্রমাণিত এই স্বীকৃত আকিদাকে  তথাকথিত সহীহ আকিদার ভাইয়েরা শিরক বলে থাকেন। তাদের মতে, মৃত ব্যক্তি জড়বস্তুর ন্যায়। কোন কিছু শুনতে পায় না। এমনকি মৃত ব্যক্তি নড়া-চড়া করতে পারে, এধরনের বিশ্বাস রাখলে তার পিছনে নামায হবে না। অথচ তাদের এ বক্তব্য সুস্পষ্ট কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী। মৃত ব্যক্তির উপর কবরের আজাব হয়। মৃত ব্যক্তি ভালো হলে জান্নাতের নেয়ামত ভোগ করতে থাকে। মৃত ব্যক্তি যদি জড়বস্তুর ন্যায় হয়, তাহলে তার উপর আজাব হয় কীভাবে? সত্য কথা হল,  যারা মৃত ব্যক্তিকে জড়বস্তুর মতো মনে করে, তারা মূলত: কবরের আজাবকেও অস্বীকার করে।

মৃত ব্যক্তির শ্রবণ সংক্রান্ত দু’টি কারামত ড. আব্দুল্লাহ আজজাম রহ. এর বই থেকে উদ্ধৃত করছি।

কারামত-১:

আমার নিকট যুবাইর মির আলম বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, “আমাদের সাথী মুজাহিদ মির আগা শহীদ হলেন। তার কাছে ক্লাশিন কভ  ছিল।  মুজাহিদগণ তার ক্লাশিনকভ নিতে এলে তিনি এটি দিতে অস্বীকার করলেন। শহীদ মির আগাকে যখন তার বাড়ীতে আনা হল, তার  পিতা  কাজী  মীর সুলতান বললেন, ” বৎস, ক্লাশিনকভটি তোমার নয়। এটি মুজাহিদদের “।  এরপর সে ক্লাশিনকভটি ফেলে দিল।

[আয়াতুর রহমান ফি জিহাদিল আফগান, পৃ. ১২৬]

 

কারামত অস্বীকারকারী বস্তুবাদী  তথাকথিত সহীহ আকিদার আহলে হাদীস-সালাফী চোখ বিস্ফোরিত করে বলবে, মৃত ব্যক্তি কীভাবে  শুনতে পেল? মৃত ব্যক্তি কীভাবে ক্লাশিনকভ আটকে রাখল? মৃত ব্যক্তি কীভাবে পিতার কথা শুনে ক্লাশিনকভ ফেলে দিল? মৃত ব্যক্তি কীভাবে  বুঝল, এটা তার পিতা? ……..। সুতরাং এসব শিরক। কুরআন বিরোধী কথা। নাউযুবিল্লাহ……।

আহলে সুন্নতের আকিদায় বিশ্বাসী বলবেন, এটি মৃত ব্যক্তির নিজস্ব ক্ষমতা নয়। এটা আল্লাহর দেয়া ক্ষমতা। আল্লাহ তায়ালার সাহায্যেই  তার হাতে কারামত প্রকাশিত হয়েছে। আল্লাহ তায়ালাই তাকে শ্রবণ ও অনুধাবনের ক্ষমতা দিয়েছেন। এটাতে শিরকের কিছুই নেই যে, আপনি এভাবে আতকে উঠবেন। তবে আপনি যদি পশ্চিমাদের বস্তুবাদী ধ্যান-ধারণায় নিমগ্ন থাকেন, তাহলে আপনি মৃত ব্যক্তিকে জড়বস্তু  বিশ্বাস করতে পারেন।

কারামত-২:

আমার নিকট মুজাহিদ উমর হানিফ বর্ণনা করেছেন, উমর ইয়াকুব নামক একজন মুজাহিদ জিহাদকে খুব মহব্বত করতেন। তিনি এক যুদ্ধে  শাহাদাত বরণ করলেন। আমরা তান নিকট উপস্থিত হলাম।  তাকে তার আকড়ে থাকতে দেখলাম। আমরা তার কাছ থেকে বন্দুক  নেয়ার  চেষ্টা করলাম। কিন্তু আমরা নিতে পারলাম না। কিছুক্ষণ পর আমরা তাকে উদ্দেশ্য করে বললাম, “ইয়াকুব, আমরা তোমার ভাই। ” এই কথা শুনে হঠাৎ সে বন্দুকটি ছেড়ে দিল।

[আয়াতুর রহমান ফি জিহাদিল আফগান, পৃ.১০৩]

মৃত ব্যক্তি শুনতে পাওয়ার আকিদাকে যারা শিরক বলেন, তারা হয়তো প্রথম ঘটনাতেই শায়খ আজজামকে শিরকের অপবাদ দিয়ে  দিয়েছেন। শায়খ এসব ঘটনা লিখে শিরক প্রচার করেছেন। মৃত ব্যক্তি জড় বস্তুর ন্যায। সে কীভাবে শুনতে পায়? সুতরাং শায়খ  আজ্জাম আমাদেরকে কবরপূজার দিক নিয়ে যাচ্ছেন…….।

সহীহ আকিদার ভাইটি যদি একটু মধ্যম পন্থার হন, তাহলে হয়তো বলবেন, এসব কুসংস্কার প্রচার না করাই ভালো। আমাদেরকে সহীহ আকিদা প্রচার করতে হবে। কুসংস্কার থেকে বেচে থাকতে হবে।

আমরা আহলে সুন্নতের অনুসারীগণ তাদেরকে বিনয়ের সঙ্গে বলব, ওলীগণের কারামত সত্য। এতে কুসংস্কারের কিছু নেই। মৃত ব্যক্তি  শুনতে পায় এটি বিশুদ্ধ আকিদা। মৃত ব্যক্তি জড় বস্তুর ন্যায় নয়। বরং সে কবরে হয়তো আজাব ভোগ করে অথবা জান্নাতের নেয়ামত ভোগ করে।  সে পাথর বা জড়পদার্থের মতো নির্জীব নয়। আল্লাহ সবাইকে দ্বীনের সহীহ বুঝ দান করুন। আমীন।

Print Friendly