চিন্তা করুন। দু’জন ভালো বন্ধু। একজনকে ছাড়া আরেকজন চলে না। চলতে পারে না। হঠাৎ কোন কারণে বিবাদে লিপ্ত হয়েছে। রেসলিং এর মতো একজন আরেকজনকে ধরাশায়ী করেছে। আরেকজনকে চেপে ধরে হুংকার ছাড়ছে।

আপনি এখানে দর্শক। দু’জনকে এ অবস্থায় দেখে আপনি কী কী করতে পারেন?

১. নীচে পড়া বন্ধুকে উপরে তুলে দিতে পারেন। যেন উপরের বন্ধুকে নীচের বন্ধু একইভাবে ধরাশায়ী করতে পারে।

২. উপরের বন্ধুকে বাহবা দিয়ে আরও কঠোর হতে উদ্বুদ্ধ করতে পারেন।

৩. দু’জনকে বুঝিয়ে উভয়ের মধ্যকার সমস্যার সমাধান করতে পারেন। তাদেরকে পূর্বের বন্ধুত্বের কথা স্মরণ করিয়ে বলতে পারেন, একে অপরকে ধরাশায়ী করা তোমাদের সাজে না। তোমরা একে অপরের হাত ধরবে। বন্ধুত্বের নির্মল হাসি তোমাদের মুখে শোভা পায়।

আপনি যদি প্রথম দু’টি বেছে নেন, তাহলে উভয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাদের চলার পথ ভিন্ন হবে। উভয়ের প্রতি কল্যাণকামী ব্যক্তি অবশ্যই তৃতীয় পদ্ধতি বেছে নিবে। উভয়ের হৃদ্যতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করবে।

সমাজে নারী-পুরুষ একে অপরের পরিপূরক। একজনকে ছেড়ে আরেকজন কখনও সুস্থ্যভাবে চলতে পারে না। নারী-পুরুষের এই সম্পর্কে ভারসাম্য খুব জরুরি। একে অপরের সহযোগী না হলে পথচলা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

সামাজিক বিভিন্ন অবস্থার প্রেক্ষিতে কখনও দেখা যায়, নারী পুরুষের প্রহসনের স্বীকার। পুরুষের অন্যায় ও নির্যাতনের সামনে নারী অসহায় হয়ে পড়ে। নারী নিরুপায় হয়ে মুখ বুজে সেই নির্যাতন সহ্য করে যায়।

সামাজিকভাবে এসব ঘটনা কারও অজানা নয়। অনেকে এই অবস্থাকে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ বা পুরুষবাদী সমাজ বলে থাকে।

নারীদের উন্নতি, প্রগতি ও মুক্তির কথা অনেকেই বলেন। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থাকে ভেঙে তারা নারী স্বাধীনতার কথা বলেন।

যারা প্র্যাকটিসিং মুসলিম রয়েছে, তাদের পারিবার এসব অন্যায়, প্রহসন ও নির্যাতন থেকে মুক্ত। শতকরা একজনও পেতে কষ্ট হবে, যাদের পরিবারে এই সমস্যাগুলো আছে।
এসব পরিবারের ক্ষেত্রে একথা বলা সহজ যে, তাদের পরিবারের নারীরা প্রহসনের স্বীকার নয়। তবে শিক্ষা-দীক্ষা ও বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নতিতে এসব পরিবারের নারীদের অবস্থান নিয়ে চিন্তা-ভাবনার সুযোগ রয়েছে হয়তো। আশার কথা হলো, এসব পরিবারের নারীরাও শিক্ষা ও বুদ্ধিবৃত্তিক অনুশীলনে এগিয়ে যাচ্ছে। যদিও এর গতি কিছুটা মন্থর।

দু:খজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশ কিংবা প্রতিবেশি দেশগুলোর অধিকাংশ মুসলিম প্রকৃত প্র্যকটিসিং মুসলিম না। মুসলমান ছাড়াও অন্যান্য ধর্মের অনুসারী অসংখ্য পরিবার রয়েছে। এসব পরিবারে নারীদের অবস্থান নিয়ে আমাদের চিন্তা ভাবনা করতে হবে।

নারীদের পিছিয়ে পড়া, অনেক ক্ষেত্রে নির্যাতন ও প্রহসনের স্বীকার হওয়ার বিষয়টি বাস্তবেই সত্য। এই বাস্তবতা মেনে নেয়া ছাড়া আমাদের কোন উপায় থাকার কথা নয়। বাস্তবতা মেনে নিলে এই সত্যের মুখোমুখি হবো আমরা কীভাবে? সমস্যার সমাধান কী?

