শায়খের মুরীদ: শায়খ অনেক পেরেশানীতে আছি!
শায়খ: কেন? কী হয়েছে?
মুরীদ: আপনি বলেছেন, মাজহাব ছেড়ে কুরআন-হাদীসের উপর আমল করতে। আমি মাজহাব ছাড়ার চেষ্টা করলেও মাজহাব আমার পিছু ছাড়ছে না। যে মাসআলায় আমল করছি, মাজহাবের ভেতরেই ঘুরপাক খাচ্ছে। কোনভাবেই মাজহাব ছাড়তে পারছি না। কোন মাসআলায় অনেক চেষ্টার পরেও যদি বের হই, তাহলে সেটা বিদয়াত হয়ে যাচ্ছে। বিদয়াত না হলেও কিছু কিছু আলেম বলছেন এগুলো ভুল। বহু চেষ্টা করে হাতটা নাভীর নীচ থেকে বুকের উপরের অংশে আনলাম। কিন্তু ড.বকর আবু যায়েদ বলে দিলেন, এটা না কি নতুন সৃষ্টি। এখন কি শায়খ মাথার উপর হাত বাধবো? বহু চেষ্টা করে পায়ের সাথে পা মিলিয়ে নামায পড়া শুরু করলাম। কিছু দিন পরে দেখালাম ইবনে বাজ ও ইবনে ইসাইমিন রহ. এর বিরোধীতা করেছেন। মাজহাব ছাড়তেও পারছি না। আবার ছাড়লেও সেটা না কি ঠিক হচ্ছে না। কী বিপদ বলুন তো শায়খ?

শায়খ: কে কী বললো, তুমি সেসব দেখো কেন? সরাসরি কুরআন-হাদীস মানো। আমরা ইবনে তাইমিয়াকেও মানি না, ইবনে বাজকেও মানি না। আমরা সরাসরি কুরআন হাদীস মানি।
মুরীদ : এই খানেই তো বিপত্তি শায়খ। কুরআনের আয়াতগুলো বিভিন্ন অথর্ রাখে। কুরু শব্দের অথর্ হায়েজ। আবার কুরু মানেই পবিত্রতা। এভাবে কুরআন থেকে মাসআলা বুঝতে গিয়েই তো মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে। এসব বিষয়ে যে বই-ই পড়ছি, সেখানে এসব মাজহাবী ইমামদের কথা রয়েছে।

শায়খ: তুমি এখনোও কামেল মুজতাহিদ হতে পারোনি। পরিপূণর্ মুজতাহিদ হলে এসব সমস‍্যা থাকবে না।

মুরীদ: পরিপূণর্ মুজতাহিদ কীভাবে হবো। সমস‍্যা তো শায়খ এখানেই শেষ নয়। হাদীস মানতে গিয়ে দেখি হাদীসের কতো শ্রেণি বিভাগ। একজন একটাকে সহীহ বলছে, অপরজন সেটাকেই জয়ীফ বলছে। একজন জাল বলছে, আরেকজন কেমনে কেমনে সেটাকেই সহীহ বানিয়ে দিচ্ছে। এবার তাহলে আমাকে কামেল মুজতাহিদ হওয়ার পথ বলে দেন?

শায়খ: তোমার পছন্দ অনুযায়ী একটাকে গ্রহণ করবা। আর বলবা, এটাই একমাত্র শরীয়ত। এটাই বিশুদ্ধ। এর বাইরে যা আছে সব বাতিল। ব‍্যাস। তুমি কামেল হয়ে গেলে।
মুরীদ : অন‍্যরা যদি আমার বিরোধীতা করে?

