পাকিস্তানের বিখ্যাত আলেম শায়খ মুহাম্মদ ইসমাইল মুহাম্মাদী সাহেব দা,বা এর তিন খন্ডের একটি উর্দূ কিতাব "তোহফায়ে আহলে হাদীস"। এ কিতাবে মূলত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে শায়খের সাথে গায়রে মুকাল্লিদ ভাইদের  কথোপকথন  একত্রিত করা হয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ কিতাবটির ১ম খন্ড বাংলা ভাষায় অনূদিত হয়েছে। অনুবাদ করেছেন মুফতি অকিল উদ্দিন যশরী। আমাদের আজকের আলোচিত বিষয় "এক হাতে মুসাফাহ করা"।

হানাফী: আসসালামু আলাইকুম! জনাব কেমন আছেন?

গায়রে মুকাল্লিদ: ওয়ালাইকুমুস সালাম! জ্বী ভাল আছি! আজ হঠাৎ কি মনে করে?

হানাফী: আপনাকে এখানে কয়েকবার নামায আদায় করতে দেখেছি, ভেবেছিলাম আপনার সাথে কিছু সময় বসে কিছু কথা জিজ্ঞাসা করব। আজ মন চাইল তাই বসে গেলাম।

গায়রে মুকাল্লিদ: খুব ভাল! যেহেতু মন চেয়েছে, বসেছেন, তবে মন খুলে প্রশ্ন করতে পারেন। ৪সহীহ হাদীসের আলোকে নামাযে আস্তে আমীন বলা।

হানাফী: জ্বী জনাব আপনাকে পূর্ব থেকেই খেয়াল করছি, আপনি যখন নামায পড়েন, তখন মাথা থেকে টুপি খুলে নিচে নিক্ষেপ করেন, ডান হাত বাম কনুইয়ের উপর বাঁধেন এবং গরদান বাকা করে পাকে খুব চওড়া করে দাড়ান। এগুলো আমার বুঝে আসেনা। সংক্ষেপে বর্ণনা দিন।

গায়রে মুকাল্লিদ: অবশ্যই ব্যাখ্যা দিব- আমরা এ জন্যই করে থাকি যেন মানুষ আমাদের থেকে প্রশ্ন করে। আর আমরা মানুষদের ফিক্হ (ইসলামী আইন) থেকে দুরে সরিয়ে কুরআন ও হাদীসে লাগাতে পারি।

হানাফী: ভাইয়া খুব ভাল! এই মাসআলাগুলি আলোচনা ও যাচাইয়ের পূর্বে যে এক হাত দ্বারা মুসাফাহা করেন তার ব্যাখ্যা করুন।

গায়রে মুকাল্লিদ: হ্যাঁ, অবশ্যই! মূল আলোচনার পূর্বে আমার কথা কান খুলে শুনুন যে, আমরা কুরআন ও হাদীস ব্যতিত ফেকাহ ঠেকাহ মানিনা। আমাদের যে মাসআলাই হোক আমরা ডিরেক্টলি কুরআন ও হাদীস থেকে গ্রহণ করি। কোন সাহাবী বা ইমামের কথা হয়, তবে তাকে আরামসে ডাস্টবিনে নিক্ষেপ করি। আর আমরা কোন ইমামের তাকলীদ করিনা।

হানাফী: ভাইয়া অনেক ভাল! আপনার কথাই সঠিক। কুরআন ও হাদীসের বিপরীতে যদি কোন কথা হয় তবে তা অবশ্যই আমলযোগ্য নয়। যেহেতু তা সহীহ হাদীসের উল্টা এবং কুরআনের সাংঘর্ষিক।

গায়রে মুকাল্লিদ: দেখুন আপনি যে নামাযের আলোচনার পূর্বেই মুসাফাহা করার মাসআলা ধরলেন, দু হাতে মুসাফাহা করার কোন হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নয়। বরং যেখানেই সালাম মুসাফাহা করার হাদীস এসেছে (ইয়াদ) يد শব্দ এসেছে। আর (ইয়াদ) يد ৫সহীহ হাদীসের আলোকে নামাযে আস্তে আমীন বলা শুধুমাত্র এক হাতকেই বলে। আরবীতে দু হাতকে يدان (ইয়াদানি) বলে।

হানাফী: ভাইজান! প্রথম কথা হলো يد (ইয়াদ) শুধুমাত্র এক হাতকে বলে এটি ভুল। বরং এটি جنساسم (ইসমে জিন্স)। আর ইসমে জিন্স কম-বেশী দু’টিই হতে পারে। যদি يد (ইয়াদ) শব্দ দ্বারা আপনি শুধু এক হাত উদ্দেশ্য নেন, তবে ডান হাত কোন হাদীসের অনুবাদ?

