iDEA

islamic dawah and education academy

শিরক সমাচার

শিরক সমাচার -১ 

কয়েকটা বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ করার ইচ্ছা ছিলো। অনেকের সাথে অঙ্গীকারবদ্ধও ছিলাম। কিছু ব্যস্ততার জন্য তেমন সময় দিতে পারি না। আরও কিছু দিন হয়তো বিচ্ছিন্ন থাকবো।
একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত অন্যের কাছে কিছু চাওয়া। এক্ষেত্রে আমাদের কী বিশ্বাস রাখতে হবে। কতটুকু পর্যন্ত ইসলামের গন্ডির মধ্যে থাকবে। এ বিষয়টা নিয়ে একটু বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন।

আকিদার অস্পষ্টতার কারণে বিষয়টি অনেক সময় ভয়াবহ হয়ে ওঠে। সঠিক আকিদা না জানার কারণে নিজে যেমন ভুলের মধ্যে থাকে। সেই সাথে অন্যকেও আক্রমণের লক্ষ্য বানায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ইমাম ইবনুল জাওযী রহ. তার বিখ্যাত কিতাব আল-ওফা বি-আহওয়ালিল মুস্তফা কিতাবে আবু বকর আল-মিনকারী থেকে একটা ঘটনা বর্ণনা করেছেন। ইমাম ত্ববারানী, ইমাম আবুশ শায়খ ও ইমাম আব বকর মিনকারী মদিনায় অবস্থান করছিলেন। এক সময় তারা মারাত্মক ক্ষুধার্ত হয়ে পড়েন। ইমাম আবু বকর মিনকারী বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, আমরা ক্ষুধার্ত। আমরা ক্ষুধার্ত। একথা বলে আমি উঠে যাচ্ছিলাম। আবুশ শায়খ আমাকে বললো, বসো। হয়তো রিজিকের ব্যবস্থা হবে না হয় এখানে ইন্তেকাল করবো।

আবু বকর মিনকারী বলেন, আমি ও আবুশ শায়খ সেখানে ঘুমিয়ে পড়লাম। ইমাম ত্ববারানী বসে বসে কিছু দেখছিলেন। ইতোমধ্যে দরজায় আলী রা. বংশের এক আলাভী উপস্থিত হলো। তার সাথে দুজন ছেলে ছিলো। তাদের দু’জনের হাতে অনেক বড় পাত্রে খাবার ছিলো। আমরা উঠে আহার করলাম। আমরা মনে করেছিলাম, খাবার শেষ হলে অবশিষ্ট খাবার সে নিয়ে যাবে। কিন্তু সে পুরো খাবার আমাদেরকে দিয়ে দিলো। খাবার শেষ হলে লোকটি বললো, তোমরা কি রাসূল স. এর কাছে অভিযোগ করেছিলে? আমি রাসূল স. কে স্বপ্নে দেখেছি। তিনি আমাকে তোমাদের জন্য কিছু খাবার আনার আদেশ করেছেন।

ঘটনাটি স্পষ্ট। তবে এর সনদ তাহকিক করার সুযোগ আমার হয়নি। আর এখানে সনদ মূল বিষয় নয়। কেউ এটাতে বিশ্বাস না করলেও কোন কিছু যায় আসে না। কিন্তু ইসলামের কিছু গুরুত্বপূর্ণ কিতাবে যেহেতু ঘটনাটি এসেছে, মূল ঘটনার মানটি জানা জরুরি হয়ে পড়েছে। এই ঘটনা কি আসলে শিরক?
তিন মুহাদ্দিস রাসূল স. এর কাছে ক্ষুধার অভিযোগ করেছেন। এক কথায় বলতে গেলে, প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী এটি সুস্পষ্ট বড় শিরক। এধরণের কাজের জন্য তিন জন অথবা যিনি রাসূল স. এর কাছে অভিযোগ করেছেন বা যারা সমর্থন করেছেন, তারা মুশরিক হয়ে গেছেন।

ইবনুল জাওযী রহ. ঘটনাটি উল্লেখ করে শিরক প্রচার করেছেন। তিনি এটি সমর্থন করে থাকলে তিনিও মুশরিক হয়ে গেছেন।

মোট কথা, সাধারণ বিশ্বাস অনুযায়ী তারা বড় শিরক করে ইসলাম থেকে বের হয়ে গেছেন।

এজাতীয় বহু ঘটনা আমার নজরে এসেছে। অনেক বড় বড় মুহাদ্দিসদের থেকেও এসেছে। ঘটনাগুলোতে স্পষ্টভাবে তারা অন্যের কাছে এভাবে সাহায্য চেয়েছেন। মৃতের কাছে অভিযোগ করেছেন। এক্ষেত্রে আমি কী বিশ্বাস করবো?

১. এরা সকলেই মুশরিক? সকলেই তওবা না করে থাকলে মুশরিক হয়ে মারা গেছে?
২. যারা এগুলো লিখেছে, সংরক্ষণ করেছে, বর্ণনা করেছে, সমর্থন করেছে, তারা সকলেই মুশরিক? সকলেই বড় শিরক করে ইসলাম থেকে বের হয়ে গেছে?

প্রচলিত শিরকের ধারণা নিয়ে আমার পড়া-শোনার শুরুটা হয়েছে এখান থেকে। বিষয়টা আদৌ শিরক কি না? শিরক এর সাথে এর সম্পর্ক কতটুকু?

বিষয়টি পর্যালোচনা করে আমার কাছে দিনের আলোর মতো স্পষ্ট যে, প্রচলিত শিরকের ধারণাটাই গলদ। যারা বিষয়টা নিয়ে কথা বলেন, তারা কয়েকটি ভুল করে থাকেন।

১. কিছু ভাসা ভাসা আলোচনাকে মূল মনে করেন।
২. শিরক কেন হয়, শিরক হওয়ার মূলনীতিগুলো আলোচনায় আসে না।
৩. নিজেরা কিছু মূলনীতি বানিয়েছে যেগুলোর তেমন শরয়ী ভিত্তি নেই।

উদাহরণ হিসেবে, এদের একটা মূলনীতি হলো, حي, حاضر.قادر
অর্থাৎ জীবিত, উপস্থিত ও সক্ষমের কাছে চাইলে শিরক হবে না। নতুবা শিরক হবে।
তাদের মতে আপনি যদি কোন অনুপস্থিত ব্যক্তির কাছে সাহায্য চান তাহলে শিরক হবে।
কোন মৃত বা জড় বস্তুর কাছে সাহায্য চান তাহলে শিরক হবে।
কোন অক্ষম বা অসমর্থ ব্যক্তির কাছে সাহায্য চাইলে শিরক হবে।

দেখতে মূলনীতিটা বেশ ভালো। কিন্তু এই মূলনীতি একেবারেই ভিত্তিহীন।
এগুলোর সাথে শিরকের কোন সম্পর্ক নেই। অথচ এটাকেই শিরক বলা না বলার মূলনীতি বানানো হয়েছে। বিষয়টা দুঃখজনক ও হাস্যকর।

মনে করেন, একটা লোক ধানমন্ডি লেকে পড়ে গেছে। সাতার জানে না। এখন সে জীবন বাঁচানোর জন্য কারও সাহায্য চাচ্ছে। এখন এই ব্যক্তি যদি এমন কারও কাছে সাহায্য চায়, যে নিজে সাঁতার জানে না, তাহলে সেটা শিরক হয়ে যাবে। কারণ এই ব্যক্তি জীবিত, উপস্থিত কিন্তু সে তাকে উদ্ধার করতে সক্ষম নয়। শিরকের উপরের মূলনীতি অনুয়ায়ী সাঁতার না জানার ব্যক্তির কাছে সাহায্য চাইলে শিরক হয়ে যাবে।

এখন কেউ হয়তো বলতে পারে, সক্ষম দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, সৃষ্টির কাছে এমন জিনিস চাওয়া যেটা কেবল আল্লাহ তায়ালাই করেন।

স্বাভাবিক কথা হলো, এটাও শিরক হওয়া বা না হওয়ার কোন কারণ নয়। একমাত্র আল্লাহ তায়ালাই করেন এমন অনেক বিষয় আল্লাহ তায়ালা মাখলুককেও ক্ষমতা দিয়ে দিতে পারেন। সুতরাং এটা শিরক হওয়া না হওয়ার মূলনীতি হয় কী করে?
যেমন মৃতকে জীবিত করা এটা একমাত্র আল্লাহ তায়ালাই পারেন। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা মু’জেযা হিসেবে হযরত ইসা আ. কে এই ক্ষমতা দিয়েছিলেন। এখন আপনার মূলনীতি অনুযায়ী যতো লোক ইসা আ. কে মৃতকে জীবিত করতে বলেছে, তারা সবাই মুশরিক হয়ে গেছে।
সুতরাং এটাও শিরক হওয়া বা না হওয়ার কোন মূলনীতি হতে পারে না।

জীবিত হওয়া বা না হওয়াকে শিরকের মূলনীতি বানানোটা আরও হাস্যকর। যেমন ধরেন, এখন টেকনোলজির যুগ। আমি যদি আইফোনকে বলি, হেই শ্রি, গুগলে সার্চ করে দাও। তাহলেই আমি মুশরিক হয়ে যাবো। আই ফোন তো একটা জড় পদার্থ। সুতরাং তার কাছে এটা চাইলে শিরক হয়ে যাবে।
আরও সাধারণভাবে চিন্তা করুন। আমি একবার এক বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করলাম, আমি যদি একটা কলাগাছকে গিয়ে বলি, আমাকে এক গ্লাস পানি দাও। তাহলে কী শিরক হবে?
তখন সে বললো, এটা তো পাগলামি হবে। শিরক হবে কেন?