শায়খ : করলে করুক। তুমি নিজেকে সব সময় হকের উপর মনে করবা। অত‍্যন্ত কনফিডেন্সের সাথে বলবা তোমারটাই সঠিক।
মুরীদ : ঠিক বলেছেন শায়খ। আত্মতৃপ্তি অনেক বড় গুণ। কামেল মুজতাহিদ হলে এটা অজর্িত হবে। যদিও মাজহাবীরা এখনও কামেল মুজতাহিদ হয়নি। অন‍্যদেরটাও সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা আছে বলে। তবে আমরা কিন্তু একমাত্র আমাদেরটাই সঠিক বলবো। একটু কনফিডেন্সের সাথে আমারটাই সত‍্য না বললে মানুষ তো খাবে না।

শায়খ : হুম। তাহলে তো তোমার কাছে বিষয়টা ক্লিয়ার। কুরআন হাদীস পড়বা। ইমামদের বিভিন্ন মতবিরোধ যাচাই-বাছাই করবা। এর মধে‍্য যেটা তোমার কাছে পছন্দনীয় ও শক্তিশালী মনে হয় সেটাকে একমাত্র শরীয়ত বলে চালিয়ে দিবা। কোন পেরেশানী থাকবে না। তোমার কথার বিপরীতে যদি ইবনে তাইমিয়া রহ. এর কথাও থাকে, তাহলে সাফ বলে দিবা, আমরা তো ইবনে তাইমিয়ার কালিমা পড়িনি। আমরা রাসূল স.এর কালিমা পড়েছি। কুরআন -হাদীসের বাইরে ইবনে তাইমিয়াও আমাদের দলিল নয়। একটা বিষয়ে সতকর্ থাকবা। তুমি যে কারও গবেষণাকে কুরআন হাদীস বলে চালিয়ে দিচ্ছো এটা কিন্তু ঘুনাক্ষরেও বুঝতে দিবা না। তাইলে কিন্তু শেষ। সব সময় নিজের গবেষণা ও পছন্দকে কুরআন – হাদীস মনে করবা।
মুরীদ: জাযাকাল্লাহ শায়খ। বহুত উমদা নুসখা বললেন। এখন তো নিজেকে অনেক হালকা লাগছে। বাসায় গিয়েই ইজতিহাদ শুরু করে দিবো।

শায়খ: আল্লাহ তোমার ইজতিহাদে বরকত দান করুন। বারাকাল্লাহু ফিক। তোমাদের দেখে আমার দিল ঠান্ডা হয়ে যায়। আহ। সমাজে কতো মুজতাহিদ বাড়ছে। আগের যুগে দু’একজন মুজতাহিদ ছিলো। তাও আবার কামেল না। এখন তো আমরা ঘরে ঘরে কামেল মুজতাহিদ তৈরি করছি। আর শোনো, আমার সম্পাদনায় বোখারীর নতুন অনুবাদ বেরিয়েছে। ওটা কিনে নিও। ইজতিহাদ করতে গেলে এরকম সহীহ দু’একটা অনুবাদ রাখার দরকার আছে।
মুরীদ : জি, শায়খ। আপনার তাহকীক করা সবগুলো বই আছে। ইজতিহাদে এগুলো প্রায়ই কাজে লাগে।

২য় আসর

———

মুরীদ: শায়খ, আল্লাহ আপনাকে উত্তম জাযা দান করুন। আপনার দেয়া পরামশর্ অনুযায়ী ইজতিহাদ (গবেষণা) করে যাচ্ছি। এলাকায় কিছু ইয়াং পোলাপানও আছে। আগে তেমন তোয়াক্কা করত না। এখন আমার কথা মনযোগ দিয়ে শোনে। কেউ কেউ তো আমার ভক্ত হয়ে গেছে। ওদের সামনে মাঝে মাঝে নিজের ইজতিহাদগুলোর উপর লেকচার দেই। বেশ ভালোই কাটছে। তবে একটা বিপত্তি শায়খ। সমস‍্যাটা বেশ জটিল আকার ধারণ করছে।

শায়খ: কী সমস‍্যা?

