আমরা আগের পর্বগুলোতে শিরকের বাস্তবতা নিয়ে আলোচনা করেছি।  সমাজে কিছু ভাই শিকরের বিষয়ে যথেষ্ট জ্ঞান অর্জন না করে ঢালাওভাবে কিছু বিষয়কে শিরক বলে থাকে। যা একটি বড় ধরণের অন্যায়। যে কোন বিষয়ে শরিয়তের সীমা অতিক্রম করা অন্যায়। শিরকের প্রতি ঘৃণা থাকা অবশ্য কাম্য, কিন্তু অতি উৎসাহী হয়ে শিরক নয়, এমন বিষয়কে শিরক বলে প্রচার করা অন্যায়।

আজ সিজদার বিষয়ে আলোচনা করব।

সিজদা দু’প্রকার।

১. সিজদায়ে ইবাদত। ইবাদতের উদ্দেশ্যে সিজদা করা।

২. সিজদায়ে তা’জিমী। সম্মানের  উদ্দেশ্যে সিজদা করা।

ইবাদতের নিয়তে কাউকে সিজদা করলে সেটা স্পষ্ট শিরক। এখানে আর কোন কিছু চিন্তার সুযোগ নেই। তা’জিম বা সম্মানের জন্য সিজদা করলে সেটা শিরক নয়। তবে ইসলামে হারাম। 

 

এই মতটি শুধু আমাদের ঘরানার আলেমদের নয়, বরং এটি সালাফিদেরও মত।  ইবনে তাইমিয়া, ইবনুল কাইয়িম, কাজি শাওকানি, শাইখ মুহাম্মাদ বিন ইব্রাহিম, শাইখ সালেহ আল-মুনাজ্জিদসহ প্রায় সকলে এই মতের অনুসারী।

শাইখ সালেহ আল-মুনাজ্জিদ এই বিষয়ে বিস্তারিত লিখেছেন।

ইংলিশঃ https://islamqa.info/en/229780

আরবি লিঙ্ক: https://islamqa.info/ar/229780

শাইখ সালেহ আল-মুনাজ্জিদ এর দলিলগুলোর সারমর্মঃ

১। আল্লাহ তায়ালা ফেরেশাতেদেরকে আদম আঃ কে সিজদার আদেশ দিয়েছেন। মৌলিকভাবে শুধু সিজদা করায় যদি শিরক হত, তাহলে আল্লাহ তায়ালা এই আদেশ দিতেন না। কারণ আল্লাহ তায়ালা কখনও ঘৃণিত কাজের আদেশ করেন না। আর শিরক একটি ঘৃণিত কাজ।

২। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে ইউসুফ আঃ এর ঘটনা উল্লেখ করেছেন। হজরত ইয়াকুব আঃ ও তার ছেলেরা হজরত ইউসুফ আ কে সিজদা করেছিলেন। তাদের এই ঘটনা  কুরআনে রয়েছে। মূল সিজদা যদি শিরক হত, কোন নবী কখনও এটি করতেন না।

৩। হজরত মুয়াজ বিন জাবাল রাঃ ইয়ামান থেকে ফিরে এসে রাছুল সঃ কে সিজদা করেন। মূল সিজদা যদি শিরক হত তাহলে রাছুল সঃ তাকে সেটি বলে দিতেন। কিন্তু  রাছুল সঃ তাকে শুধু সিজদা হারাম হওয়ার কথা বলেছেন, শিরক হওয়ার কথা বলেননি।  হজরত মুয়াজ বিন জাবাল রাঃ  এর ঘটনাটি ইবন মাজাতে রয়েছে। হাদিসকে শাইখ নাসিরুদ্দিন আলবানি হাসান বলেছেন।

৪। কিছু কিছু হাদিস থেকে প্রমাণিত যে, বিভিন্ন প্রাণী রাছুল সঃ কে দেখে সিজদ্বা করত। মূল সিজদা যদি শিরক হত, তাহলে রাছুল এঁর ক্ষেত্রে এটি হত না।