কলাগাছকে এক গ্লাস পানি দিতে বললে, সেটা অর্থহীন হবে। তবে এটা শিরক হবে কি না?
উপরের মূলনীতি অনুযায়ী শিরক হয়ে যাবে। কারণ কলা গাছ সাধারণ অর্থে জীবিত নয়। আর জীবিত নয় এমন কিছুর কাছে চাওয়া শিরক। ব্যস হয়ে গেলো।

বাস্তব কথা হলো, শুধু কলা গাছ নয়, এক টুকরো পাথরের কাছে চাওয়াও শিরক হতে পারে। কিন্তু সেটা উপরের মূলনীতি অনুযায়ী নয়। শিরকের বাস্তবতার আলোকে। যেমন, হিন্দুরা একটা পাথরের মাথায় সিদুর লাগিয়ে সাহায্য চাইলে শিরক হয়ে যায়। এজন্য শিরক হওয়ার মূল কারণটা বোঝা খুব জরুরি।

উপরের মূলনীতি অনুযায়ী, কেউ যদি অনুপস্থিত কারও কাছে কিছু চায়, তাহলে সেটা শিরক হয়ে যায়। যেমন ধরুন, আপনার ভাই সৌদি থাকে। আপনি তার কাছে কিছু চাইলে শিরক হয়ে যাবে।

যে সময়ে বা যারা মূলনীতিটা বানিয়েছেন, হয়তো তাদের জানা ছিলো না যে, ভাইবার স্কাইপের যুগও আসবে। অনুপস্থিত কারও কাছে সাহায্য চাইলেও শিরক হয়ে যাবে না। আর এটা শিরক হওয়া বা না হওয়ার কোন মূলনীতিও হতে পারে না।

আরেকটা সিচুয়েশন চিন্তা করুন। আপনি আপনার দাদুর কাছ থেকে নিয়মিত টাকা পয়সা নেন। কাল দুপুরে আপনি দাদুর রুমে গিয়ে এক শ টাকা চাইলেন। দাদু বিছানায় শুয়ে আছে। দু’তিন বার ডাকার পরও সাড়া দিলেন না। আপনার মনে অজানা সন্দেহটা দেখা দিলো। বাবা মাকে ডাক দিয়ে বুঝলেন যে, আপনার দাদু বেশ আগেই ইন্তেকাল করেছেন।
এখন প্রশ্ন হলো, আপনি যে আপনার দাদুর ইন্তেকালের পরে তার কাছে একশ টাকা চাইলেন তার কী হবে? এটা কি শিরক হয়ে যাবে? যারা উপরের মূলনীতি দিয়েছেন। তাদের মতে কেউ মারা গেলে তার কিছু চাইলেই শিরক। সাথে সাথে আপনি ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবেন। এখন আপনার কী হবে?
এরা হয়তো বলবে, আপনি তো জানতেন যে, আপনার দাদু মারা গেছে। এজন্য ভুলে শিরক হয়ে গেছে। অসুবিধা নেই।

আচ্ছা ধরে নিলাম, আমি জানলাম দাদু মারা গেছে। এরপর যদি আমি তার কাছে গিয়ে এক শ টাকা চাই তাহলে শিরক হয়ে যাবে?

আপনার সামনে উপস্থিত কারও কাছে আপনি এক গ্লাস পানি চাইলেন। এইটা শিরক নয়। কিন্তু ওই ব্যক্তি আপনার সামনে থেকে উঠে অন্য কোথাও গেল, এখন সে আপনার কাছ থেকে গায়েব বা অনুপস্থিত, এই অবস্থায় আপনি তার কাছে পানি চাইলে শিরক হবে। এটা হল, সালাফিদের মূলনীতি।  কিন্তু শিরক কি আসলেই এমন ভিত্তিহীন মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত?

 শিরক সমাচার-২

 

