শরীয়তের যেসব মাসআলায় গবেষণার সুযোগ রয়েছে এগুলোকে ইজতিহাদী মাসআলা বলে। ইজতিহাদী মাসআলাগুলো নিয়েই মূলত: মতবিরোধ হয়ে থাকে। মতবিরোধপূণর্ ইজতিহাদী মাসআলার ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সত‍্য কোনটি, তা বের করার তিন’টি পদ্ধতি রয়েছে।
১. আল্লাহর পক্ষ থেকে চূড়ান্ত সতে‍্যর ব‍্যাপারে ফয়সালা আসা। যেমন বদর যুদ্ধের বন্দীদের ব‍্যাপারে চূড়ান্ত সত‍্যটি আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনের মাধ‍্যমে জানিয়ে দিয়েছেন।
২.সরাসরি রাসূল স.কে জিজ্ঞাসা করে জেনে নেয়া।
৩. মুসলিম উম্মাহের মাঝে ইজমা সংগঠিত হওয়া। কারণ রাসূল স. বলেছেন, আমার উম্মত ভ্রষ্টতার উপর একমত হবে না।

এ তিনটি পদ্ধতি ছাড়া চূড়ান্ত সত‍্য বের করার তৃতীয় কোন মাধ‍্যম নেই। আল্লাহর পক্ষ থেকে নতুনভাবে যেহেতু ওহী আসবে না এবং রাসূল স.ও দুনিয়াতে জীবিত নন, একারণে প্রথম দু’টি পথ বন্ধ। তৃতীয় পদ্ধতির ক্ষেত্রে শরীয়তের নির্দেশনা হলো মুসলিম উম্মাহর ইজমার সাথে একমত হওয়া। এখানে ইজতিহাদ ও ইখতিলাফ না করা। ইজমা থেকে বের না হওয়া। কোন মাসআলায় যখন ইজমা হয়ে যায়, তখন সেটি আর ইজতিহাদী মাসআলা থাকে না।

কিছু কিছু মাসআলা রয়েছে যেগুলো আলেমদের ভুল। এগুলোকে তাদের বিচ্ছিন্ন মত বলে। আরবীতে যাকে শুযুয ও তাফাররুদাত বলা হয়। এধরণের বিচ্ছিন্ন মতামতের ক্ষেত্রে তাদের এই বক্তব‍্যগুলোকে মতবিরোধপূণর্ বলাটাও আরেকটা ভুল। এজাতীয় মাসআলায় তাদের অনুসরণ করাও বৈধ নয়।

ইজমা এবং আলেমদের বিচ্ছিন্ন মতামত ছাড়া অন‍্যান‍্য ইজতিহাদী মাসআলার ক্ষেত্রে মৌলিক কথা হলো, এগুলোর ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সত‍্য আমাদের অজানা। রাসূল স. এর দুনিয়াতে জীবিত না থাকা এবং ওহীর দরজা বন্ধ থাকার কারণে চূড়ান্ত সত‍্য আমরা জানতে পারছি না। প্রকৃত ইজতিহাদী মাসআলায় চূড়ান্ত সতে‍্য পৌছার দাবি করাটায় ভুল। কিছু লোক ধোঁকায় পড়ে রয়েছে। তারা মনে করে, ইজতিহাদী মাসআলায় চূড়ান্ত সতে‍্য পৌঁছে গেছে। এটি ধোকা ছাড়া কিছুই নয়। যে বিষয়টি শরীয়তের পক্ষ থেকেই জানানো হয়নি, সেক্ষেত্রে চূড়ান্ত সতে‍্য পৌছার দাবিটাই হাস‍্যকর। অথচ আমাদের সমাজে এধরনের রুগীর সংখ‍্যাই বেশি।

যেসব মাসআলায় চূড়ান্ত সত‍্য আমাদের অজানা, সেসব মাসআলায় চূড়ান্তে সতে‍্য পৌছার দাবি করাটা মারাত্মক অন‍্যায়। এক্ষেত্রে নিজের গবেষণাকেই মূলত: চূড়ান্ত সত‍্য বলা হয়। অথচ আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী ব‍্যতীত এধরণের সিদ্ধান্ত দেয়াটা অজানা বিষয়ে হস্তক্ষেপের অন্তর্ভূক্ত। যেসব ভাইয়েরা নিজেদের গবেষণাকেই চূড়ান্ত সত‍্য বলে প্রচার করেন, তারা মূলত: শরীয়তের বিষয়ে না জেনে কথা বলেন। এদেরকে তো আল্লাহ তায়ালা বলেননি যে, এটাই সত‍্য। উভয় ধরণের বক্তবে‍্যর যখন সম্ভাবনা রয়েছে এবং উভয় পক্ষেই যখন দলিল রয়েছে, তখন নিজের দলিলগুলো চূড়ান্ত মনে করার অনুমতি আপনাকে কে দিলো? দলিলের আলোকে আপনি একটাকে প্রাধান‍্য দিতে পারেন। কিন্তু চূড়ান্ত সত‍্য বলে নিশ্চয়তা দেয়ার অধিকার আপনার নেই। একটা দলিলকে গবেষণার মাধ‍্যমে আরেকটার উপর প্রাধান‍্য দেয়াটা কখনও চূড়ান্ত সত‍্য হতে পারে না। আপনার কাছে যদি ওহী না আসে, তাহলে আপনি কীভাবে জানলেন, এটাই চূড়ান্ত সত‍্য?
আপনি বলবেন, আমার পক্ষে তো কুরআন-হাদীসের দলিল আছে। আপনার প্রতিপক্ষের কাছেও তো কুরআন-হাদীসের দলিল আছে। আপনারটা কুরআন-হাদীস হলে তারটা কি রামায়ণ না মহাভারত? তারটাও কুরআন-হাদীস। আপনি যেভাবে কিছু ইঙ্গিত ও দলিলের কারণে আপনারটাকে গ্রহণ করছেন, সেও একই কাজ করছে। আপনার মধে‍্য আর তার মধে‍্য কোথাও কোন পার্থক‍্য নেই। সুতরাং আপনার বক্তব‍্যকেই চূড়ান্ত সত‍্য মনে করার অথর্ হলো, আপনার প্রতিপক্ষের কুরআন-হাদীসের দলিলকে মিথ‍্যা প্রতিপন্ন করা। অথচ এধরণের কাজ কতটা গর্হিত একটু ভেবে দেখুন। এক্ষেত্রে আপনি যে কাজটা করছেন,

