খতীব বাগদাদী রহ. তার ‘আল-জামে লি-আখলাকির রাবি ও আদাবিস সামে’ কিতাবে ইমাম আবু ইউসুফ রহ. থেকে একটি বর্ণনা উল্লেখ করেছেন।
الْعِلْمُ شَيْءٌ لا يُعْطِيكَ بَعْضَهُ حَتَّى تُعْطِيَهُ كُلَّكَ
অর্থ: ইলম এমন একটি জিনিস, সে তোমাকে তার কিছু অংশও দিবে না যতক্ষণ না তুমি নিজেকে পূর্ণভাবে তার কাছে সমর্পণ না করবে।

অন্যান্য সৃষ্টি থেকে মানুষের শ্রেষ্ঠত্যের একটি বিশেষ দিক হলো ইলম অর্জনের ক্ষমতা। এটি মানুষের জন্য আল্লাহর বিশেষ নিয়ামত। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় বিষয়টি উল্লেখ করেছেন।

ইলমের জন্য যেমন পিপাসা প্রয়োজন ঠিক তেমনি প্রয়োজন অধ্যবসায় ও পরিশ্রম। ইলমের পথে কোন শটকাট নেই। এ পথ দীর্ঘ। কন্টকাকীর্ণ। বন্ধুর এপথে পরিক্ষা দিতে হয়। ধৈর্য ও কষ্টের পরীক্ষা। ইলমের প্রতি আকুলতা ও ভালবাসার পরীক্ষা।

দু:খের বিষয় হলো ইলমের জন্য নিবেদিতপ্রাণ লোকের সংখ্যা খুবই কম। বর্তমান ফেতনার জামানা। চারিদিকে জাহালাতের ছড়াছড়ি। আলেমরাও এসব ফেতনায় জড়িয়ে পড়ছেন পর্যাপ্ত ইলম অর্জনের অভাবে। সাধারণ মানুষের অবস্থা তো আরও করুন। যুবক ভাইদের অবস্থাও দু:খজনক।

১. যুবক ভাইদের মধ্যে একটি মারাত্মক সমস্যা চোখে পড়ে। কোন বিষয়ের গভীরে না যাওয়া। ইলমের পথে তার যাত্রা হয়তো দু’মাসের কিংবা দু’বছরের। দু’মাস বা দু’বছর কি ইলমের জন্য যথেষ্ট? অনেককে তো দেখা যায় দু’একজন শায়খের দু’একটি লেকচার থেকেই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে যান। অথচ বিষয়টি এতটা সহজ নয়।

২. ইলম মানেই হলো অজানা বিষয়ের জ্ঞান। এই জ্ঞান বাড়তে থাকলে নিজের মধ্যে একটা ভালো লাগা কাজ করে। তবে অনেকের ক্ষেত্রে এটি অহংকারে রূপ নেয়। যাদের মধ্যে ইলমের অহংকার ঢুকে যায়, এদের জন্য ইলম রহমত হয় না। এটি তার ক্ষতির কারণ হয়ে যায়।

অনেক বড় জ্ঞানী হলেই এই অহংকার আসবে, বিষয়টা এমন নয়। অনেককে দেখা যায়, খুব সামান্য জেনেও অহংকারী আচরণ করেন। এটা খুবই দু:খজনক। বাস্তবতা হলো, যিনি যতো বড় জ্ঞানী, তার বিনয় ততো বেশি হওয়া উচিত। দু:খজনক হলেও সত্য, সাধারণ ভাইয়েরা যখন ইলমের পথে অগ্রসর হোন, সামান্য জেনেই অন্যদেরকে হেয় করতে থাকেন। বড় বড় আলেমদেরকে নিয়েও কথা বলেন। আপনি যে বিষয়ে কথা বলছেন, সেটা হয়তো আলেমের অজানা, বা আলেমের ভুল, কিন্তু সেই আলেমকে তাচ্ছিল্য করাটা আপনার জন্য শোভনীয় নয়।

৩. যারা আলেম হোন, তারা ইলমের পেছনে দীর্ঘ সময় ব্যয় করে থাকেন। মাদ্রাসা থেকে পাশ করা একজন অযোগ্য আলেমও যথেষ্ট সময় দিয়েছেন ইলমের পেছনে। এক্ষেত্রে সে বড় বড় আলেমের দরসে বসার সুযোগ পেয়েছে দীর্ঘ সময়। তার যোগ্যতা কম হলেও এসব দরসের বিশেষ বরকতের কারণে তার মধ্যে এক ধরণের বুঝ তৈরি হয়। আলেমদের সান্নিধ্যে অর্জিত এ বুঝটি তার সারা জীবনের চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করে। এধরণের সাধারণ পর্যায়ের আলেমও বিভিন্ন ফেতনা থেকে সহজে মুক্ত থাকতে পারে।

সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে এধরণের সুযোগ খুবই কম। আলেমদের সান্নিধ্যে গিয়ে ইলম অর্জনের সুযোগ তেমন হয় না। এ কারণে তাদের মধ্যে এই বুঝ আসতে সময় লাগে। বর্তমানে অনেকের মধ্যে একটা প্রবণতা দেখা যায়। স্বশিক্ষিত হওয়ার প্রবণতা। দু’একটি বই পড়ে কিংবা একটা দু’টো লেকচার শুনে তারা নিজেদের যথেষ্ট মনে করেন। এটা শুধু ভুল নয়, মারাত্মক ভুল। সঠিক ইলমের থেকে দূরে থাকার অন্যতম কারণও এটি। এগুলোর মাধ্যমে হয়তো কিছু শব্দ শেখা যায়, কিছু মাসআলা জানা হয়, কিন্তু দীনের প্রকৃত বুঝ আসে না। দীনের প্রকৃত বুঝের জন্য আলেমদের সান্নিধ্যের কোন বিকল্প নেই।

৪. যুবক ভাইদের মধ্যে একটা ভয়ংকর রোগ দেখা যায়। তারা ভিডিও ও অডিও নির্ভর হয়ে যাচ্ছেন। কিতাব পড়ার প্রতি আস্তে আস্তে তাদের আগ্রহ কমে যাচ্ছে। এটা সত্যিই ভয়ংকর একটা বিষয়। সত্য কথা হলো, অডিও -ভিডিও কখনও কিতাবের বিকল্প হতে পারে না। কখনও নয়। প্রয়োজনের খাতিরে অডিও-ভিডিওর সহযোগিতা নেয়া যেতে পারে, তবে প্রকৃত ইলমের জন্য কিতাব অধ্যয়নের কোন বিকল্প নেই।

৫. অনেকের মধ্যেই একটা বিশেষ প্রবণতা দেখা যায়। নিজের ইলমকে যথেষ্ট মনে করা ও আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তোলা। ভাবেন, আমি তো অনেক জেনে ফেলেছি। আমার মতো আর কে আছে। এই ধরণের আত্ম-প্রবঞ্চনা ইলমের পথে অন্যতম অন্তরায়। নিজের ইলমকে সব-সময় বড় বড় আলেমদের সামনে পেশ করা এবং নিজেদের অবস্থানকে সর্বদা যাচাই করতে থাকা খুব জরুরি।

একটা বাস্তবতা হলো, আমাদের জানার তুলনায় অজানা বিষয় বেশি। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, [অনুবাদ],”তোমাদেরকে খুব সামান্য ইলম দেয়া হয়েছে”। এই সামান্য ইলমের অধিকাংশও আমাদের অজানা। সুতরাং এত বড় অজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও নিজের জ্ঞান নিয়ে অহংকার করাটা আসলেই বোকামী।

বর্তমান জামানায় সাধারণ মানুষের সামনে হাজারও ফেতনার দরজা উন্মুক্ত। সেকুলারিজমের দাওয়াত তাকে চারিদিক থেকে ঘিরে রেখেছে। অধিকাংশ দাওয়াতের পেছনে রয়েছে জ্ঞান-বিজ্ঞান, যুক্তি ও তথ্য-উপাত্ত। অন্যান্য সকল জামানার তুলনায় বর্তমান সময়ের মুসলমানদের ইলমের প্রতি সবচেয়ে বেশি আগ্রহী হওয়া প্রয়োজন। ইলম থেকে বিচ্ছিন্ন হলেই এসব ফেতনায় আক্রান্ত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থেকে যায়। এজন্য সর্বদা ইলম শেখার পেছনে সময় দিতে হবে। একটা একটা দীর্ঘ সময় দিয়ে ইলম শিখতে হবে। আলেমদের সান্নিধ্যে গিয়ে ইলমের গভীরতা অর্জন করতে হবে।

ইলমের পথে আপনার এই যাত্রা অব্যাহত থাকুক আমৃত্যু। আল্লাহ তায়ালা আপনাকে সেই তাফাক্কুহ দান করুন, যার মূলে রয়েছে প্রভূত কল্যাণ। আপনার এ পথের যাত্রা শুরু হবে দুনিয়ায়। এ পথের শেষ মঞ্জিল জান্নাত। রাসূল স. বলেছেন,
من سلك طريقاً يطلب فيه علماً سهل الله له طريقاً إلى الجنة
অর্থ: যে ইলমের পথে যাত্রা শুরু করবে, আল্লাহ তায়ালা তার জান্নাতের পথ সহজ করে দিবেন। (বোখারী শরীফ, কিতাবুল ইলম)।

আল্লাহ তায়ালা সবাইকে ইলমের জন্য কবুল করুন। আমীন।

Print Friendly