 অনেক আগের একটা লেখা দিয়ে শুরু করি। আগে লেখাটির উপর একটু চোখ বুলিয়ে নিন।
১. প্রধানমন্ত্রীর দেহরক্ষী সারাদিন খুব বিনয়ের সাথে হাত বেধে প্রধানমন্ত্রীর সামনে দাড়িয়ে থাকলেও তাকে ইবাদত বলা হয় না। কিন্তু একই ব‍্যক্তি মসজিদে গিয়ে দাড়ালে ইবাদত বলা হচ্ছে।
২.হযরত আদম আ.কে ফেরেশতারা সেজদা করলেও সেটা আদম আ. এর ইবাদত হয়নি কিন্তু কোন হিন্দু যদি মূর্তির সামনে সিজদা করে তাহলে সেটা ইবাদত হয়।
৩. রমজানে মুসলমান সকাল থেকে সন্ধা পযর্ন্ত না খেয়ে থাকলে ইবাদত হয়, কিন্তু ডাক্তারের পরামর্শে না খেয়ে থাকলে ইবাদত হয় না।
৫. কা’বাকে কেন্দ্র করে তওয়াফ করলে ইবাদত হয়, কিন্তু কোন একটা জিনিস খোজার জন‍্য কা’বাকে তওয়াফ করলে ইবাদত হয় না।
৬. হিন্দু পাথরের সামনে মাথা ঝুকালে পাথর বা মূর্তি পূজক হচ্ছে, কিন্তু মুসলমান পাথরের সামনে দাড়িয়ে নামায পড়লে পাথর পূজারী হয় না।
৭. প্রথম কাতারের মুসল্লী ইমাম সাহেবকে সামনে রেখে সিজদা করছে, দ্বিতীয় কাতারের মুসল্লী প্রথম কাতারের লোকদেরকে সামনে রেখে সিজদা করলেও কেউ মুশরিক হচ্ছে না, কিন্তু একটা মূর্তি বা পাথরের সামনে মাথা ঝুকালেই সে মুশরিক হয়ে যাচ্ছে।
৮. সাফা-মারওয়ার মাঝখানে দৌড়া-দৌড়ি করলে ইবাদত হয়, কিন্তু এর মাঝখানে যদি কাউকে খোজার উদ্দেশ্য দৌড়ানো হয়, তাহলে ইবাদত হয় না।
একই কাজ একই পদ্ধতিতে সংগঠিত হলেও ফলাফল ভিন্ন হচ্ছে। এর মূল কারণ কী?
মূল কারণ হলো, কোন একটা কাজ ইবাদত হওয়ার প্রথম শর্ত হলো অন্তরের নিয়ত। অন্তরের নিয়তের উপর নিভর্র করবে কাজটি ইবাদত না কি অন‍্য কিছু। রাসূল স. বলেছেন, সমস্ত কাজ নিয়তের উপর নিভর্রশীল।
একই কাজ একই পদ্ধতিতে ঘটছে। কিন্তু ফলাফল নির্ভর করছে নিয়তের উপর। শিরক বোঝার জন্য এই পয়েন্টটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত: শিরক বিষয়টা সম্পূর্ণ অন্তরের বিশ্বাসের সাথে সম্পর্কিত। কাজের ক্ষেত্রে চিন্তা করলে তো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, সব সময় কাজই শিরকের মূল হতে পারছে না। কাজ কখনও কখনও শিরক বুঝতে সাহায্য করে, কিন্তু এটা আদৌ শিরক হওয়া বা না হওয়ার মূল নয়। আমরা একটা লোককে মসজিদে ঢুকতে দেখে তার সম্পর্কে চিন্তা করি, সে ইবাদত করতে যাচ্ছে। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তার জন্য ইবাদতটা তার নিয়তের উপর নির্ভর করছে। সে যদি জুতা চুরির নিয়তে যায়, তাহলে এখানে কাজ দেখে সিদ্ধান্ত দেয়াটা ভুল হবে।
আপনি যদি একটা মূলনীতি এভাবে বানান যে, যারাই মসজিদে যাবে, তারাই ইবাদত করে, তাহলে এটা সব সময় সঠিক নাও হতে পারে। একজন লোক হাজারও নিয়তে মসজিদে যেতে পারে। কোনটা কী হবে, সেটা তার নিয়তের উপর নির্ভরশীল। শুধু মাত্র কাজের উপর ভিত্তি করে কখনও কোন মূলনীতি এখানে হতে পারে না।
এবার আসি শিরকের বিষয়ে। শিরক আসলে কী?
সত্ত্বা বা গুণের ক্ষেত্রে কাউকে আল্লাহ তায়ালার সমকক্ষ বা  তুলনীয় বিশ্বাস করা।
আল্লাহ তায়ালার সত্ত্বা বা গুণ == অন্য কারও সত্ব্বা বা গুণ।
কারও অন্তরে যখন এই সমতা আসবে তখন এটা শিরক হবে। বিষয়টা আরেকটু বিস্তারিত বলি।
আল্লাহ তায়ালার অনেক গুণবালী ও কাজ রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা দেখেন, শোনেন। ক্ষমা করেন, সাহায়্য করেন। আবার একই গুণ ও কাজ সীমাবন্ধ পরিসরে মানুষের মধ্যে আছে। যেমন আমি শুনি। আমি দেখি।
এই কাজগুলো যেহেতু আল্লাহর গুণ বা কাজ, আমি যদি অন্য কারও মাঝে এটা বিশ্বাস করি, তাহলে সেটা কি শিরক হবে?
সহজ কথা হলো, এটা শিরক নয়। একই কাজ আল্লাহ তায়ালা করেন, মানুষও করে। একই গুণ আল্লাহর মাঝেও আছে, মানুষের মাঝেও আছে।
১.আল্লাহ তায়ালার ক্ষমতা আছে। মানুষেরও ক্ষমতা আছে।
২. আল্লাহ তায়ালা দেখেন। মানুষও দেখে।
৩. আল্লাহ তায়ালা শোনেন। মানুষও শোনে।
৪. বিপদে আল্লাহ তায়ালা সাহায্য করেন। মানুষও সাহায্য করে।
একই কাজ বা গুণ আল্লাহর মাঝেও আছে আবার সৃষ্টির মাঝেও আছে। এখন শিরক কখন হবে? যখন উভয়ের মধ্যে সমতায় বিশ্বাস করা হবে। যেমন,
শিরক: আল্লাহর ক্ষমতা == মানুষের ক্ষমতা।
শিরক: আল্লাহর দেখা == মানুষের দেখা।
শিরক: আল্লাহর সাহায্য == মানুষের সাহায্য।
যতক্ষণ না কোন গুণ বা কাজে এই সমতা বা তুলনা কারও অন্তরে  আসবে ততক্ষণ এটা শিরক হবে না।
তবে কখনও বাহ্যিক শিরক বা ছোট শিরক হতে পারে। সেটা ভিন্ন বিষয়। তবে বড় শিরক কেবল তখনই হবে যখন সত্ত্বা, গুণ বা কাজে আল্লাহ তায়ালা ও সৃষ্টির মাঝে সমতা বা তুলনা  করা হবে।
আলোচনার মূল পয়েন্ট দু’টি:
১. শিরক সম্পূর্ণ অন্তরের বিষয়। কাজ কখনও কখনও অন্তরের বিশ্বাসের বহি:প্রকাশ বা প্রমাণ হতে পারে, তব সব ক্ষেত্রেই এটি প্রয়োজ্য বা মূলনীতি হবে না।
২. সত্ত্বা, গুণ ও কাজের ক্ষেত্রে কাউকে আল্লাহ তায়ালার সমকক্ষ বা তুলনীয় বিশ্বাস করা। এক্ষেত্রে যতক্ষণ না সমতা বা তুলনা  করা হবে  ততক্ষণ এটা শিরক হবে না।
শিরক সমাচার-৩
শুরুতে কয়েকটা পরিভাষার সাথে পরিচিত হওয়া প্রয়োজন। আমরা আল্লাহ তায়ালাকে রব হিসেবে বিশ্বাস করি। আল্লাহ তায়ালার সত্ত্বা, গুণ ও কাজকে আমরা অনন্য বিশ্বাস করি। অনন্য অর্থ কী? একমাত্র আল্লাহর মাঝেই আছে। অন্য কারও মাঝে নয়। একমাত্র আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট। অন্য কারও মাঝে যেটা থাকতে পারে না। যিনি প্রভূ কেবল তার মধ্যেই থাকবে। এধরণের বিষয়কে আমরা খাসাইসুর রুবুবিয়্যা বা রবের অনন্য বৈশিষ্ট্য বলি।
