গত পর্বে সিজদার হুকুম ও এ বিষয়ে বাড়াবাড়ি নিয়ে আলোচনা করেছি।  আজ আমরা তাওয়াফ সম্পর্কে আলোচনা করব। কোন পীর, আলেম, পীরের কবর, পীরের বাড়িকে তাওয়াফ করার শরয়ী বিধান কী?

শরিয়তে তাওয়াফ শুধু কাবা ঘরের জন্য নির্দিষ্ট। কাবা ঘর ছাড়া অন্য কোন ব্যক্তি, ঘর বা কবরকে তাওয়াফ করার কোন অনুমতি শরিয়তে নেই। এরপরেও কেউ যদি অন্য কারও কবর, ঘর বা ব্যক্তিকে তাওয়াফ করে তাহলে তার হুকুম হল-

১। যাকে তাওয়াফ করছে তার মধ্যে যদি আল্লাহর কোন গুণ (খাসাইসুর রুবুবিইয়া) আছে বলে বিশ্বাস করে অথবা ওই ব্যক্তির ইবাদতের নিয়ত থাকে, তাহলে এটি স্পষ্ট শিরক হবে। সে ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে। যেমন যাকে তাওয়াফ করছে তার ব্যাপারে যদি বিশ্বাস থাকে, তিনি নিজের ইচ্ছা  ও ক্ষমতায় যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন, তার নিজের ক্ষমতায় তার যে কোন প্রয়োজন পূরণ করতে পারেন।

২।  উপরের বিশ্বাসগুলো ছাড়া শুধু সম্মানের জন্য যদি কোন পীর বা পীরের কবরকে তাওাফ করে তাহলে সেটি হারাম ও বড় গোনাহের কাজ। তবে এটি শিরক হবে না।

এটি চার মাজহাব ও আহলে সুন্নতের সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমের অভিমত। সালাফি শাইখ ইবন বাজ, ইবনে উছাইমিন, ফাতওয়া আল-লাজনা আদ-দাইমার মুফতিগ্ণ ও শাইখ সালেহ আল-মুনাজ্জিদ এমন মত দিয়েছেন।

১। মোল্লা আলি কারি রহঃ লিখেছেন,

“لا يطوف” أي لا يدور حول البقعة الشريفة , لأن الطواف من مختصات الكعبة المنيفة , فيحرم حول قبور الأنبياء والأولياء

অর্থঃ রাছুল  সঃ এর রউজাকে ঘিরে তাওয়াফ করবে না। কেননা তাওয়াফ শুধু কাবা ঘরের জন্য-ই নির্দিষ্ট, নবী ও অলিদের কবরে তাওয়াফ করা হারাম হবে।

শরহুল মানাসিক।

২। ইমাম নববি রহঃ বলেন,

ولا يجوز أن يطاف بقبره صلى الله عليه وسلم، ويكره إلصاق الظهر والبطن بجدار القبر. قاله أبو عبد الله الحليمي وغيره، قالوا: ويكره مسحه باليد وتقبيله، بل الأدب أن يبعد منه كما كان يبعد منه لو حضره في حياته، هذا هو الصواب الذي قاله العلماء واطبقوا عليه، ولا يغتر بكثرة مخالفة كثيرين من العوام وفعلهم ذلك، فإن الاقتداء والعمل إنما يكون بالأحاديث الصحيحة وأقوال العلماء، ولا يلتفت إلى محدثات العوام وغيرهم وجهالاتهم

অর্থঃ রাছুল সঃ এর কবরে তাওয়াফ করা জায়েজ নয়। কবরের দেওয়ালে পেট বা পিঠ লাগান মাকরুহ। আবু আব্দিল্লাহ আল-হুলাইমি ও অন্যরা এই মত দিয়েছেন। তারা বলেছেন,রাছুল সঃ এর কবরে  হাত দিয়ে কবর স্পর্শ করা, কিংবা কবরে চুমু দেওয়া মাকরুহ। বরং আদব হল, কবর থেকে একটু দূরে থাকবে। যেমন জীবিত অবস্থায় রাছুল সঃ কাছে গেলে একটু দূরে থাকত। এটাই সঠিক। উলামায়ে কেরাম এমনটি বলেছেন এবং এর উপর আমল করেছেন। অনেক সাধারণ মানুষের এর বিপরীত আমল দেখে ধোঁকা খাবে না। কেননা আমল ও অনুসরণ হবে সহিহ হাদিস ও আলেমদের বক্তব্যের উপর। সাধারণ মানুষের বিদআতী আমল ও অজ্ঞতার প্রতি কোন ভ্রুক্ষেপ করা হবে না।

আল-মাজমু-৮/২৫৮

৩। ইবনে হাজার হাইতামি রহঃ লিখেছেন,

الْكَبِيرَةُ الثَّالِثَةُ وَالرَّابِعَةُ وَالْخَامِسَةُ وَالسَّادِسَةُ وَالسَّابِعَةُ وَالثَّامِنَةُ وَالتِّسْعُونَ : اتِّخَاذُ الْقُبُورِ مَسَاجِدَ ، وَإِيقَادُ السُّرُجِ عَلَيْهَا ، وَاِتِّخَاذُهَا أَوْثَانًا ، وَالطَّوَافُ بِهَا ، وَاسْتِلَامُهَا ، وَالصَّلَاةُ إلَيْهَا

অর্থঃ ৯৩, ৯৪, ৯৫, ৯৬, ৯৭, ৯৮ নং কবিরা হল, যথাক্রমে কবরে সিজদা দেওয়া, কবরে বাতি জ্বালান, কবরকে পূজনীয় বানান, কবরে তাওয়াফ করা, কবরে চুমু দেওয়া, কবরের দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করা।