মুরীদ: আপনাদের মতো শায়খদের কিতাব পড়েই মূলত: ইজতিহাদ করছি। আপনি বলেছিলেন, যেটা আমার কাছে শক্তিশালী মনে হয়, সেটাকেই একমাত্র সত‍্য বলতে। কিন্তু এখন একটা ঝামেলা দেখা দিয়েছে। একজন শায়খের দলীল দেখে মনে হয় সেটাই সঠিক। খুব শক্তভাবে সেই শায়খের কথাগুলো নিলাম। এলাকার পোলাপানকেও বললাম, এটাই একমাত্র সত‍্য। কিছু দিন পরে আরেক শায়খের কিতাব পড়তে গিয়ে দেখি মহা ঝামেলা। তার দলীলগুলো ভালো লাগতে শুরু করেছে। এখন আমার নিজের ইজতিহাদই পরিবতর্ন হয়ে যাচ্ছে। আজকে ধরুন, গালিব স‍্যারের কিতাব পড়ে ইজতিহাদ করলাম। গালিব স‍্যারের কথাটাকেই শরীয়ত মনে করে প্রচার করলাম। কিছু দিন পরে শায়খ আকরামুজ্জামানের কথাটা বেশি শক্তিশালী মনে হয়। তার কথায় শরীয়ত মনে হতে থাকে। এভাবে বার বার আমার নিজের ইজতিহাদই পরিবতর্ন হয়ে যাচ্ছে। এলাকায় একটাকে শরীয়ত হিসেবে প্রচার করে সেটাকে তো উল্টানো যায় না। একমাত্র সত‍্য তো আর দুই তিনটা হয় না। কিছু পোলাপান এখন আমার ইজতিহাদ নিয়েই সন্দেহ শুরু করে দিয়েছে। এটার একটা সমাধান দরকার শায়খ।

শায়খ: এই সমস‍্যা ইদানীং আমাকেও ভাবিয়ে তুলছে। আমাদের আলেমদের অনেক মতবিরোধ মাজহাবীরা জেনে ফেলেছে। তবে এটার একটা সমাধান আছে। তোমার ইজতিহাদ যদি পরিবর্তনও হয়, তাহলে এটা নিয়ে পেরেশান হবা না। মনে করো, বারো মাসে বারজন শায়খের কিতাব পড়ে তোমার বার রকম ইজতিহাদ হলো। এক্ষেত্রে তুমি বলবা, আমাদের ইজতিহাদ পরিবর্তন হওয়াটাই আমাদের হকপন্থী হওয়ার দলীল। এটাই প্রমাণ করে যে, আমরা কুরআন-হাদীসের কথা পেলে নিজের পছন্দ বা রায়কে যে কোন সময় দেয়ালে ছুড়ে মারি। কুরআন-হাদীসের বক্তবে‍্যর সামনে আমরা গালিব স‍্যারকেও তোয়াক্কা করি না। তোমার সর্বশেষ মতামতটা যদিও কোন আলেমের গবেষণা, এরপরও কথাটা একটু জোর দিয়ে বলবা। তাহলে দেখবা মাজহাবীরা ভড়কে গেছে। আরেকটা সেইফ সলুউশন আছে। তুমি আরেকটু মেচিউরড হলে সেটা বলতাম।

মুরীদ: শায়খ, এখনই বলুন। আপনার পরামশর্ে তো আমি অসম্ভব ফায়দা পাচ্ছি। এলাকার পোলাপান এখন আমাকে অনেক সমীহ করে। নিজের মধে‍্যও একটা আলেম আলেম ভাব আসে।

শায়খ: তোমার ইজতিহাদ যে পরিবতর্ন হচ্ছে, এটা বুঝতে দিবা না। মাজহাবীদেরকে সব-সময় ব‍্যতিব‍্যস্ত রাখবা। যেমন, তাদের বিভিন্ন ফতোয়া নিয়ে সমালোচনা করবা। তাদেরকে যদি ব‍্যস্ত রাখতে পারো, তাহলে ওরা আর তোমার ইজতিহাদের পরিবর্তন ধরতে পারবে না।

মুরীদ: এলাকার যেসব পোলাপান আমার কথায় চলে, তাদেরকে কী বোঝাবো?