গায়রে মুকাল্লিদ: আপনি তো ইলমি আলোচনা নস্যাৎ করতে চান। আমাকে শুধুমাত্র দু’ হাতের শব্দ দেখান। আর ইহায় যথেষ্ট!

হানাফী: ভাইয়া আমি প্রথমে আপনার সাথে বিস্তারিত আলোচনার অনুমতি চেয়েছিলাম। যথেষ্ট বললে হবে না। বরং বিস্তারিত হতে হবে। দেখুন হাদীসে ডান হাতে ইসতিন্জা করার নিষেধাজ্ঞা এসেছে। আর বাম হাতে খাবার খেতে নিষেধাজ্ঞা এসেছে। ঐ রকমভাবে আপনি কুরআনের কোন আয়াত বা হাদীসের দ্বারা ডান হাতে মুসাফাহা করা এবং বাম হাতে মুসাফাহা করার নিষেধাজ্ঞা প্রমাণ করেন। তবে আপনার দাবী দলিলযুক্ত হবে। যার অস্বীকার করা কোন মতেই সম্ভব হবে না। শুধু يد (ইয়াদ) দ্বারা এক হাত উদ্দেশ্য নেয়া এবং পুণরায় সেটা ডান হাত বলা এটি কিভাবে আপনি প্রমাণ করলেন?

গায়রে মুকাল্লিদ: আমাকে দু’হাতের শব্দ দেখান এবং সেটাও বুখারী শরীফে। ইহা ব্যতিত অন্য কোন গ্রন্থ উপস্থাপন করবেন না।

হানাফী: ভাইজান অসুন্তুষ্ট হচ্ছেন? এখন পর্যন্ত আপনি নিজের দাবী কোন গ্রন্থ দ্বারা প্রমাণ করতে পারেন নাই। আর আমার থেকে শুধু বুখারী শরীফ থেকে ৬সহীহ হাদীসের আলোকে নামাযে আস্তে আমীন বলা দলিল চান? আপনি যদি আমার থেকে বুখারী শরীফের থেকে দলিল চান, তবে আমিও প্রতিটি মাসআলা আপনার থেকে বুখারী শরীফ থেকেই দলিল চাইব। আপনি যদি দ্বীনের প্রতিটি জিনিস বুখারী শরীফ থেকে গ্রহণ করে থাকেন, তবে আমাকেও বুখারী শরীফের বাধ্যবাধকতা করতে পারেন নতুবা নয়।

গায়রে মুকাল্লিদ: সেই মাসআলাগুলি কি কি? যা আমরা মানি এবং তার আমলও করি কিন্তু তা বুখারী শরিফে নেই?

হানাফী: ভাইয়া আপনাদের নিদর্শনের মধ্যে একটি বুকের উপর হাত বাঁধা! বুখারী শরীফ তো দুরের কথা সিহাহে সিত্তাতেও নেই।

গায়রে মুকাল্লিদ: এটা কিভাবে সম্ভব? আমাদের মাসআলায়ে হাদীস সিহাহে সিত্তাতেও নেই? দেখুন বুকে হাত বাঁধা ইহা মারাসীলে আবী দাউদে এসেছে।

হানাফী: ভাইজান! মারাসীলে আবী দাউদ সিহাহে সিত্তার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত নয়। বরং ইমাম আবু দাউদের পৃথক একটি পুস্তিকা। এটাকে সুনানে আবী দাউদ এর সাথে বাধাইকৃত। যার দ্বারা ভুল বুঝাবুঝি  হয়েছে। যেভাবে শামায়েলে তিরমিযি, তিরমিযি শরীফের সাথে বাধাই করা হয়েছে। অথচ সেটি একটি ভিন্ন কিতাব। দ্বিতীয় মুরসাল হাদীস গায়রে মুকাল্লিদ ওলামা দলিল মানেন না।

গায়রে মুকাল্লিদ: আমাদের কোন কোন মাসআলা যা বুখারী শরীফে নেই?