৫। সিজদা একটা শরিয়তের বিধান ও হুকুম। যা বিভিন্ন শরিয়তে পরিবর্তন হতে পারে। কিন্তু  তাউহিদ ও শিরক অপরিবর্তনশীল। এগুলো সব নবীর শরিয়তে একই রকম থাকবে।

৬। চার মাজহাবের সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমদের মতে ইবাদতের সিজদা ও তাজিমের সিজদার হুকুমের পার্থক্য রয়েছে। ইবাদতের সিজদা শিরক কিন্ত তাজিমের সিজদা হারাম।  এরপর শাইখ সালেহ আল-মুনাজ্জিদ বিভিন্ন আলেমের বক্তব্য উল্লেখ করেছেন।  ইমাম ফখরুদ্দিন জাইলাই, ইমাম ইবনে নুজাইম আল-হানাফি, ইমাম নববি ও ইমাম শিহাবুদ্দিন রমালির বক্তব্য এনেছেন।

চার মাজহাবের গ্রহণযোগ্য মত হল, তাজিমের সিজদা হারাম শিরক নয়। এটাই দলিলের বিবেচনায় শক্তিশালী।

আমরা এখানে আরও কিছু আলেমের বক্তব্য দেখব যারা এ বিষয়ে মত দিয়েছেন।

১। ফতওয়া আল্মগিরির বক্তব্যঃ

مَنْ سَجَدَ لِلسُّلْطَانِ عَلَى وَجْهِ التَّحِيَّةِ أَوْ قَبَّلَ الْأَرْضَ بَيْنَ يَدَيْهِ لَا يَكْفُرُ , وَلَكِنْ يَأْثَمُ لِارْتِكَابِهِ الْكَبِيرَةَ , هُوَ الْمُخْتَارُ

অর্থঃ কেউ যদি বাদশাকে অভিবাদনের উদ্দেশ্যে সিজদা করে বা তার সামনে জমিনে চুমু দেয়, তাহলে সে কাফের হবে না। তবে তার কবিরা গোনাহ হবে। এটাই গ্রহণযোগ্য ফতওয়া । https://goo.gl/AYKTQf

২। ইমাম জাহাবি রহঃ তার মুজামুশ শুউখ কিতাবে লিখেছেন,

ألا ترى الصحابة من فرط حبهم للنبي –صلى الله عليه وسلم- قالوا: ألا نسجد لك؟ فقال: لا، فلو أذن لهم لسجدوا سجود إجلال وتوقير لا سجود عبادة كما سجد إخوة يوسف عليه السلام ليوسف، وكذلك القول في سجود المسلم لقبر النبي صلى الله عليه وسلم على سبيل التعظيم والتبجيل لا يكفر به أصلا بل يكون عاصيا.

অর্থঃ তুমি কি দেখ না, সাহাবায়ে কেরাম রাছুল সঃ এঁর প্রতি অতিরিক্ত মহব্বতের কারণে বলেছিলেন, হে রাছুল, আমরা কি আপনার সিজদা করব না ? রাছুল সঃ বলেন, না। আল্লাহর রাছুল যদি অনুমতি দিতেন, তাহলে তারা সম্মান ও ভক্তির উদ্দেশ্যে সিজদা করতেন, ইবাদতের উদ্দেশ্যে নয়। যেমন হজরত ইউসুফ আঃ এঁর ভাইয়েরা তাকে সিজদা করেছিল। একই হুকুম হবে, কোন মুসলমান যদি  সম্মান ও ভক্তির উদ্দেশ্যে  রাছুল স এঁর কবরে সিজদা করে, তাহলে সে কাফের হবে না, কিন্তু গুনাহগার হবে।

মুজামুশ শুউখ  ১/৭৩।

 

৩। কাজি শাওকানি তার সাইলুল যারার কিতাবে লিখেছেন,

اعلم أن الحكم على الرجل المسلم بخروجه من دين الإسلام ودخوله في الكفر لا ينبغي لمسلم يؤمن بالله واليوم الآخر أن يقدم عليه إلا ببرهان أوضح من شمس النهار… وأما قوله : “ومنها السجود لغير الله” فلا بد من تقييده بأن يكون سجوده هذا قاصداً لربوبية من سجد له، فإنه بهذا السجود قد أشرك بالله عز وجل وأثبت معه إلهاً آخر، وأما إذا لم يقصد إلا مجرد التعظيم كما يقع كثيراً لمن دخل على ملوك الأعاجم أنه يقبل الأرض تعظيماً له، فليس هذا من الكفر في شيء، وقد علم كل من كان من الأعلام أن التكفير بالإلزام من أعظم مزالق الأقدام

