আমি বিভিন্ন সময়ে আকিদার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে লিখে থাকি। অালোচনায় অনেক ক্ষেত্রেই স্পষ্ট বলে থাকি যে, এটি তাউহীদ, এটি শিরক। এটি ইমান এবং এ বিষয়টি কুফুরী। যেমন গতকালের পোস্টে দু’টি আকিদা সম্পর্কে লিখেছিলাম, এ দু’টি বিশ্বাস জঘন্য শিরকী আকিদা।

১. আল্লাহ তায়ালা আরশে বসে আছেন।
২. আল্লাহ তায়ালা রাসূল স.কে আরশে তার সাথে বসাবেন।

আমি এখনও বলছি, বিষয় দু’টো অত্যন্ত গর্হিত শিরকী আকিদা। এখন প্রশ্ন হলো, পূর্ববর্তী কিছু আলেমের কিতাবে এই ধরণের আকিদা বিশ্বাস রয়েছে। যেমন ইবনে তাইমিয়া রহ. ও ইবনুল কাইয়্যিম রহ. এর কিতাবে। তাদেরও আগে আরও কিছু আলেমের কিতাবে এগুলো আছে। খাল্লালের আস-সুন্নাহ কিতাবে, আব্দুল্লাহ ইবনে আহমাদের নামে প্রসিদ্ধ আস-সুন্নাহ কিতাবে এগুলো রয়েছে। বরং কারও কারও কিতাবে এর চেয়েও জঘন্য আকিদা রয়েছে। যেমন ইবনে খোজাইমা রহ. এর কিতাবুত তাউহীদে খুবই জঘন্য কিছু আকিদা আছে। আব্দুল্লাহ ইবনে আহমদের আস-সুন্নাহ কিতাবের কথা তো বলার প্রয়োজন নেই। অনেক আকিদা মুখে আনাও সম্ভব নয়। ইবনে তাইমিয়া রহ ও তার ছাত্র ইবনুল কাইয়্যিম রহ. এর কিতাবেও এর চেয়ে জঘন্য আকিদা বিশ্বাস রয়েছে। উসমান ইবনে সাইদ আদ-দারিমির কিতাবে মারাত্মক আকিদা বিশ্বাস রয়েছে। এধরণের আরও অনেক কিতাব রয়েছে যেগুলোতে বিভিন্ন ধরণের শিরকী আকিদা রয়েছে।

মূল বিষয় হলো, যাদের কিতাবে এজাতীয় শিরকী বিষয় রয়ে গেছে, তাদের সম্পর্কে আমাদের ধারণা কী হওয়া উচিত? তাদেরকে কি আমরা মুশরিক মনে করবো? কুফুরী বিষয়ের কারণে তাদেরকে কাফের বলে দিবো?

খুব ভালো করে মনে রাখা উচিত, পূর্ববর্তীদের কারও কিতাবে কুফুরী-শিরকী বিষয় থাকলেই আমরা তাদেরকে কাফের ও মুশরিক মনে করি না। কখনও নয়। আমি একথা অবশ্যই বলব যে, আল্লাহ তায়ালা রাসূর স.কে আরশে তার সাথে বসাবেন, এই আকিদা শিরকী আকিদা। কিন্তু এই আকিদা ইবনে তাইমিয়া রহ. এর কিতাবে থাকলেও আমি তাকে মুশরিক বলি না। কখনও মনেও করিনি। এই আকিদা ইবনুল কাইয়্যিম রহ. এর কিতাবে আছে আমি জানি। কিন্তু কখনও ইবনুল কাইয়্যিম রহ. সম্পর্কে এই কল্পনাও আসেনি যে, তিনি মুশরিক।

এক্ষেত্রে কি আমি স্ববিরোধীতা করছি? একটা বিষয়কে শিরক বলেও যার মধ্যে এটি পাওয়া যাচ্ছে তাকে মুশরিক বলছি না।