আজ-জাওয়াজির, ১/১২০।

৪। ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ুতি রহঃ বলেন,

ومن البدع أيضاً: أكل العوام التمر الصيحاني في الروضة الشريفة بين المنبر والقبر، وطوافهم بالقبر الشريف ، ولا يحل ذلك , وكذلك إلصاقهم بطونهم وظهورهم بجدار القبر، وتقبيلهم إياه بالصندوق الذي عند رأس النبي –صلى الله عليه وسلم- ومسحه باليد , وكل ذلك منهي عنه

অর্থঃ আরও কিছু বিদাত হল, রাছুল এর রওযায় কবর ও মেম্বারের মাঝখানে সাধারণ মানুষের সাইহানি খেজুর খাওয়ার যে রীতি আছে, এটি বিদ্আত। একইভাবে কবরে তাওয়াফ করা। এটি জায়েজ নয়। এছাড়া কবরের দেওয়ালে তাদের পীঠ ও পেট লাগান, রাছুল সঃ এর মাথার কাছে যে সিন্দুক রয়েছে, তাতে হাত দিয়ে চুমু দেওয়া। এসব কিছু নিষিদ্ধ।

আল-আমরু বিল ইত্তিবা, ওয়ান নাহঊ আনিল ইব্দিতা।

৫। ইমাম আবু শামা মাকদেসি লিখেছেন,

قال ابن الصلاح: ولا يجوز أن يطاف بالقبر، وحكى الإمام الحليمي عن بعض أهل العلم: أنه نهى عن إلصاق البطن والظهر بجدار القبر ومسحه باليد، وذكر أن ذلك من البدع

অর্থঃ ইমাম ইবনুস সালাহ বলেন, কবরে তাওয়াফ করা জায়েজ নয়। কিছু কিছু আলেম থেকে ইমাম হুলাইমি বর্ণনা করেছেন, কবরের দেওয়ালে পেট ও পীঠ লাগান এবং হাত দিয়ে স্পর্শ করতে নিষেধ করেছেন। তারা বলেছেন, এগুলো বিদআতের অন্তর্ভুক্ত।

আল-বাইস ফী ইঙ্কারিল বিদায়ী ওয়াল হাওয়াদিস – ২৮২-২৮৩।

মোট কথা, কবর তাওয়াফের ক্ষেত্রে ইবাদতের নিয়ত বা কবরে শায়িত ব্যক্তির মধ্যে রুবুবিয়াতের বিশ্বাস না থাকলে তাওয়াফ করা হারাম। এটা অধিকাংশ সালাফি আলেমেরও মত। সালাফি আলেমদের বক্তব্যগুলো নীচের লিঙ্ক এ পাবেন।

https://islamqa.info/ar/112867

আল্লাহ তায়ালা এসব বিষয়ে বাড়াবাড়ি করে অন্যায় তাকফির থেকে আমাদেরকে হেফাজত করুন। বাড়াবাড়ির নমুনা হিসেবে সালাফি শাইখ সালেহ আল-ফাওজানের বক্তব্য উল্লেখ করা যেতে পারে।  শাইখকে জিজ্ঞেস করা হয়,

السجود عند الصنم والقبر، والذبح عند الصنم والقبر كذلك، هل يكفر صاحبه أم لابد أن يُنظر هل هو ذبح للصنم وسجد للصنم أو ذبح لله وسجد لله عند ذلك؟

هذه سفسطة وحذلقة لا تجوز، من ذبح عند القبر فهو مشرك، ومن سجد عند القبر فهو مشرك، ولا علينا من هل نوى ما نوى ، كل هذه سفسطة

অর্থঃ মূর্তি ও কবরের সামনে সিজদা করা, মূর্তি ও কবরের  সামনে কোন কিছু জবাই করা, এসব ক্ষেত্রে কী ওই ব্যক্তিকে সরাসরি কাফের বলা হবে নাকি দেখা হবে যে, সে মূর্তির জন্য জবাই ও সিজদা করেছে, নাকি ওইখানে আল্লাহর জন্য জবাই করেছে?

উত্তরঃ এটা তো মূর্খতা ও প্রগলভতা । এটা ঠিক নয়। যে কবরের কাছে কোন প্রাণী জবাই করল সে মুশরিক। যে কবরের কাছে সিজদা করল, সে মুশরিক। সে কি নিয়তে করেছে এটা আমাদের দেখার দরকার নেই। এগুলো সব জাহালত।

শরহু কাইদাতিন জালিলা, দরস-১৪।

এটা হল, তাকফিরের ক্ষেত্রে শাইখ ফাওজানের মারাত্মক বাড়াবাড়ি। এটা অন্যায়। তাকফিরের ক্ষেত্রে আহলে সুন্নত সর্বদা খুবই সতর্ক ছিলেন। এভাবে তাকফিরি চিন্তা -চেতনা জমহুর আহলে সুন্নতের নীতি ও আদর্শের খেলাফ। কারও ব্যাপারে তাকফিরের আগে অবশ্য-ই তার নিয়ত ও বিশ্বাস জেনে নিশ্চিত হয়ে তাকফির করতে হবে। এভাবে নিয়ত ও অবস্থা যাচায় না করে কাউকে তাকফিরের অনুমতি শরিয়ত দেয় না।

আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে বাড়াবাড়ি ও ছাড়া-ছাড়ি থেকে হেফাজত করুন। আমিন।

Print Friendly