অর্থঃ জেনে রেখ,  দ্বীনের আলোর চেয়ে পরিষ্কার প্রমাণ ছাড়া কোন মুসলমানের উপর  ইসলাম থেকে বের হয়ে কাফের হয়ে যাওয়ার হুকুম লাগানোর কারও অগ্রসর হওয়া উচিত নয়। আল্লাহ ও তার রাছুলের উপর ইমান রাখে এমন কেউ এধরণের কাজে অগ্রসর হতে পারে না… তিনি বলেছেন, ইমান ভঙ্গের একটি কারণ হল, আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সিজদা করা। তার এই বক্তব্যকে অবশ্যই শর্তযুক্ত করতে হবে। যার জন্য সিজদা করছে, তাকে রব মনে করে সিজদা করলেই কেবল শিরক হবে। কারণ, রব মনে করে সিজদা করলে সে আল্লাহর সাথে শরিক করল এবং অন্য একজন ইলাহকে বিশ্বাস করল। ওই ব্যক্তি যদি শুধু সম্মানের উদ্দেশ্যে সিজদা তাহলে এটি কখনও শিরক হবে না। যেমন অনেক অনারব রাজা বাদশার সামনে গেলে জমিনে চুমু দিয়ে থাকে। এটি কুফরি নয়। সমস্ত বিজ্ঞ আলেম এ বিষয়ে সচেতন যে, কাউকে অন্যায়ভাবে তাকফির করা অনেক বড় পদস্খলন।

সাইলুল যারার – 4/ 578

৪। আল্লামা ইবনে নুজাইম রহঃ বলেন,

وَالسُّجُودُ لِلْجَبَابِرَةِ : كُفْرٌ ، إنْ أَرَادَ بِهِ الْعِبَادَةَ ؛ لَا إِنْ أَرَادَ بِهِ التَّحِيَّةَ ، عَلَى قَوْلِ الْأَكْثَرِ

অর্থঃ ইবাদতের নিয়তে কেউ বাদশাকে সিজদা করলে কুফরি হবে। সম্মান বা অভিবাদনের উদ্দেশ্যে সিজদা করলে কুফরি হবে না।

আল-বাহরুর রায়েক (5/134)

মোট কথা, এ বিষয়ে যারা বাড়া-বাড়ি করেছেন, তাদের মত সঠিক নয়। যেমন সালাফি শাইখ ইবনে উছাইমিন রহঃ লিখেছেন,

ومن ذهب إلى قبر فسجد لصاحب القبر فهو مشرك سجد لغير الله ، والسجود لا يكون إلا لله عز وجل

অর্থঃ কেউ যদি কোন কবরের কাছে গিয়ে কবরে শায়িত ব্যক্তির জন্য সিজদা করে, তাহলে সে মুশরিক হয়ে যাবে। কারণ সে আল্লাহ ছাড়া  অন্যের জন্য সিজদা করেছে। আর সিজদা হবে শুধু আল্লাহর জন্য।

মাজমুঊ ফাতওয়া ও রাছাইল- 24/224

শরিয়তের দলিল ও  উছুলের আলোকে ইবনে  উছাইমিন রহঃ এঁর বক্তব্য স্পষ্ট ভুল ও বাড়াবাড়ি। কবরে শায়িত ব্যক্তির জন্য শুধু ইবাদতের নিয়তে সিজদা করলে শিরক হবে। ইবাদতের নিয়ত ছারা সিজদা করলে হারাম হবে। শাইখ সালহ আল-মুনাজ্জিদের ফাতওয়া থেকে উপরে আমরা দলিল আলোচনা করেছি।

আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে এসব বিষয়ে বাড়াবাড়ি ও ছাড়া-ছাড়ি থেকে হেফাজত করুন। আমীন।

 

Print Friendly