এটা আসলে স্ববিরোধীাতা নয়। কারণ এখানে মূলত: দু’টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে।
১. কোন একটা বিষয় শরীয়তের দৃষ্টিতে শিরক কি না সেটা প্রমাণ করা।
২. নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে উক্ত বিষয়ের জন্য কাফের বা মুশরিক ফতোয়া দেয়া।

কুরআন সুন্নাহর অকাট্য মূলনীতি ও দলিলের আলোকে শরীয়তের দৃষ্টিতে কোনটা কূফুরী, কোনটা শিরকী সেটা বলা কঠিন কাজ নয়। কিন্তু কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে কাফের বা মুশরিক বলা খুবই মারাত্মক একটি বিষয়।

নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে তাকফির করার ক্ষেত্রে কয়েকটি মূলনীতি অবশ্যই মনে রাখতে হবে,

শরীয়তের মূলনীতি হলো, কেউ যদি মুসলিম হয়, তাহলে তাকে মুসলিম মনে করতে হবে। কেউ যদি আদেল বা ন্যায় পরায়ণ হয়, তাহলে যথাসাধ্য তাকে আদেল মনে করতে হবে। মূল বিষয় হলো, মুসলমানকে সাধারণ অবস্থায় মুসলমান বিশ্বাস করা।

উদাহরণ হিসেবে ধরুন, একজন লোক নিয়মিত নামাজ পড়ে। রোজা রাখে। আবার সে মাজারেও যায়। এই লোক সম্পর্কে সাধারণ বিশ্বাস রাখতে হবে যে, সে মুসলিম। যদিও মাজারে গিয়ে তার শিরক করার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু শুধু এই সম্ভাবনার কারণে তাকে মুশরিক মনে করা যাবে না। বরং তাকে তার মূল ইসলামের উপর বিশ্বাস করতে হবে।

এজন্য মূল বিষয় হলো, কেউ মুসলিম হিসেবে পরিচিত হলে তাকে সাধারণ অবস্থায় মুসলিমই মনে করতে হবে। ধারণা কিংবা অনুমানের উপর নির্ভর করে এক্ষেত্রে ফয়সালা করা জায়েজ নয়।

কারও মধ্যে যদি বাস্তবেই শরীয়তের দৃষ্টিতে প্রমাণিত শিরক বা কুফুরী পাওয়া যায়, এরপরও নির্দিষ্ট এই ব্যক্তিকে সরাসরি কাফের বা মুশরিক বলা যাবে না, যতক্ষণ না তার মধ্যে তাকফীরের শর্তসমূহ পাওয়া যাবে।

নির্দিষ্ট ব্যক্তির মধ্যে কুফুরী বা শিরকীর শর্তসমূহ আছে কি না, এটি যাচাইয়ের জন্য আলেমদের ফতোয়া জরুরি। মূল বিষয় হলো, এটার ফয়সালা দিবে কাজী। যেহেতু সব জায়গায় ইসলামী বিচার ব্যবস্থা নেই, এজন্য কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তি কাফের কি না, সব দিক যাচাই করে ফতোয়া দিবেন যোগ্য মুফতী।

সাধারণ মানুষ কখনও নির্দিষ্ট কোন মুসলমানকে শুধু তার কাজ বা ধারণার কারণে কাফের বা মুশরিক বলবে না।

কারও মধ্যে শিরক বা কুফুরী পাওয়া গেলেও তাকে বেশ কয়েকটি কারণে সরাসরি কাফের বা মুশরিক বলা যায় না। যেমন,
১. সে এ বিষয়ে অজ্ঞ বা জাহিল হওয়া। সে জানেই না যে, এটা কূফুরী বা শিরকী কাজ।
২. স্বেচ্ছায় কুফুরী বা শিরকীতে লিপ্ত না হওয়া। কূফুরী বি শিরকী কাজে যদি তার ইচ্ছা না পাওয়া যায়, তাহলে তাকে সরাসরি মুশরিক বলা যাবে না। যেমন, কেউ যদি শিরকী কাজের জন্য বাধ্য হয়, তাহলে তাকে মুশরিক ফতোয়া দেয়া যাবে না।