হানাফী: ১. বুকে হাত বাঁধা। ২.টাখনু চওড়া করা। ৩. পা খাড়া করা। ৪. আপনাদের আযান বুখারী শরিফে নেই। ৫. আপনার রাকাত বুখারী শরিফে নেই। অর্থাৎ ৭সহীহ হাদীসের আলোকে নামাযে আস্তে আমীন বলা প্রত্যেক নামাযের কত রাকাত ফরয, কত রাকাত সুন্নাত। ৬. নামাযের ফরয, ওয়াজিব, নামাযের মাকরুহ বুখারী শরিফে নেই। ৭. আপনারা যেভাবে জানাযা পড়েন তার ব্যাখ্যা বুখারী শরিফে নেই। ৮. ঈদের নামায পড়ার তরীকা বুখারী শরিফে নেই। ৯. বসে প্রসাব করা বুখারী শরিফে নেই। ১০. আপনারা আপনাদের ঝান্ডাতে তরবারী বানিয়ে তার উপর কালিমা লিখেছেন এ দু’টাই বুখারী শরিফ তো দুরের কথা দুনিয়ার কোন কিতাব দ্বারা প্রমাণিত নয় যে, রাসুল সা. এর ঝান্ডার উপর তরবারী ও কালিমাও। বরং এটি বিদাত। যদি অন্য মানুষ নামাযের পর কালিমা জোরে পড়ে তবে তারা বিদআতি হয়, তবে আপনারা নতুন ঝান্ডা বানিয়ে আপনারা বেদআতি নয়? এটা কোথার ইনসাফ? মাত্র দশটি বললাম।

গায়রে মুকাল্লিদ: আমাকে শুধু দু’ হাত দ্বারা মুসাফাহা করার হাদীস দেখান।

হানাফী: ভাইজান! জানিনা আপনি কখনো বুখারী শরিফ দেখেছেন কি-না? বুখারী শরীফে ইমাম বুখারী  পরিচ্ছেদের নাম দিয়েছেন المصافحةباب তার নিচেই মুসাফাহার হাদীস এনেছেন। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে  মাসউদ রা. বলেন হুজুর সা. এর দু’ হাতের মাঝে আমার হাত ছিল (كفي بين كفيه)

গায়রে মুকাল্লিদ: আপনি ভুল বর্ণনা করেেলন, এখানে মুসাফাহা করার কোন আলোচনা নেই।

হানাফী: কোন ভুল বর্ণনা করিনি বরং ইমাম বুখারী এই হাদীসকে المصافحةباب মুসাফাহা অধ্যায়ে এনেছেন।

গায়রে মুকাল্লিদ: আমরা পরিচ্ছেদ ঠরিচ্ছেদ মানিনা। আমরা শুধু হুজুর সা. এর হাদীস মানি। ৮সহীহ হাদীসের আলোকে নামাযে আস্তে আমীন বলা।

হানাফী: ভাইজান! ইমামদের পিছনে সুরা ফাতেহা পড়ার মাসআলায় ইমাম বুখারী যে পরিচ্ছেদ দাড়  করিয়েছেন। যখন সুরা ফাতেহার মাসআলা আসে তখন পরিচ্ছেদ ঠরিচ্ছেদ মানেন। আর এখন পরিচ্ছেদ  ঠরিচ্ছেদ অস্বীকার করেন। এটা الكتاب ببعضتومنون ببعضوتكفرون এর মত হচ্ছেনা? দ্বিতীয় মাসআলা রফয়ে ইয়াদাইন তরক বিষয়ে যখন আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাত পাগলা ঘোড়া ওয়ালা রেওয়ায়েত পেশ করে, ঐ সময় গায়রে মুকাল্লিদ ওহাবী চিল্লাপাল্লা করে মুসলিম শরিফ দেখুন, ঐখানে বুখারী শরিফের পরিচ্ছেদেও নয় ইমাম মুসলিমেরও পরিচ্ছেদেও নয়্। বরং ইমাম নববী এ পরিচ্ছেদ দাড় করিয়েছেন। সেটা باب الصلاة في بالسكونالامر(নামায়ে শান্ত থাকা পরিচ্ছেদ)। ভাইজান! এ সময় আপনার সকল পরিচ্ছেদ স্বরণে আসে। আর যখন আপনার বিপরীত ইমাম বুখারীর পরিচ্ছেদ আসে, তখনই হঠাৎ বলে দিলেন আমরা পরিচ্ছেদ ঠরিচ্ছেদ মানিনা।

গায়রে মুকাল্লিদ: আমি পরিচ্ছেদ মানি। কিন্তু দেখেন এতে নিঃসন্দেহে রাসুল সা. দুই হাত দিয়েছেন। কিন্তু সাহাবী এক হাত দিয়েছেন তাই না?

হানাফী: জ্বী ভাইজান! রাসুল সা. এর সাহাবী এক হাত বাড়িয়েছেন। এটি কোন শব্দের থেকে প্রমাণিত?