কয়েকটা উদাহরণ দেয়া যাক। আমরা বিশ্বাস করি, যিনি প্রভূ, তাকে অবশ্যই ক্ষমতা সম্পন্ন হতে হবে। তার ক্ষমতা থাকবে। অক্ষম কেউ প্রভূ হতে পারে না। এখন প্রশ্ন হলো,
ক্ষমতা কি প্রভূর অনন্য বৈশিষ্ট্য?
স্বাভাবিকভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, সীমিত পর্যায়ে সৃষ্টির মধ্যেও ক্ষমতা আছে। তাহলে ক্ষমতা প্রভূর অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো কী করে?
এই বিষয়টা বোঝা খুব জরুরি। ক্ষমতা বা কুদরত অবশ্যই প্রভূর অনন্য বৈশিষ্ট্য। এটা শুধু প্রভূর মাঝেই আছে। অন্য কারও মাঝে নেই।
প্রভূর ক্ষমতা: স্বাধীন, স্বয়ংসম্পূর্ণ ও অসীম।
সৃষ্টির ক্ষমতা: অন্যের দেয়া, অসম্পূর্ণ ও সসীম।
এবার চিন্তা করে দেখুন। প্রভূর ক্ষমতা আসলেই অনন্য বৈশিষ্ট্য। এই ক্ষমতা শুধু আল্লাহরই আছে। আর কারও নেই।
সহজেই আমরা বলতে পারি, আল্লাহরও ক্ষমতা আছে, মানুষেরও ক্ষমতা আছে। কিন্তু আল্লাহর ক্ষমতা অনন্য। কোন দিক থেকে মানুষের ক্ষমতার সাথে তুলনীয় হতে পারে না। কোন দিক থেকে যদি আপনি আল্লাহর ক্ষমতার সাথে অন্য কারও ক্ষমতা তুলনা করেন তাহলে আল্লাহর ক্ষমতা আর অনন্য রইলো না।
আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও মাঝে যদি স্বাধীন, স্বয়ংসম্পূর্ণ ও অসীম ক্ষমতা বিশ্বাস করেন, তাহলে এটাই হলো শিরক।
শিরক নয়: সৃষ্টির ক্ষমতা আছে।
শিরক: সৃষ্টির স্বাধীন, স্বয়ংসম্পূর্ণ ও অসীম ক্ষমতা আছে।
মূল বিষয় হলো, আল্লাহর অনন্য বৈশিষ্ট্য বা কাজ অন্য কারও মাঝে আছে বা অন্য কারও সাথে তুলনীয়, এটা চিন্তা করাই হলো শিরক। শিরক অর্থ অংশীদার করা। আল্লাহর সাথে শিরক করার অর্থ আল্লাহর সাথে কাউকে অংশীদার করা। কী বিষয়ে অংশীদার করা হচ্ছে?
আল্লাহর অনন্য বৈশিষ্ট্যের মাঝে অংশীদার করা হচ্ছে। একটা গুণ শুধু আল্লাহরই আছে। আপনি যদি সেটা অন্য কারও মাঝে বিশ্বাস করেন, তাহলে এই গুণের ক্ষেত্রে তাকে আল্লাহর অংশীদার করা হলো। শিরক করা বা আল্লাহর অংশীদার সাব্যস্ত করার অর্থই হলো এটা।
এবার আসুন ক্ষমতার বিষয়টা আরেকটু পর্যালোচনা করি। আমি যদি কাউকে বলি, একটা ইট বা ছোট পাথর ছুড়ে ফেলো। সে এটা করে দিলো। আমি এতে কোন সমস্যা দেখছি না।
আবার কাউকে যদি বলি, হিমালয় পর্বতটা সরিয়ে ফেলো। সে কোনভাবে এটা করলো।
আমাদের কিছু কিছু অবুঝ ভাই বলবেন, এটা শিরক হয়েছে।
যদি জিজ্ঞেস করি, কেন শিরক হলো? সত্য কথা হলো, এসমস্ত ভাইয়েরা এর কোন উত্তর দিতে পারে না।
যদি সহজ করে জিজ্ঞেস করি, শিরক করার অর্থ হলো আল্লাহর সাথে অংশীদার করা। এখন হিমালয় পর্বত সরিয়ে আল্লাহর সাথে কীসে অংশিদার করলো সে?
হিমালয় পর্বত সরানো কি আল্লাহর অনন্য বৈশিষ্ট্য? এটা যদি আল্লাহর অনন্য বৈশিষ্ট্য না হয়, তাহলে এখানে শিরক হবে কেন?
এই অবুঝ ভাইয়েরা আমতা আমতা করে বলেন, ছোট পাথর সরানোর ক্ষমতা তো মানুষের আছে। হিমালয় সরানোর ক্ষমতা তো মানুষের নেই। এজন্য এটা শিরক।
বিশ্বাস করুন, এটাই এদের বুঝের দৌড়। যদি জিজ্ঞেস করি, ছোট পাথর সরানোর ক্ষমতা মানুষের আছে মানে কি? এটা তার নিজস্ব, স্বয়ংসম্পূর্ণ ও স্বাধীন ক্ষমতা?
উত্তর হলো, না।
হিমালয় পর্বত যদি কেউ সরায় তাহলে, এটাও কি তার নিজস্ব, স্বয়ংসম্পূর্ণ ও স্বাধীন ক্ষমতা?
উত্তর, না।
এখন ছোট পাথর সরানোর ক্ষেত্রে আপনি যদি বিশ্বাস করেন যে, তার নিজস্ব, স্বয়ংসম্পূর্ণ ও স্বাধীন ক্ষমতা আছে, তাহলে এটাও শিরক। যদিও ছোট্র একটা পাথর সরানো খুব স্বাভাবিক বিষয়।
আবার যদি কারও ক্ষেত্রে এটা বিশ্বাস করেন যে, সে পুরো আমেরিকা মহাদেশ মুহূর্তেই এশিয়া মহাদেশে এনে ফেলতে পারে। কিন্তু এটা তার নিজস্ব, স্বয়ংসম্পূর্ণ ও স্বাধীন ক্ষমতা নয়। বরং আল্লাহর দেয়া। তাহলে এটা শিরক হবে না।
এবার বাস্তব উদাহরণে আসি। হযরত জিবরাইল আ. কওমে লুতের পুরো এলাকা আকাশে উঠিয়ে নিয়ে উল্টে দিয়েছিলেন। আমাদের এসব ভাইদের চিন্তা অনুযায়ী তো এটা শিরক হওয়ার কথা। কারণ জিবরাইল আ. তো আল্লাহর একটা সৃষ্টি। জিবরাইল আ. এর মাঝে এই ক্ষমতা বিশ্বাস করলে শিরক হবে না, কিন্তু অন্য আরেকটা সৃষ্টির মাঝে বিশ্বাস করলে শিরক হবে কেন? আর এটার সাথে শিরকের কী সম্পর্ক? জমিনের একটা ভুখন্ড আসমানে নিয়ে উল্টিয়ে দেয়া কি আল্লাহর কোন অনন্য বৈশিষ্ট্য?
তাহলে এক্ষেত্রে আপনার মাথায় শিরকের চিন্তা কেন আসবে?
উদাহরণ হিসেবে এদের কাউকে যদি জিজ্ঞেস করি, আব্দুল কাদের জিলানী রহ. মূহূর্তের মধ্যে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে পারতেন। এটা উদাহরণ হিসেবে ধরে নিন। আমি জানি না, এটা তার কারামত ছিলো কি না।
আমাদের এসব ভাইয়ের সামনে এটা বললেই বলবে, এটা তো শিরক। যদি জিজ্ঞেস করি, কেন শিরক? তখন আর উত্তর দিতে পারে না।
মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যাওয়া কি আল্লাহর কোন অনন্য বৈশিষ্ট্য যা অন্য কারও মাঝে থাকবে না? আর আব্দুল কাদের জিলানী রহ. এর মধ্যে সেটা বিশ্বাসের কারণে আমি শিরক করে ফেলেছি? বিষয়টা কি আসলে এমন?
এটাকে শিরক কেন বললেন? পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে মুহূর্তে আরেক প্রান্তে যাওয়াটাই যদি শিরক হয়, তাহলে এই ক্ষমতা তো ফেরেশতাদের আছে। জিনদের আছে। তো? ফেরেশতা আর জিনরা তাহলে শিরক করছে?
নিজেদের ভুল বুঝের কারণে শিরকের বিষয়টাকে এসমস্ত ভাইয়েরা সস্তা বানিয়েছেন। সবচেয়ে বড় কথা হলো, তারা সারা জীবন তাউহীদ শিরকের নসীহত করলেও তারা গভীরভাবে তাওহিদ ও শিরক বোঝে না। এটা আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা।