সমস্যাটা শুধু আমাদের দেশের নয়। পুরো বিশ্বের। গোটা মানব জাতির। এটা খুব সাধারণ বা ছোটখাট সমস্যা নয়।

নারীদের নিগৃহীত হওয়ার বিষয়টি মেনে নেযার পর অনেকেই বিভিন্ন ধরনের সমাধানের কথা বলেন। নারীবাদী আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছে এসব সমস্যাকে সামনে রেখে। নারীদের মুক্তি ও স্বাধীনতার জন্য বেগম রোকেয়া, তসলিমা নাসরিনের মতো নারীরা এগিয়ে এসেছে। আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবীরা এগুলো নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করেন। কলাম লেখেন।

বেগম রোকেয়া বা তসলিমা নাসরিনের মতো যারা মুসলিম সমাজ থেকে নারীবাদী আন্দোলনের কথা বলেছেন, তাদের চিন্তা-চেতনায় কিছু মৌলিক ভুল আছে বলে মনে করি।

১. তারা নারীদের নিগৃহীত হওয়ার মৌলিক কারণগুলো চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হয়েছেন। মুসলিম সমাজে বেড়ে ওঠার কারণে তারা নারীদের নিগৃত হওয়ার পেছনে ইসলামকে অনেক ক্ষেত্রে দায়ী করার চেষ্টা করেছেন। হিজাব, নেকাব এগুলোর পিছে পড়েছেন। সমস্যাটা যে শুধু মোল্লা-মৌলবী, হিজাব ও নেকাব নয়, এটা তাদের আরও গভীরে গিয়ে বোঝা উচিত ছিলো। নারীদের এই সমস্যাটা গোটা বিশ্বের, গোটা মানবজাতির, এটাকে ধর্মীয় রঙ দেয়াটা অপরিপক্কতা বলেই মনে হয়।

২. নারীদের মুক্তি, প্রগতি ও স্বাধীনতার কথা বলেছেন ঠিকই, কিন্তু এগুলো দ্বারা মৌলিক উদ্দেশ্য স্পষ্ট করেননি তারা। সর্বত্র নারীদের অবাধ ও স্বাধীন বিচরণ এবং নারীদের ক্ষমতায়ন হলেই কি নারীদের নিগৃহীত হওয়া বন্ধ হয়ে যাবে?

পশ্চিমা দেশগুলোতে নারীরা তো স্বাভাবিকভাবেই এগুলো অর্জন করেছে। প্রগতি, মুক্তি ও স্বাধীনতার ক্ষেত্রে তাদের সামনে কোন দেয়াল নেই। যদি ধরে নেই, আমাদের দেশের নারীবাদীদের উদ্দেশ্য হলো, সমাজের নারীদেরকে পশ্চিমাদের মতো প্রগতিশীল করে গড়ে তোলা।
মৌলিক প্রশ্নটি থেকে যায়, পশ্চিমা নারীরা কি প্রহসন থেকে প্রকৃত মুক্তি পেয়েছে?

৩. নারীবাদীদের চেতনার আরেকটি মৌলিক সমস্যা হলো, অবাস্তব ও অপরিপক্ক সমাধান দেয়া। উমেন এমপাউরমেন্ট বা নারীদের ক্ষমতায়নের কথা বলতে গিয়ে তারা নারী পুরুষকে একে অপরের প্রতিপক্ষ রূপে দাড় করান। একে অপরের প্রতি সহযোগিতা ও শ্রদ্ধাবোধ তৈরির পরিবর্তে তারা এক ধরণের ঘৃণা ছড়াতে থাকেন। এটা হয়তো তাদের অতিরিক্ত আবেগ কিংবা সুস্থ্য চিন্তা-ভাবনার অভাবে হয়ে থাকে।

পুরুষ বিভিন্ন কারণে নারীদের প্রতি অন্যায় আচরণ করছে। নারী পুরুষের এই সমস্যাটা লেখার শুরুতে বলা দু’বন্ধুর গল্পের মতো। পুরুষ যদি নারীর প্রতি অন্যায় করে থাকে, তাহলে এক্ষেত্রে আপনি কী কী করতে পারেন?