অত্যধিক আনন্দ, ভয় বা পেরেশানির কারণে কেউ যদি কুফুরী শিরকী কাজ করে তাহলেও তাকে মুশরিক বলা যায় না। মোটকথা , তার পূর্ণ ইচ্ছা না থাকলে তার উপর কুফুরী শিরকীর ফতোয়া প্রযোজ্য হবে না।

৩. তাবীল কারী না হওয়া। অর্থাত একটা বিষয় শিরক, কিন্তু যে এটা করছে তার কিছু সন্দেহের কারণে সে এটাকে শিরক মনে করছে না। অথবা সে শরীয়তের দলিল সঠিকভাবে না বোঝার কারণে শিরককে ইমান মনে করছে, তাহলে এক্ষেত্রেও সরাসরি তাকে কাফের বা মুশরিক বলা যাবে না।

জীবিত কারও মধ্যে যদি শরয়ী দৃষ্টিতে প্রমাণিত শিরক বা কুফুরী পাওয়া যায়, তাহলে তার উপর আগে হুজ্জত কায়েম করতে হবে। অর্থাত তাকে নিশ্চিত করতে হবে যে, এটি শিরক। তার কোন সন্দেহ, অজ্ঞতা, বা তাবীল থাকলে সেটাও দূর করতে হবে। এগুলো করার পর যদি তার মধ্যে স্বেচ্ছায় ওই শিরকী বা কুফুরী কাজটি পাওয়া যায়, তখন কোন যোগ্য মুফতী তার ব্যাপারে কাফের বা মুশরিক হওয়ার ফয়সালা দিবে।

এই মূলনীতিগুলো বর্তমানে সবারই গুরুত্ব সহকারে মনে রাখা উচিৎ। কিছু ভাই তো অতি আবেগের বশবর্তী হয়ে শুধু নিজেদের ধারণার উপর ভিত্তি করে কুফুরী শিরকীর অভিযোগ করে। এমনকি শরীয়তের দৃষ্টিতে শিরক প্রমাণিত নয়, এমন বিষয়কেও শিরক বলে প্রচার করে থাকে। এটা খুবই গর্হিত কাজ।

মূল আলোচনায় ফিরে আসি। পূর্ববর্তী যারা মুসলিম হিসেবে মারা গেছে, তাদের কিতাবে বা তাদের থেকে বর্ণিত কোন উদ্ধৃতির কারণে আমি কখনও কাউকে কাফের বা মুশরিক মনে করতে পারি না। কারণ তার এই কিতাব তাকে কাফের বলার মতো অকাট্য কোন দলিল নয়। তার এই উদ্ধৃতি তো কখনও তাকে কাফের বলার মতো দলিল হতে পারে না। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সে মৃত্যুপর্যন্ত এই কুফুরীর উপর অটল ছিলো কি না, সেটা জানারও কোন সুযোগ নেই। সুতরাং এখানে শুধু ধারণার উপর ভিত্তি করে তাকে কাফের বলতে হবে। এটাকে কখনও জায়েজ মনে করি না। আর যদি মুসলমান হিসেবে পরিচিত কেউ মৃত্যু পযর্ন্ত কুফুরীর উপর অটল থাকলেও তার ব্যাপারে কুফুরীর ফয়সালা দেয়া কঠিন। কারণ তার এই কাজের মধ্যে উপরের তিনটি বিষয় থাকতে পারে। সে হয়তো জানে না যে এটা কুফুরী। সে হয়তো বাধ্য হয়ে এটা করেছে। কিংবা সে তাবীল করার কারণে এটাকে কুফুরী মনে করতো না।

এজন্য মুসলমান হিসেবে পরিচিত পূর্ববর্তী কারও ব্যাপারে সুনিশ্চিত অকাট্য দলিল এবং তাকফীরের সকল শর্ত না পাওয়া পর্যন্ত তাকে কাফের বা মুশরিক মনে করার সুযোগ নেই।

পোস্ট বেশ বড় হয়ে গেল। তবে স্পর্শকাতর এই বিষয়টি সম্পর্কে সবারই সচেতন থাকা জরুরি।

Print Friendly