শিরক সমাচার-৪

আল্লাহ তায়ালার সত্ত্বা,গুণ ও কাজ অতুলনীয় ও অনন্য। এখানে তুলনা, সাদৃশ্য ও সমকক্ষ বলতে কিছু নেই।
আল্লাহর এই অনন্য সত্ত্বা, গুণ বা কাজের কোন কিছু যখন অন্যের জন্য সাব্যস্ত করা হবে বা তার সাথে সাদৃশ্য দেয়া হবে, তখন সেটি শিরক হবে। খাসাইসুস রুবুবিয়্যা বা একমাত্র আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য অন্যের জন্য সাব্যস্ত করাটা হলো শিরক।
যখন কোন একটা বিষয়কে আমরা শিরক বলবো, তখন এই বিষয়গুলো স্পষ্ট করা খুব জরুরি,
১. কী বিষয়ে আল্লাহর সাথে অংশীদার সাব্যস্ত করা হয়েছে? আল্লাহর কোন গুণ বা কাজের মধ্যে অংশীদার করা হয়েছে?
২. যে বিষয়কে শিরক বলা হচ্ছে, সেই গুণ বা কাজ কি শুধু আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট?
কেউ যদি আপনাকে বলে, ভাই, এটা শিরক।
আপনি সাথে সাথে তাকে জিজ্ঞেস করবেন, আল্লাহর কোন গুণ বা কাজের সাথে অন্যকে অংশীদার করা হয়েছে বলুন। আর সেই গুণ বা কাজটিকে আল্লাহর জন্য খাস বা নির্দিষ্ট কি না?
যেই শিরকের আলোচনা কররুক, তার কাছ থেকে এই দুই প্রশ্নের উত্তর নেয়া ছাড়া শিরকের আলোচনায় অগ্রসর হবেন না। কারও মুখে শিরক বলার দ্বারা কোন বিষয় শিরক হয়ে যাবে না। এজন্য সব সময় সঠিক বুঝকে গুরুত্ব দিতে হবে। যে এটাকে শিরক বলছে, সে আসলেই সঠিক বুঝেছে কি না, সেটা যাচাই করতে হবে।
যেসব বিষয়কে নিয়ে খুব বাড়াবাড়ি করা হয় এরকম একটা উদাহরণ দেই।
আপনি আপনার কাছে উপস্থিত কাউকে একটা চেয়ার এনে দিতে বললেন। সে আপনাকে চেয়ারটা এনে দিলো। ঘটনাটি খুব স্বাভাবিক। এখানে অন্য কোন চিন্তা করবে কি না।
কিন্তু আপনি ঢাকায় আছেন। খুলনায় আপনার বাড়ীতে আপনার পছন্দের একটা চেয়ার আছে। আপনি কাউকে বললেন যে, তুমি এখনই আমাকে চেয়ারটা এনে দাও।
ধরে নিন, সে সাথে সাথে চেয়ারটা আপনার সামনে এনে দিলো। ঘটনাটি অস্বাভাবিক।
প্রথম ঘটনায় কেউ আপত্তি করবে কি না। কিন্তু দ্বিতীয় ঘটনায় কিছু ভাই আপত্তি করবেন। তারা বলবেন, দ্বিতীয় ঘটনা শিরক।
যখনই এধরণের লোকেরা দ্বিতীয় ঘটনাকে শিরক বলবে, আপনি তাদেরকে উপরের প্রশ্ন দু’টি করুন।
১. খুলনা থেকে ঢাকায় মুহূর্তের মধ্যে চেয়ার আনাটা শিরক হবে কেন? এটাকে শিরক বলার অর্থ হলো আল্লাহর সাথে অংশীদার করা। এখন এই কাজটা করে আল্লাহর কোন বিষয়ের সাথে অংশীদার করা হয়েছে?
২. মুহূর্তের মধ্যে শত মাইল বা হাজার মাইল দূর থেকে কোন কিছু উপস্থিত করে দেয়া, এটা আল্লাহর অনন্য বৈশিষ্ট্য বা গুণ? এটা কি শুধু আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট্য? এটা কি খাসাইসুস রুবুবিয়া? আল্লাহর জন্য খাস কোন বিষয়?
সত্য কথা হলো, যেসব ভাই শিরক বলেন, তারা এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেন না।
এবার আসুন আমরা ঘটনা দু’টো বিশ্লেষণ করি।
১ম ঘটনা: আপনার সামনে উপস্থিত কাউকে কাছের একটি চেয়ার এগিয়ে দিতে বলা
কোন কিছু এনে দেয়া বা উপস্থিত করা একটি ক্ষমতা। আপনার সামনে উপস্থিত কাউকে যখন বললেন, চেয়ারটা এনে দাও। আপনি তার ব্যাপারে চিন্তা করেছেন, চেয়ারটা উপস্থিত করার ক্ষমতা তার আছে। এখন এই ব্যক্তির চেয়ার উপস্থিত করার ক্ষমতা সম্পর্কে আপনার দু’টি বিশ্বাস থাকতে পারে।
শিরক: চেয়ার উপস্থিত করার এই ক্ষমতা তার নিজস্ব। এ ব্যাপারে সে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও স্বাধীন।
শিরক নয়: লোকটির চেয়ার এগিয়ে দেয়ার ক্ষমতা আছে। তবে এই ক্ষমতা তার নিজস্ব নয়। এটি আল্লাহর দেয়া ক্ষমতা। এ ব্যাপারে সে স্বয়ংসম্পূর্ণও নয়। সে স্বাধীনও নয়। আল্লাহর হুকুম ও মর্জির উপর তার ক্ষমতা নির্ভরশীল।
আপনার কাছে উপস্থিত একটা লোকের জন্য সামনের চেয়ারটি এগিয়ে দেয়া খুব স্বাভাবিক হলেও আপনি যদি তার এই ক্ষমতাকে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও স্বাধীন মনে করেন, তাহলে এটি শিরক হবে।
২ য় ঘটনা: মুহূর্তে খুলনা থেকে ঢাকায় চেয়ার এনে দেয়া
শিরক: লোকটির নিজস্ব, স্বয়ংসম্পূর্ণ ও স্বাধীন ক্ষমতা রয়েছে। যার মাধ্যমে সে খুলনা থেকে চেয়ারটি এনেছে।
শিরক নয়: লোকটির ক্ষমতা নিজস্ব নয়। সে এ ব্যাপারে স্বাধীন ও স্বয়ংসম্পূর্ণও নয়। তার এই ক্ষমতা আল্লাহর দেয়া। এটি আল্লাহর হুকুম ও ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল।
কোন ঘটনা স্বাভাবিক হলেও সেখানে শিরক হতে পারে। এমনকি তুচ্ছ ঘটনাতেও মানুষ শিরক করতে পারে। যেমন ধরেন ওষূধ খেলে ভালো হয়ে যান, এটা স্বাভাবিক ঘটনা। আপনার জীবনে নিত্যদিন ঘটছে। ওষুধ খেয়ে সুস্থ হওয়ার ক্ষেত্রে যদি আপনার বিশ্বাস থাকে, ওষুধ তার নিজস্ব, স্বয়ংসম্পূর্ণ ও স্বাধীন ক্ষমতায় আমাকে সুস্থ্য করেছে। তাহলে এটি নিশ্চিত শিরক। যদিও এটি স্বাভাবিক ঘটনা।
আবার খুবই অস্বাভাবিক ঘটনার ক্ষেত্রে যদি আপনার বিশ্বাস থাকে যে এটি আল্লাহর দেয়া ক্ষমতা ও তার ইচ্ছায় হয়েছে, তাহলে এটি শিরক হবে না। যেমন ধরুন মুমুর্ষু ক্যান্সারের রোগীকে কোন হুজুর শরয়ী ঝাড়ফুক করাতে সে সুস্থ্য হয়ে গেলো। এটা একটা অস্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু এখানে যদি আপনি বিশ্বাস রাখেন, উক্ত হুজুরের নিজস্ব ক্ষমতা নেয়। আল্লাহর মর্জি ও ক্ষমতায় হয়েছে, তাহলে এটি অস্বাভাবিক হলেও শিরক হবে না।
চেয়ার উপস্থিত করার ঘটনায় ফিরে আসি। হযরত সুলাইমান আ. এর এক উম্মত মুহূর্তে হাজার মাইল দূরের সিংহাসন চোখের পলকে উপস্থিত করেছিলেন। ঘটনাটি পবিত্র কুরআনেই আছে।
এটি একটি অস্বাভাবিক ঘটনা। এটা কি শিরক? অবুঝ ভাইদের মূলনীতি অনুযায়ী শিরক হওয়া উচিত। কিন্তু এটি শিরক নয়। সুলাইমান আ. যখন বলেছিলেন, তোমাদের মধ্যে কে আছো যে সিংহাসনটি উপস্থিত করবে, তখন তার অন্তরে আদৌ এটা ছিলো না যে, উপস্থিত জিন ও মানুষের নিজস্ব, স্পয়ংসম্পূর্ণ এই ক্ষমতা আছে।
তার উম্মত যখন সিংহাসনটি চোখের পলকে উপস্থিত করে দিলো, তখন তিনি এই চিন্তা করেননি যে, এটা তার নিজস্ব ক্ষমতা। হযরত সুলাইমান আ. বলেছেন,
هذا من فضل ربي
এটা আমার প্রভূর অনুগ্রহ। সূরা নামল।
ঘটনা স্বাভাবিক হোক আর অস্বাভাবিক, আমরা সবগুলোকেই আল্লাহর অনুগ্রহ মনে করি। আল্লাহর দেয়া ক্ষমতা ও ইচ্ছায় ঘটেছে সেটি বিশ্বাস করি। স্বাভাবিক ঘটনা নিজের ক্ষমতায় আর অস্বাভাবিক ঘটনা আল্লাহর ক্ষমতায় হয়েছে, এটি আমরা বিশ্বাস করি না। বরং এটিকে আমরা শিরক মনে করি। আমাদের আকিদা হলো,
সঠিক আকিদা: স্বাভাবিক ও অস্বাভাবিক উভয়টিই আল্লাহর দেয়া ক্ষমতায় হয়।
শিরকী আকিদা-১: স্বাভাবিক ঘটনা বা কাজ নিজের ক্ষমতায় হয়, অস্বাভাবিক ঘটনা আল্লাহর দেয়া ক্ষমতায় হয়।
শিরকী আকিদা -২. অস্বাভাবিক ঘটনা বা কাজ নিজের ক্ষমতায় হয়।
আপনি যদি বিশ্বাস করেন, কেউ তার নিজস্ব, স্বয়ংসম্পূর্ণ ক্ষমতায় এক গ্লাস পানি দিতে পারে, তাহলেও এটি শিরক হবে। কিন্তু আপনি যদি বিশ্বাস করেন, আল্লাহর দেয়া ক্ষমতায় কেউ মুহূর্তে আটলান্টিক মহা সাগর পানি শূন্য করে দিতে পারে, তাহলে সেটা আদৌ শিরক হবে না।

শিরক সমাচার-৫

আল্লাহর সত্তা, গুণ ও কাজ সবকিছুই অনন্য ও অতুলনীয়। তার সাথে তুলনীয় কিছুই নেই। আল্লাহ তায়ালা মানুষকে কিছু গুণ দিয়েছেন। বিভিন্ন কাজের ক্ষমতা দিয়েছেন। মানুষের এসব গুণাবলীর নাম আল্লাহর কোন গুণ বা কাজের নামের সাথে মিলতে পারে। যেমন: মানুষ দয়া করে, আল্লাহও দয়া করেন। মানুষ সাহায্য করে আবার আল্লাহ তায়ালাও সাহায্য করেন।

এখানে অবশ্যই মনে রাখতে হবে, এটি শুধু শাব্দিক মিল। কিন্তু মৌলিক দিক থেকে দু’টির মধ্যে কোন ধরণের সাদৃশ্য ও তুলনাও চলবে না। শাব্দিক এই মিলের কারণে মৌলিক দিক থেকে উভয়টিকে এক মনে করা কিংবা তুলনা করাটাই শিরক।

মানুষকে আল্লাহ তায়ালা যেই ক্ষমতা দিয়েছেন এটি সসীম। আল্লাহর ইচ্ছা ও মর্জির উপর নির্ভরশীল। এটি স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। আল্লাহ তায়ালা যে কোন মুহূর্তে তার চোখের দৃষ্টি কেড়ে নিতে পারেন। পায়ের চলার ক্ষমতা ছিনিয়ে নিতে পারেন। কথা বলার ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে বোবা করে দিতে পারেন। শ্রবণ ক্ষমতা দূর করে বধির বানাতে পারেন।

যে কোন ধরণের সৃষ্টিই হোক না কেন, প্রত্যেকের ক্ষমতা ও গুণাগুণ সীমিত ও আল্লাহর ইচ্ছার অধীন। এসব গুণ ও ক্ষমতা আল্লাহর দেয়া।