১. নারীকে বিভিন্নভাবে উসকে দিয়ে পুরুষকে নির্যাতনের মুখে ঠেলে দিতে পারেন।

২. পুরুষকে আরও নির্যাতনের জন্য উৎসাহ দিতে পারেন।

৩. উভয়কে বুঝিয়ে একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করতে পারেন। প্রতিপক্ষ না বানিয়ে সহযোগিতার মনোভাব তৈরি করতে পারেন।

একটি রূঢ় বাস্তবতা হলো, নারীবাদীরা নারীদের মুক্তির কথা বলে, নারীদেরকে পুরুষের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাড় করিয়ে ফেলছে। যদিও তারা সম অধিকারের কথা বলছে, কিন্তু তাদের এই সম অধিকারের চেতনা পরিণতিতে ভয়ংকর হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সমাজ ভেঙ্গে যাচ্ছে। পরিবার উচ্ছুন্নে যাচ্ছে। ছেলে -মেয়েদের সুস্থ্য বিকাশ ব্যহত হচ্ছে। নারী পুরুষের সহ অবস্থান কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে পড়ছে। পশ্চিমা দেশগুলোতে অনেকে একাকী জীবনকে বেছে নিচ্ছে। পশ্চিমাদের অধিকাংশ মানুষ পারিবারিক ও দাম্পত্য জীবনের ব্যাপারে উদাসীন হচ্ছে।

এর চেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, গে ও লেসবিয়ানদের সংখ্যা বাড়ছে। যেটা মানব সভ্যতার জন্য সবচেয়ে লজ্জাকর অধ্যায় বলা যেতে পারে।

নারীমুক্তির পরণতি দেখলে তো আমাদের মাথা হেট হয়ে যায়। আজকের প্রগতিশীল নারী ভোগ্য পণ্যের পর্যায়ে নেমে এসেছে। তাদেরকে সব জায়গায় ব্যবহার করা হচ্ছে। দে আর বিং ইউজড। টিভি, পত্রিকা, বিজ্ঞাপন, অফিস আদালত সব জায়গায় এই করুণ বাস্তবতার ছাপ স্পষ্ট। এর চেয়ে লজ্জাকর পরিস্থিতি আর কী হতে পারে? নারীদের সম্মান ও যৌনতা বিক্রি না করলে আধুনিক সমাজের ব্যবসা বাণিজ্য অচল। কোথায় নারী স্বাধীন? কোথায় নারী সম্মান ও মুক্তি পেয়েছে? নারীদের এই করুণ চিত্র যদি আপনার চোখে না পড়ে, তাহলে আপনি একজন নারীবাদী হলেও আপনার জন্য সবচেয়ে বেশি করুণা হয়। অন্তত আপনার ভোতা চেতনা ও অন্ধ মানসিকতার জন্য।

সামাজিক এই সমস্যাকে একেবারে গোড়া থেকে পর্য়বেক্ষণ না করে ওড়না, বোরকা ও নিকাবের গুষ্টি উদ্ধারের পেছনে পড়াটা বুদ্ধিজীবীদের হাস্যকর পর্যায়ের নির্বুদ্ধিতা মনে হয়।

সমস্যার একেবারে গোড়া থেকে চিন্তা করুন। সিলি ও অর্থহীন বিষয় নিয়ে মাতামাতি বন্ধ করুন। নারীদের জন্য, সমাজের জন্য ও মানুষের জন্য প্রডাকটিভ কিছু চিন্তা করুন। নারী পুরুষকে একে অপরের প্রতিপক্ষ বানানো থেকে বিরত থাকুন।

পবিত্র কুরআন নারী পুরুষের সহ অবস্থান সম্পর্কে অতুলনীয় একটি কথা বলেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
هن لباس لكم وأنتم لباس لهن
অর্থ: নারীরা তোমাদের পোশাক এবং তোমরা নারীদের পোশাক।
[সূরা বাকারা -১৮৭]

পুরুষের জন্য নারী পোশাকতুল্য, একইভাবে নারীর জন্য পুরুষ পোশাকতুল্য। পবিত্র কুরআনের এই বক্তব্য নিয়ে একটু চিন্তা করুন। কতো আবেদনময় কথা। এই আয়াতের মর্ম ও তাফসীরের উপর আলাদা আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।

মূল কথা হলো, নারী পুরুষের সহ অবস্থানকে সুস্থ্য ও সুন্দর করার আন্দোলন করুন। একে অপরের সহযোগী হওয়ার পরামর্শ দিন। পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ তৈরির মানসিকতা তৈরি করুন। এতে সমাজ অবক্ষয় থেকে মুক্তি পাবে। নারীদের প্রতি সামাজিক অন্যায় গুলো কমতে থাকবে।

একে অপরের হাত ধরতে শিখান। হাত ছেড়ে প্রতিযোগী ও প্রতিপক্ষ হলেই দু’জনই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমরা পুরুষতান্ত্রিক কিংবা নারীবাদী সমাজে বিশ্বাসী নই, আমরা নারী ও পুরুষের সুস্থ্য, সুন্দর ও নির্মল সহ অবস্থানে বিশ্বাসী।

Print Friendly