গায়রে মুকাল্লিদ: كفيه بينكفي আমার এক হাত রাসুল সা. এর দু’ হাতের মাঝে ছিল।

হানাফী: প্রিয় ভাইজান! আপনি একটু আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিন। দু’ হাত সামনে বাড়ান দেখুন মুসাফাহা চলছে। আপনার দু’ হাত, কিন্তু ৯সহীহ হাদীসের আলোকে নামাযে আস্তে আমীন বলা আমার দু’ হাতের মাঝে যে হাত আছে, সেটা একটিই হাত। দ্বিয়ীতটা বাহিরে। ঐরকমভাবে আমারও একটি হাত আপনার দু’ হাতের মাঝখানে। এর দ্বারা কিভাবে বুঝলেন যে সাহাবীর এক হাত ছিল? সাহাবায়ে কেরাম তো রাসুলের ইশারাও অনুসরণ করতেন। আর এটা থেকে এটা বলা যে, রাসুল সা. দু’ হাত দিয়েছেন আর সাহাবী এক হাত দিয়েছেন এটা অসম্ভব। তারপরও যদি সামান্য সময়ের জন্যও মেনে নেয়, তবে সাহাবী এক হাত দিয়েছেন। এক্ষেত্রেও আমাদের জন্য রাসুল সা. এর সিরাত ও তরীকা গ্রহণ করাই প্রধান্য পাবে। অনেক জায়গায় যখন আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত সাহাবায়ে কেরামের কথা পেশ করেন তখন আপনারা তার সাথে বিরুদ্ধাচারন করেন। আর বলেন যে, সাহাবীর কথা দলিল নয়। আমরা মানিনা। ( তারাবীহ, তালাক ইত্যাদি মাসআলাতে)।

গায়রে মুকাল্লিদ: আমরা দু’ হাত দিলে নবীদের সাথে সমাঞ্জস্যতা হবে। এ জন্য এক হাত দেয়।

হানাফী: ভাইজান! আমরা যদি এক হাত দেয় তবে সাহাবিদের সাথে সমাঞ্জস্য হবে। আর তাই আমার খেয়াল হল, শুধুমাত্র আঙ্গুল মেলানো উচিত। যাতে করে নবী সাহাবী কারো সাথে সমাঞ্জস্যতা না হয়। ভাই এটি শুধু হাদীস থেকে জান বাচানোর তরীকা। ইহা ছাড়া কিছুই নয়।

গায়রে মুকাল্লিদ: আপনি يد(ইয়াদ) ওয়ালা প্রশ্নের উত্তর দেননি। আর তার বিস্তারিত ব্যাখ্যাও বলেননি।আমি বলি يد(ইয়াদ) এর অর্থ শুধু মাত্র এক হাত।

হানাফী: يد (ইয়াদ) এর অর্থ এক হাত করা হলে আপনার জন্যই ক্ষতিকারক। কেননা হাদীসে এসেছে, منالمسلمويده لسانه من المسلمونسلم মুসলমান ঐ ব্যক্তি যার হাত ও ১০সহীহ হাদীসের আলোকে নামাযে আস্তে আমীন বলা মুখ হতে অপর মুসলমান নিরাপদে থাকে। তবে আপনার নিকট অর্থ হবে, ডান হাত দ্বারা কাউকে কষ্ট দিবেনা। তবে বাম হাত দ্বারা মারলে, পকেট কাটলে, ছুরি মারলে, কাউকে হত্যা করলে কোন সমস্যা নেই। এটি জায়েয।

গায়রে মুকাল্লিদ: হ্যাঁ, বন্ধু এ অর্থ তো বাস্তবেই ভুল। আচ্ছা এক হাতে মুসাফাহা কারা করে?

হানাফী: ইংরেজ করে ও এক হাত মিলায়।

গায়রে মুকাল্লিদ: আমাদের বাহীনিতেও এক হাতে মিলানোর নিয়ম। আপনি বাহীনিকে মানেন না?

হানাফী: ভাইজান! বাহীনিতে অন্যান্য নিয়মাবলীর  মধ্যে এটিও একটি। কুরআন হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নয়। এখন আপনি বাহীনির আশ্রয় নিচ্ছেন। অথচ আপনি বলেছিলেন, কুরআন হাদীসের বাইরে যাবনা। যা হোক নবীর সুন্নাত হল, দু’ হাতে মুসাফাহ করা। আল্লাহ আপনাকে মানার তৌফিক দান করুন। আমীন।

Print Friendly