১. যে বিষয়ে চূড়ান্ত সত‍্য আপনাকে জানানো হয়নি, সেক্ষেত্রে আপনি আপনার গবেষণাকে চূড়ান্ত মনে করে মূলত: নিজেকে আল্লাহ ও তার রাসূলের আসনে বসাচ্ছেন। কারণ মতবিরোধপূণর্ বিষয়ে চূড়ান্ত সত‍্য আল্লাহ এবং তার রাসূল জানেন।
২. আপনার দলিলগুলোকেই চূড়ান্ত সত‍্য মনে করার কারণে প্রতিপক্ষের দলিলগুলোকে আপনি চূড়ান্ত মিথ‍্যা বলছেন। অথচ কুরআন-হাদীসের দলিলকে মিথ‍্যা প্রতিপন্ন করার অধিকার আপনাকে দেয়া হয়নি।

এজন‍্য মাজহাবের আলেমগণের মূলনীতি হলো, মুজতাহিদগণ তাদের সাধ‍্য অনুযায়ী ইজতিহাদ করে একটাকে প্রাধান‍্য দিবেন। তিনি তারটাকে সঠিক মনে করবেন কিন্তু বলবেন যে, এটা আমার গবেষণা। এতে ভুলও হতে পারে। আবার আমার প্রতিপক্ষের গবেষণাও সঠিক হতে পারে। সম্পূর্ণ বিষয়টি সম্ভাবনাময়।

বিষয়টি বোঝার জন‍্য একটি উদাহরণ কল্পনা করুন। চারজন লঞ্চে করে বরিশাল যাচ্ছে। মাঝ নদীতে ইশার নামায পড়বে। কেউ জানে না কেবলা কোন দিকে। তাদেরকে কেবলা বলে দেয়ার মতোও কেউ নেই। এক্ষেত্রে শরীয়তের হুকুম হলো, প্রতে‍্যেকই তার প্রবল ধারণার উপর আমল করবে। চারজন তাদের প্রবল ধারণার উপর ভিত্তি করে চার দিকে মুখ করে নামায় আদায় করলো। শরীয়তের মাসআলা হলো, এক্ষেত্রে চারজনের নামাযই সঠিক।

প্রতে‍্যক নামাযী তার অন্তরে চিন্তা করছে, আমি যেদিকে নামায পড়ছি এদিকে কেবলা রয়েছে। তবে অন‍্যদিকে হওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে। এক্ষেত্রে প্রতে‍্যেকই তাদের প্রবল ধারণার উপর আমল করছে, কিন্তু প্রতিপক্ষকে একেবারে ভুল বলছে না।

সামগ্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে চারজনের নামাযই সঠিক। কেননা এ অবস্থায় শরীয়তের নিদর্েশই হলো প্রবল ধারণার উপর আমল করা। একইভাবে ইজতিহাদী মাসআলার ক্ষেত্রেও শরীয়তের নিদর্েশ হলো, মুজতাহিদ সাধ‍্য অনুযায়ী গবেষণা করবে। এক্ষেত্রে ভুল হলে এক সওয়াব। সঠিক হলে দু’সওয়াব। মুজতাহিদকে প্রতে‍্যকটি মাসআলার চূড়ান্ত সত‍্য বের করার দায়িত্ব দেয়া হয়নি। এজন‍্য ইজতিহাদী মাসআলায় নিজের গবেষণাকে চূড়ান্ত সত‍্য মনে করাটা মূলত: নিজেকে আল্লাহ ও তার রাসূলের আসনে বসানোর শামিল।