শায়খ: তাদেরকে বলবা, আমাদের শায়খগণ সবাই মানুষ। তারা ভুল করতেই পারেন। তাদের দু’একজনের ভুলের কারণে তো আমাদের পুরো মানহাজ ভুল হতে পারে না। এগুলো তো তাদের ভুলও নয়। শুধু ইজতিহাদের পরিবর্তন। মুক্তিপ্রাপ্ত দলের মধে‍্য এজাতীয় দু’একটা ইজতেহাদী পার্থক‍্য থাকতেই পারে। তবে একটা জিনিসের উপর সবচেয়ে বেশি জোর দিবে। তাদেরকে বলবে, দেখো, আমরাই একমাত্র মুক্তিপ্রাপ্ত দল। না’জি ফেরকা। আমাদের জামাতের বাইরে কেউ-ই মুক্তিপ্রাপ্ত দল নয়। হকের উপর থাকতে হলে মুক্তিপ্রাপ্ত দলের সাথে থাকতে হবে। মুক্তিপ্রাপ্ত দলের ইজতিহাদে এদিক-সেদিক হলে কোন অসুবিধা নেই। এদের মুক্তি পাওয়া তো নিশ্চিত।

মুরীদ: জি, শায়খ। আহলে হাদীসরাই একমাত্র মুক্তিপ্রাপ্ত দল। এ দলের মাঝেই সত‍্য নিহিত। এর বাইরে কোন সত‍্য নেই। একথা আমি সব-সময় প্রচার করি। তাদেরকে বলি, দুনিয়াতে এভাবে মুক্তির সনদ অন‍্য কোন দল দিবে না। একমাত্র আহলে হাদীসরাই দিয়েছে। আমাদের সংখ‍্যা যদিও কম, এরপরও সবচেয়ে বড় শান্তনা হলো, আমরা মুক্তিপ্রাপ্ত। সুতরাং পরকালীন মুক্তি নিশ্চিত করতে হলে আমাদের সাথ থাকতে হবে। নতুবা কী হবে সেটা আকারে ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দেই। সুযোগ পেলে বলেও দেই। জাহান্নাম ছাড়া কি এদের গতি আছে!

শায়খ: হুম। তোমার কথা ঠিক আছে। তবে ঢালাওভাবে আহলে হাদীস বললে একটু ভুল হবে। এই বিষয়টা একটু খেয়াল রাইখো। তুমি তো জানো। আহলে হাদীসদের মধে‍্যও এখন কিছু ফেইক আহলে হাদীস হয়েছে। ওদেরকে তো আর মুক্তিপ্রাপ্ত বলতে পারি না। ওরা তো ফেইক আহলে হাদীস।

মুরীদ: শায়খ, এ বিষয়ে মোটেও টেনশন করবেন না। একমাত্র জমিয়তে আহলে হাদীসকেই মুক্তিপ্রাপ্ত দল মনে করি। আহলে হাদীস আন্দোলনের ওরা আবার কবে থেকে আহলে হাদীস হলো? ওদেরকে মুক্তিপ্রাপ্ত বলবো কোন দু:খে?

শায়খ: ঠিক বলেছো। তোমার মতো এমন মজবুত মানহাজের লোকই আমাদের চাই। এলাকার কিছু পোলাপানকেও এরকম তৈরি করো। মুক্তিপ্রাপ্ত দলকে একটু ভারি করো।

মুরীদ: ইনশা আল্লাহ শায়খ। জান-প্রাণ দিয়ে চেষ্টা করবো।

শায়খ: আল্লাহ তোমার দাওয়াতী মেহনতকে কবুল করেন। আমীন।

 

Print Friendly