জিন ও ফেরেশতাদের অস্বাভাবিক ক্ষমতা আল্লাহ তায়ালা দিয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে আমরা সেগুলো কল্পনাও করতে পারি না। হযরত ইস্রাফিল আ.কে যে ক্ষমতা দিয়েছেন একটু চিন্তা করে দেখুন। তার এক ফুৎকারে মহাপ্রলয় সংঘঠিত হয়ে যাবে। তাদের এই অকল্পনীয় ক্ষমতাও সসীম এবং আল্লাহর দেওয়া। এগুলো কখনও স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। মোট কথা সৃষ্টির যতো ক্ষমতা, গুণাগুণ ও কাজ রয়েছে, এগুলো যতই অস্বাভাবিক হোক না কেন, সবই সসীম, আল্লাহর দেয়া এবং তার ইচ্ছা ও মর্জির উপর নির্ভরশীল।

সমস্ত সৃষ্টির সকল ক্ষমতা, গুণ ও কাজ যেহেতু সসীম এবং আল্লাহর দেওয়া, এজন্য সৃষ্টির কোন কিছুই কখনও আল্লাহর সাথে তুলনীয় হতে পারে না। যতো বেশিই ক্ষমতা হোক, যতো অকল্পনীয় কাজই হোক সৃষ্টির সব কিছুই সসীম ও আল্লাহর মুখাপেক্ষী।

কোন সৃষ্টিকে আল্লাহ তায়ালা অসীম, স্বয়ংসম্পূর্ণ ও স্বাধীন ক্ষমতা ও গুণ দিবেন না। এটি অসম্ভব। কারণ আল্লাহ তায়ালা যখন তাকে ক্ষমতা দিবেন তখন এটি স্বয়ংসম্পূর্ণ রইলো না। এটি তখন অন্যের কাছ থেকে নেওয়া হলো। এভাবে আল্লাহ তায়ালার সাথে তুলনীয় কোন গুণই কোন সৃষ্টির মধ্যে থাকতে পারে না।

কোন কোন ধর্মে দেখা যায়, এক ভগবান আরেক ভগবানকে বিশেষ ক্ষমতা দিচ্ছেন। যাকে ক্ষমতা দেয়া হলো, তিনি তো আদৌ ভগবান হওয়ার যোগ্য নয়। কারণ তিনি অন্যের কাছ থেকে ক্ষমতা নিচ্ছেন। তিনি অন্যের ক্ষমতার মুখাপেক্ষী। সুতরাং যে অন্যের ক্ষমতার মুখাপেক্ষী, সে ভগবান হয় কীভাবে?

এজন্য আমাদের অন্তরে দৃঢ় বিশ্বাস থাকবে, সৃষ্টির কোন ক্ষমতা, কাজ বা গুণ কখনও স্বয়ংসম্পূর্ণ, স্বাধীন ও অসীম হতে পারে না। আর আল্লাহ তায়ালা কখনও কাউকে এধরণের ক্ষমতা বা গুণ দিবেন না।

জিন, ফেরেশতা, মানুষ, গাছপালা সব কিছুর সকল ক্ষমতা ও গুণ আল্লাহর দেওয়া। এরা সকলেই আল্লাহর সৃষ্টি ও আল্লাহর মুখাপেক্ষী। এগুলো নিজেরা স্বয়ংসম্পূর্ণ ও স্বাধীন নয়। কখনও হতেও পারবে না। এজন্য কোন সৃষ্টিই ইবাদতের উপযুক্ত হতে পারে না। একমাত্র আল্লাহ তায়ালাই ইবাদতের উপযুক্ত।

একথা যেহেতু নিশ্চিত যে, কোন সৃষ্টিই স্বয়ংসম্পূর্ণ, স্বাধীন ও অসীম ক্ষমতা ও গুণের অধিকারী হতে পারবে না, এজন্য কোন সৃষ্টির মাঝে এটির কল্পনা করাই হলো শিরক। গরুর মধ্যে এধরণের কোন কিছু কল্পনা করলে শিরক। গাছ, মানুষ ইত্যাদি যার মধ্যেই এটি বিশ্বাস করা হোক না কেন, এটি শিরক হবে।

সৃষ্টির কাজ যত বড়ই বিস্ময়কর হোক না কেন, সেটি কখনও স্বয়ংসম্পূর্ণ ও স্বাধীন হতে পারে না। একজন মুসলিম হিসেবে অবশ্যই এই বিশ্বাস রাখতে হবে।

আমাদের আলোচনার সারমর্ম হলো:

১. আল্লাহর গুণ ও কাজের সাথে মানুষের গুণ ও কাজের শাব্দিক মিল থাকলেও মৌলিক দিক থেকে কখনও একটি আরেকটির সাথে তুলনীয় হতে পারে না। মৌলিক দিক থেকে আল্লাহর গুণ বা কাজের সাথে তুলনা করলেই শিরক।

২. সৃষ্টির ক্ষমতা, গুণ ও কাজ কখনও স্বয়ংসম্পূর্ণ, স্বাধীন ও অসীম হতে পারে না। সৃষ্টির মধ্যে এজাতীয় কিছু বিশ্বাস করলেই শিরক।

কোন পীরের মধ্যে যদি বিশ্বাস করেন, তার নিজস্ব বিশেষ ক্ষমতা আছে তাহলে সেটিও শিরক। কোন সৃষ্টিরই নিজস্ব কোন ক্ষমতা নেই। ওমুক বুজুর্গের মনে হয় নিজের বিশেষ কিছু আছে এজাতীয় চিন্তা চেতনাও শিরক। সৃষ্টির সকল ক্ষমতা আল্লাহর দেয়া এবং আল্লাহর ইচ্ছা ও মর্জির উপর নির্ভরশীল। কোন পীর আল্লাহর হুকুম ছাড়া চোখের পলকও ফেলার ক্ষমতা রাখে না। একজন মু’মিনের জন্য অবশ্যই এই বিশ্বাস রাখতে হবে।

৩. আল্লাহ তায়ালা কখনও কোন সৃষ্টিকে স্বয়ংসম্পূর্ণ, স্বাধীন ও অসীম ক্ষমতা দিবেন না। কারণ অন্যের দেয়া ক্ষমতা কখনও স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে না। এজন্য এটি একটি স্ববিরোধী অসম্ভব বিষয়। মোটকথা আল্লাহ তায়ালা কখনও নিজের গুণ অন্য কাউকে দিবেন না। কারণ আল্লাহর গুণ অন্যকে দেয়ার অর্থ হলো আরেক জনকে আল্লাহ বানানো। যেটা স্ববিরোধী ও বাস্তবে অসম্ভব। এজন্য হিন্দু বা অন্য যেসব ধর্মে একেক ভগবানকে একেক ধরণের ক্ষমতা দেয়ার যে ধারণা প্রচলিত আছে, এটি সম্পূর্ণ অবাস্তব। অন্যের কাছ থেকে ক্ষমতা গ্রহণ করলে সে কখনও ভগবান হওয়ার যোগ্য হতে পারে না। এজন্য বিদ্যা বুদ্ধির জন্য এক ভগবানকে, রিজিকের জন্য আরেক ভগবানকে মানা হলো চরম মূর্খতা। যিনি রিজিকের ভগবান তিনি নিজেই অসম্পুর্ণ ও অন্যের মুখাপেক্ষী। এরকম অসম্পুর্ণ ও মুখাপেক্ষী কীভাবে ভগবান হওয়ার যোগ্য হয়?

শিরক সমাচার-৬

আমরা গত পর্বে আলোচনা করেছি, আল্লাহ তায়ালা ছাড়া কোন কিছুর মাঝেই স্বয়ংসম্পূর্ণ ও স্বাধীন ক্ষমতা বা অন্য কোন গুণ থাকতে পারে না। সমস্ত সৃষ্টিই আল্লাহর মুখাপেক্ষী। সমস্ত সৃষ্টির অস্তিত্বই আল্লাহর ইচ্ছা ও মর্জির অধীন।

সহজ কথা হলো, অন্যের মুখাপেক্ষী কেউ কখনও রব বা প্রভূ হতে পারেন না। যিনি নিজেই অন্যের উপর নির্ভরশীর তিনি কী করে প্রভূ হবেন? আর যে প্রভূ নয় তার সামনে মাথা নত করার প্রশ্নই ওঠে না। যে অন্যের মুখাপেক্ষী সে কখনও ইবাদত পাওয়ারও যোগ্য হতে পারে না। সমস্ত সৃষ্টি যেহেতু আল্রাহর মুখাপেক্ষী, আল্লাহর ইচ্ছা ও মর্জির অধীন, এজন্যই সৃষ্টির কোন কিছুই ইবাদত পাওয়ার যোগ্য না।

হিন্দুরা গাছের পূজা করছে। অথচ এই গাছ একটি নগন্য সৃষ্টি। হিন্দুরা গরুর পূজা করে। এটাও একটা নগন্য সৃষ্টি। মূর্তির পূজা করে। যা তাদের নিজস্ব বানানো। তাদের যেসব দেবতা বা ভগবান রয়েছে, এর কেউ-ই স্বয়ংসম্পূর্ণ ও স্বাধীন নয়। নতুবা তারা বহু খোদায় বিশ্বাসী হতো না।