ইজতিহাদী মাসআলার ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সত‍্যটি অজানা হওয়ার কারণে চৌদ্দ শ’ বছরেও বহু মাসআলার চূড়ান্ত সমাধান হয়নি। ইমামের পেছনে মুক্তাদীর কেরাত পড়া লাগবে কি না, এ বিষয়ে পক্ষে-বিপক্ষ অসংখ‍্য কিতাব রয়েছে। সবার কাছেই দলিল আছে। এজন‍্য দেখা যায় ইমাম বোখারী রহ. জুযউল কিরায়া লিখেছেন। ইবনে তাইমিয়া রহ. ইমাম বোখারীর অনেক বক্তব‍্য খন্ডন করেছেন। হানাফী মাজহাবের আলেমগণের অসংখ‍্য কিতাব রয়েছে ইমামের পেছনে কিরায়াত না পড়ার উপর। এসব মাসআলায় আপনি যতোই লিখুন না কেন, চক্রাকারে ঘুরে এক জায়গায় চলে আসবেন। হয়তো আপনার মতটা প্রাধান‍্য দিতে পারবেন। এছাড়া তেমন কোন ফায়দা নেই। এতটুকু লাভ হবে যে, এ বিষয়ে নতুন একটা কিতাব বাজারে আসবে। অন‍্যান‍্য ইজতিহাদী মাসআলার স্বরূপও এমন। আল্লাহ তায়ালা আমাদের বোঝার তৌফিক দান করুন।

শরীয়তের যেসব মাসআলায় গবেষণার সুযোগ আছে, সেখানে চূড়ান্ত সত‍্যটি আমাদের অজানা। কেউ যদি দাবী করে যে, ইজতিহাদী মাসআলায় তার বক্তব‍্য বা মতই চূড়ান্ত, তাহলে তিনটি সম্ভাবনা আছে,
১. সে আল্লাহ অথবা আল্লাহর রাসূল ।
২. তার কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী আসে।
৩. উপরের দু’টি না ঘটে থাকলে এ লোকটি যে তার দাবীতে মিথু‍্যক, সেটাই চূড়ান্ত।

প্রথম দু’টি বিষয় ছাড়া রাসূল স. এর ইন্তেকালের পরে ইজতিহাদী মাসআলায় কোন মতকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বলে দেয়ার দাবীদার হয়তো চূড়ান্ত মিথ্যুক নতুবা নিজের মতকেই শরীয়ত বা ওহী মনে করে।

কো মুজতাহিদ ইমাম ইজতেহাদের ক্ষেত্রে এই দাবী করে না যে, তার মতটাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। হানাফীরা এই দাবী করে না যে, আমাদেরটাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। শাফেয়ীরা দাবী করে না যে, তাদের মতটাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। একইভাবে হাম্বলী-মালেকী কেউ-ই এই দাবী করে না। বরং সবাই বলে, বিষয়টি নিয়ে গবেষণার সুযোগ রয়েছে। উভয় পক্ষে শরীয়তের দলিল আছে। এসব দলিলের আলোকে আমি এটাকে প্রাধান‍্য দিয়েছি। আমার কাছে মনে হয়েছে, এটা সঠিক। হানাফীরা বলে, আমাদের গবেষণায় মনে হয়েছে, এটা সঠিক। তবে ভুলও হতে পারে। শাফেয়ীরাও একই কথা বলে। দলিলের আলোকে আমাদের কাছে এটা সঠিক মনে হয়েছে। তবে এটি ভুলও হতে পারে। এভাবে প্রতে‍্যক মাজহাব ও ইমাম একই কথা বলেন।

কিন্তু আমাদের আহলে হাদীস ভাইয়েরা সব সময় নিজেদের গবেষনাকে ওহীর মযর্াদা দিয়ে বলেন, তাদেরটাই চূড়ান্ত। তাদের এই বিষয়গুলো প্রমাণ করে, এরা হয়তো চূড়ান্ত মিথু‍্যক নতুবা নিজেদের বক্তব‍্য ও গবেষনাকে কুরআন-হাদীস মনে করে।
আমীন সফদর রহ. এদের সম্পকর্ে প্রায় বলতেন,
” আহলে হাদীসরা নিজেদেরকে নবী অথবা খোদা মনে করে, আর আমরা তাদেরকে ইমাম শাফেয়ী রহ. এর মুকাল্লিদ মনে করি”।

এদের ব‍্যাপারে আমনী সফদর রহ. এর বক্তব‍্য তিক্ত হলেও বাস্তব। এদেরকে প্রতিহত করা প্রতে‍্যক মুসলিমের ইমানী দায়িত্ব। নতুবা এরা নিজেরা তো ডুবেছে, পুরো ইসলামকে বিশ্বের সামনে ডুবাবে। ফেতনা ছোট থাকতেই দমনে উদে‍্যাগী হওয়া উচিৎ। এটা শুধু হুজুরদের দায়িত্ব মনে করলে ভুল হবে।

এদের জঘন‍্য অবস্থা দেখুন। উল্লেখ‍্য, টাকা দিয়ে সদকায়ে ফিতর আদায় হবে। চূড়ান্ত এই মিথ্যুকের প্রলাপে বিশ্বাস করার কোন প্রয়োজন নেই।
https://www.facebook.com/al.helal.184/posts/1714398452146173

Print Friendly