কোন সৃষ্টিই যে ইবাদত পাওয়ার যোগ্য না একথা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হওয়ার পরও মানুষ সৃষ্টির সামনে মাথা নত করে। সৃষ্টির পূজা করে। সৃষ্টির ইবাদত করে। একজন মুসলিম হিসেবে আমাদেরকে অবশ্যই বিশ্বাস রাখতে হবে, সমস্ত সৃষ্টি যেহেতু আল্লাহর অধীন ও তার মুখাপেক্ষী, এজন্য কোন সৃষ্টিই ইবাদত পাওয়ার উপযুক্ত নয়। একমাত্র ইবাদত পাওয়ার উপযুক্ত হলেন আল্লাহ তায়ালা।

আমাদের পরবর্তী আলোচনা বোঝার জন্য ইবাদত কাকে বলে সেটি আগে বুঝতে হবে।

ইবাদতের শাব্দিক অর্থ হলো, বিনয প্রকাশ করা, নত হওয়া।
শুধু বিনয় প্রকাশ করলেই তাকে ইবাদত বলা হয় না। ছেলে পিতা-মাতার সামনে বিনয় প্রকাশ করে, কিন্তু এটি ইবাদত নয়। সাহাবীগণ নবীজী স. এর সামনে বিনয়ী থাকতেন, এটাও তাদের ইবাদত ছিলো না। ছাত্র উস্তাদের সামনে বিনয়ী হয়, এটাও উস্তাদের ইবাদত নয়। এজন্য ইবাদতের পারিভাষিক অর্থ আমাদেরকে জানতে হবে।

ইবাদতের পারিভাষিক অর্থ হলো,

الخضوع باعتقاد شيء من خصائص الربوبية في المخضوع له .
কাউকে রব বা প্রভূ হওয়ার যোগ্য মনে করে তার সামনে নত হলে তাকে ইবাদত বলা হয়। অর্থাত কারও মধ্যে প্রভূ হওয়ার অনন্য বৈশিষ্ট্য আছে এই বিশ্বাস করে যদি তার জন্য বিনয় প্রকাশ করা হয় তাহলে তাকে ইবাদত বলে।

ইবাদত হওয়ার জন্য মৌলিক শর্ত হলো, যার ইবাদত করা হচ্ছে তাকে প্রভূ মনে করা বা তার মধ্যে প্রভূর কোন গুণ আছে এটা বিশ্বাস করা। অন্তরে যদি এই বিশ্বাস না থাকে তাহলে শুধু বাহ্যিক কাজকে ইবাদত বলা হবে না।

যেমন আপনি আপনার বাবার সামনে হাত বেধে দাড়িয়ে রইলেন। শুধু হাত বেধে দাড়ানোর কারণেই এটি ইবাদত হবে না। যতক্ষণ পয়র্ন্ত আপনার বাবাকে প্রভূ বা প্রভূর কোন গুণাগুণ বাবার মধ্যে আছে বিশ্বাস করবেন, ততক্ষণ এটি ইবাদত বলে গন্য হবে না।

আপনি বিপদে পড়ে কারও সাহায্য চাইলেন। কোন মানুষের কাছে শুধু সাহায্য চাইলেই সেটি ইবাদত হবে না। যার কাছে সাহায্য চাচ্ছেন তার ইবাদতের নিয়ত থাকতে হবে।

এ বিষয়ে ইমাম শাতবী রহ. খুবই চমৎকার একটি বিশ্লেষণ উল্লেখ করেছেন তার আল-মুয়াফাকাত কিতাবে। তিনি লিখেছেন,

المسألة الأولى : إن الأعمال بالنيات والمقاصد معتبرة في التصرفات من العبادات والعادات والأدلة على هذا المعنى لا تنحصر .
ويكفيك منها أن المقاصد تفرق بين ما هو عادة وما هو عبادة ، وفي العبادات بين ما هو واجب وغير واجب ، وفي العادات بين الواجب والمندوب والمباح والمكروه والمحرم والصحيح والفاسد وغير ذلك من الأحكام ، والعمل الواحد يقصد به أمر فيكون عبادة ، ويقصد به شيء آخر فلا يكون كذلك ، بل يقصد به شيء فيكون إيمانا ، ويقصد به شيء آخر فيكون كفرا كالسجود لله أو للصنم .
وأيضا فالعمل إذا تعلق به القصد تعلقت به الأحكام التكليفية ، وإذا عري عن القصد لم يتعلق به شيء منها كفعل النائم والغافل والمجنون .

অর্থ: সমস্ত কাজ নিয়তের উপর নির্ভরশীল। ইবাদত ও স্বাভাবিক সকল কর্মকান্ডে মূল ধর্তব্য বিষয় হলো অন্তরের নিয়ত বা উদ্দেশ্য। সকল কাজে অন্তরের নিয়ত যে মূল ধর্তব্য বিষয়, এর অসংখ্য দলিল রয়েছে।

দলিল হিসেবে আপনার জন্য এতটুকু যথেষ্ট যে, ইবাদত ও আদত (অভ্যাসগত কাজ) সকল ক্ষেত্রে উদ্দেশ্য ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। ইবাদতের মধ্যে আবার ওয়াজিব ও গাইরে ওয়াজিবের মধ্যে নিয়তের পার্থক্য হয়ে থাকে। আদত বা অভ্যাসগত কাজের মধ্যেও ওয়াজিব, নফল, মুবাহ, মাকরুহ, হারাম, সহীহ, ভুল ইত্যাদি বিধানের ক্ষেত্রেও নিয়তের তারতম্য ধর্তব্য হয়।

একই কাজ এক ধরণের নিয়তের কারণে সেটি ইবাদত হয় আবার নিয়তের ভিন্নতার কারণে সেটি ইবাদত হয় না। একই কাজে এক ধরণের নিয়তের কারণে সেটি ইমান হয়, আবার নিয়তের ভিন্নতার কারণে সেটি কুফুরী হয়। যেমন, আল্লাহর জন্য সিজদা করলে ইমান হয়। কিন্তু একই সিজদা মূর্তির জন্য করলে কুফুরী হয়।

অতএব, আমল বা কাজের সাথে যখন নিয়ত যুক্ত হবে তখনই এর উপর শরয়ী বিধান প্রযোজ্য হবে। কোন কাজ যদি নিয়ত থেকে মুক্ত হয়, তাহলে এর সাথে শরয়ী বিধান যুক্ত হবে না। যেমন ঘুমন্ত ব্যক্তির কাজ। উদাসীন ও পাগলের কাজ। এগুলোর সাথে নিয়ত যুক্ত না হওয়ার কারণে এটি ধর্তব্য হবে না।

আল-মুয়াফাকাত, খ.৩,পৃ.৭-৯

মোটকথা নীচের তিনটি বিষয়ের যে কোন একটি যদি কোন কাজের মধ্যে যদি পাওয়া যায়, তাহলে সেটি ইবাদত ধরা হবে,
১. কারও মধ্যে প্রভূ হওয়ার অনন্য বৈশিষ্ট্য আছে বলে বিশ্বাস করা।
২. কাউকে ইলাহ বা ইবাদতের উপযুক্ত বলে বিশ্বাস করা ।
৩. যে কোন কাজের সাথে ইবাদতের নিয়ত যুক্ত থাকা।

সুতরাং যে কোন কাজের সময় যদি উক্ত তিনটি বিষয়ের কোন একটি পাওয়া যায়, তাহলে সেই কাজকে ইবাদত বলে গণ্য করা হবে। নতুবা এটি ইবাদত হবে না।

ফেরেশতাগণ হযরত আদম আ. কে সিজদা করেছিলো। কিন্তু আদম আ. এর ব্যাপারে উপরের তিনটি বিষয়ের কোনটি না থাকার কারণে এটি ইবাদত হয়নি। ফেরেশতারা আদম আ. এর মধ্যে আল্লাহর কোন গুণ আছে বলে বিশ্বাস করতো না বা আল্লাহর কোন গুণের সাথে আদম আ. এর কোন গুণ বা কাজকে তুলনা করেননি। ফেরেশতারা আদম আ.কে ইলাহ মনে করেননি। সিজদা করার সময় আদম আ. এর ইবাদতের নিয়তও তাদের ছিলো ন। এজন্য এটি সিজদা হওয়া সত্ত্বেও আদম আ. এর ইবাদত বলে গণ্য হবে না।

কিন্তু এটি আল্লাহর ইবাদত বলে গণ্য হবে। কারণ ফেরেশতাগণ আল্লাহর আদেশ মানার উদ্দেশ্যে সিজদা করেছেন। আর সিজদার সময় তারা আল্লাহ তায়ালাকে প্রভূ হিসেবে বিশ্বাস করতেন।

ইবাদত নয়: আদম আ. এর ইবাদতের নিয়ত না থাকার কারণে তাকে সিজদা করা সত্ত্বেও এই সিজদাকে ইবাদত ধরা হবে না।

একইভাবে ইউসুফ আ. এর ভাইয়েরা তাকে সিজদা করেছিলো। ইউসুফ আ. কে সিজদা করার সময় তাদের অন্তরে উপরে কোন একটি বিষয়ও ছিলো না, যার কারণে ইউসুফ আ.কে সিজদা করা সত্ত্বেও এটি ইবাদত ধরা হবে না।

সমস্ত সৃষ্টিই আল্লাহর ইবাদত করে থাকে। তারা অন্য কারও ইবাদত করে না। রাসূল স. এর জন্য গাছ ও পাথর সিজদা করতো। কিন্তু এটি তাদের ইবাদত নয়। কারণ গাছ ও পাথর রাসূল স. এর ইবাদতের উদ্দেশ্যে সিজদা করতো না।

সুতরাং ইবাদত হলো, কাজ বা আমল + ইবাদতের নিয়ত। ইবাদতের নিয়ত না থাকলে শুধু কাজকে ইবাদত বলা হবে না।

সঠিক বুঝ কেন জরুরি?

আমাকে একজন প্রশ্ন করেছেন,
শায়েখ,কেউ যদি কোন ভন্ড পীরকে সেজদা দেয় কিন্তু পীরকে সে আল্লাহ মনে করে না তাহলে শিরক হবে??

আমি উত্তরে লিখেছিলাম:
ইসলামে আল্লাহ তায়ালা ছাড়া অন্য কারও জন্য সিজদা করা সম্পূর্ণ হারাম। কেউ যদি পীরের কোন গুণ বা কাজকে আল্লাহ তায়ালার সমকক্ষ পর্যায়ে বিশ্বাস না করে তাহলে তার কাজটা হারাম হলেও শিরক হবে না।

আমাদের এক প্রিয় ভাই লিখেছেন,

/এটা শিরক হবে ।কারণ সিজদা কাকে করা যাবে বা যাবে না তা জায়েয নাজায়েয করবেন কেবল আল্লাহ ।বিনয় হোক ইবাদাত হোক সিজদা আল্লাহ কেবল তাঁর জন্যেই নির্দিষ্ট করেছেন ।তাই অন্য কাউকে বিনয় হোক বা ইবাদাত হোক সিজদা করা হারাম ।এক মাখলুক কে আরেক মাখলুকের কাছে মর্যাদাবান করতে আদম আং কে সিজদা তিনিই জায়েয করেছেন আর একই কারণে পিতামাতার জন্য জায়েয করলেও তিনিই করতেন যদিও এটি সেই উদ্দেশ্যেও কেবল তাঁরই যোগ্য ছিল ।তাই এটা তাঁর ইচ্ছা সুতরাং সেই উদাহরণ টানা যাবে না ।তাই কোন মুমিন যদি এই সিজদাতে কাউকে শরীক করে আল্লাহকে ছাড়া তবে তিনি আল্লাহকে (কেবল সিজদার যোগ্য বলে) বিশ্বাস করা সত্যেও শিরক করলেন ।এতে কোন সন্দেহ নেই ।/

প্রিয় ভাইয়ের কমেন্ট থেকে আমি যা বুঝেছি,
১. কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ মনে করা ছাড়া সম্মান বা অন্য কোন উদ্দেশ্যে সিজদা করলেও শিরক হবে।
২. আল্লাহ তায়ালা চাইলে অন্য কাউকে সম্মান বা বিনয়ের উদ্দেশ্যে সিজদা করার অনুমতি দিতে পারেন। যেমন আদম আ. কে সিজদার আদেশ করেছিলেন। মূল কাজটি শিরক হলেও আল্লাহর অনুমতির কারণে এটা জায়েজ হবে।

উপরের কমেন্ট থেকে আশা করি আমার বুঝটি ঠিক আছে। আসুন তার কথাগুলো একটু বিশ্লেষণ করি।

মৌলিকভাবে অন্য কাউকে সিজদা করা হলো শিরক। তবে আল্লাহ তায়ালা অনুমতি দিলে এটি জায়েজ।
আমি তো তার এই বুঝ দেখে প্রচন্ড অবাক হয়েছি। একটা কাজ মৌলিকভাবে শিরক কিন্তু কিন্তু আল্লাহ তায়ালা অনুমতি দিলে সেটা শিরক নয়। এর অর্থ দাড়ালো আল্লাহ তায়ালা শিরকের অনুমতি দেন।

আদম আ.কে সিজদা করা মূলত: শিরক ছিলো। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা অনুমতি বা আদেশ দেয়ার কারণে শিরকটা জায়েজ হয়েছে। আদম আ.কে সিজদার আদেশ করে আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতাদেরকে শিরক করার আদেশ করেছেন। কিন্তু ইবলিশ আল্লাহ তায়ালার সাথে শিরক করার এই আদেশ লংঘন করেছে।

এটা হলো উক্ত ভাইয়ের বক্তব্যের পরিণতি। ইসলামের আগে অন্যান্য ধর্মে সম্মানের সিজদা জায়েজ ছিলো। এর অর্থ আল্লাহ তায়ালা অন্য সবাইকে তার সাথে শিরক করার অনুমতি দিয়েছেন। শুধু আমাদেরকে তার সাথে শিরক করার অনুমতি দেননি।

আল্লাহ তায়ালা শিরক করার অনুমতি দেন, এটা কীভাবে সম্ভব? কোন জিনিসকে হালাল করা বা হারাম আল্লাহ তায়ালা তার ইচ্ছা অনুযায়ী করেন। তবে আল্লাহ তায়ালা তার সাথে শিরক করার অনুমতি দিবেন এটা আপনি চিন্তা করলেন কী করে?

এটাই বুঝের সমস্যা। একটু বুঝের সমস্যার কারণে অভিশপ্ত ইবলিশের কাজ ভালো হয়ে গেলো। আল্লাহ তায়ালা সবাইকে শিরক করার আদেশ করেছেন। কিন্তু ইবলিশ শিরক করেনি। কোন লুকোচুরি ছাড়া বললে এটাই উপসংহার বের হয়। নাউযুবিল্লাহ।

শিরক একটি জঘন্য কাজ। আর পবিত্র কুরআনে রয়েছে, আল্লাহ তায়ালা কখনও জঘন্য ও গর্হিত কাজের আদেশ করেন না। إن الله لا يأمر بالفحشاء

এজন্য সঠিক বুঝ সব ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা গত পর্বে আলোচনা করেছি যে, যে কোন কাজের সাথে নীচের কোন একটি বিষয় সম্পৃক্ত হলে সেটি শিরক হবে।

১. কারও মধ্যে প্রভূ হওয়ার অনন্য বৈশিষ্ট্য আছে বলে বিশ্বাস করা।
২. কাউকে ইলাহ বা ইবাদতের উপযুক্ত বলে বিশ্বাস করা ।
৩. যে কোন কাজের সাথে ইবাদতের নিয়ত যুক্ত থাকা।

কারও সামনে মাথা নত করা একটি কাজ। এর সাথে যদি উপরের তিনটি বিষয়ের কোন একটি সম্পৃক্ত থাকে, তাহলে সেটি শিরক হবে। নতুবা শুধু মাথা নত করার কারণে শিরক হবে না। যে কোন কাজই হোক, শুধু কাজকেই মৌলিক শিরক হিসেবে বিবেচনা করা হবে না। এর সাথে উপরের তিনটি বিষয়ের কোন একটি যুক্ত হলেই কেবল শিরক হিসেবে গণ্য করা হবে।

কিছু কিছু আলেম সরাসরি কিছু কাজকেই কুফুরী বা শিরকী বলেছেন। যেমন কেউ মূর্তির সামনে সিজদা করছে। অথবা কুরআন শরীফ ছুড়ে ফেলছে। সূর্যকে সিজদা করছে।

তবে সকল ক্ষেত্রেই মূল হলো অন্তরের নিয়ত। কাজের দ্বারা অন্তরের নিয়ত কিছুটা বোঝা যেতে পারে, তবে কাজই মৌলিক ফয়সালার মানদন্ড হতে পারে না। এ বিষয়ে আমরা পূর্বে আলোচনা করেছি।

Print Friendly

Previous

ইমাম তিরমিজী রহ. এর তাবীল সম্পর্কে ইবনে তাইমিয়া রহ ও তার ছাত্রের মূল্যায়ন

Next

শিরক সমাচার -৭

1 Comment

  1. Asif

    Mashallah very important topic. It shows the discrepancy and ignorance spread by the current radicalized movement of salafist ideology.

Leave a Reply

Designed By ijharul islam & Copyright iDEA