কিছু দিন আগে আমি শাইখ মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজদি সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত কিছু মতামত উল্লেখ করেছিলাম। অনেকে ভাই শাইখকে মহব্বত করেন। তাদের কাছে বিষয়টি একটু কষ্টের। অনেকের কষ্টের কারণ হলেও আমি দলিলের আলোকে বুঝে-শুনেই শাইখের বিষয়ে মত পরিবর্তন করেছি।

অনেক ভাই মনে করেছন, আমি শাইখের বিষয়ে দেওবন্দি আলেমদের বক্তব্য সম্পর্কে অবগত নই বা জানলেও তেমন গুরুত্ব দেইনি। বিষয়টা আসলে এমন নয়। শাইখ নজদি সম্পর্কে দেওবন্দি আলেমগনের অধিকাংশের বক্তব্য আল-হামদুলিল্লাহ আমার সামনে আছে। বহু আগে মাওলানা মনজুর নুমানি রহঃ এর কিতাবটিও পড়ার সুযোগ হয়।

মনজুর নুমানি রহঃ বিশাল ইলমি ব্যক্তিত্বের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বলছি, অনেক ইলমি দুর্বলতা আছে কিতাবটিতে। যার কারণে সেইভাবে গ্রহণ করতে পারিনি।

আমি এখানে কয়েকটি উদাহরণ উল্লেখ করছি। যারা কিতাবটি পরেছেন বা পড়বেন, তারা বিষয়টা বুঝতে পারবেন।

১। মনজুর নুমানি রহঃ এই কিতাবে হুসাইন আহমাদ মাদানি রহঃ সম্পর্কে লিখেছেন, তিনি শাইখ মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহাব নজদি সম্পর্কে তার মত থেকে ফিরে আসেন। এ বিষয়ে প্রমাণ হিশেবে ১৯২৫ সালের একটা চিঠির কথা বলেছেন। কিন্ত বিষয়টা এখানেই শেষ নয়। হুসাইন আহমাদ মাদানি রহঃ ১৯৫১-১৯৫২ সালের দিকে আরও স্পষ্ট বলেছেন, তিনি তার মত থেকে ফেরেননি। হুসাইন আহমাদ মাদানি রহ এঁর মাক্তুবাত (চিঠির সংকলন), ও নকশে হায়াত (তার নিজের জীবনী) এ বিষয়টি স্পষ্ট আছে। এখানে মনজুর নুমানি রহঃ এঁর কথাটা দুর্বল হয়ে যায়।

২। আনোয়ার শাহ কাশ্মীরি রহঃ শাইখ মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওহাব নজদির কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন,
أما محمد بن عبد الوهاب النجدي فإنه كان رجلا بليدا قليل العلم، فكان يتسارع إلى الحكم بالكفر
অর্থঃ মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওহাব নজদি একজন বালিদ(কম বুদ্ধির) ছিলেন। তার ইলম কম ছিল। কাউকে কাফের হুকুম দেয়ার ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া করতেন।

সমালোচনার শব্দগুলি বেশ শক্ত। মনজুর নুমানি রহঃ এর কয়েকটি জওয়াব দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। নুমানি রহঃ এর জওয়াবগুলো তাহকিকি বিবেচনায় বেশ দুর্বল। তিনি ধারণা করেছেন, এটি সম্ভবত আনোয়ার শাহ কাশ্মীরি রহঃ এর বক্তব্য নয়, বরং ফয়জুল বারির সংকলক বদর আলম মিরাঠী রহঃ এর। বদর আলম মিরাঠী রহঃ নিজে এটি বলেছেন। তবে নুমানি রহঃ তার এই ধারণার পক্ষে কোন প্রমাণ দেননি।

কিন্ত বাস্তবতা হল, নুমানি রহঃ এর ধারণাটি সঠিক নয়। বদর আলম মিরাঠী রহঃ ফয়জুল বারির ভূমিকায় এটি সংকলনে তার পন্থা ও সতর্কতার কথা বলেছেন। বদর আলম মিরাঠী রহঃ নিজের পক্ষ থেকে কোন কিছু উল্লেখ করলে সেখানে তিনি স্পষ্ট বলে দিয়েছেন, قلت ، يقول العبد الضعيف (আমি বলছি বা অধম বলছে)। শাইখ মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওহাব নজদির ওই বক্তব্যের আগে এ ধরণের কোন কথা বদর আলম মিরাঠী রহঃ লেখেননি। সুতরাং শুধু ধারণার উপর নির্ভর করে এ কথা বলার সুযোগ নেই যে, উক্ত সমালোচনা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরি রহঃ এর নয়।

তা ছাড়া মনজুর নুমানি রহঃ নিজেও কিছু বিষয় স্বীকার করেছেন যে, আনোয়ার শাহ কাশ্মীরি রহঃ শাইখকে তেমন বড় আলেম মনে করতেন না। আর এটি স্বয়ং নুমানি রহঃ এর সামনেই বলেছেন।
সুতরাং ইলমি দিক থেকে কোন দলিল না থাকায় একথা বলার উপায় নেই যে, উক্ত সমালোচনা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরি রহঃ এর নয়, বরং বদর আলম মিরাঠীর।

৩। মাওলানা খলিল আহমাদ সাহারানপুরি রহঃ আল-মুহান্নাদে শাইখ মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজদি সম্পর্কে বেশ শক্ত সমালোচনা করেছেন। তিনি শাইখ সম্পর্কে ফতওয়া-ই শামিতে উল্লেখিত ফতওয়া এর সাথে একমত পোষণ করেন। ফতওয়া-ই শামিতে শাইখ মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজদি ও তার অনুসারীদেরকে সেই সময়ের খারেজি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

আল-মুহান্নাদের উক্ত ফতওয়ার সাথে দেওবন্দি ঘরানার বড় বড় আলেম একমত পোষণ করে সাক্ষর করেছেন। যেমন, ১। শাইখুল হিনদ মাহমুদুল হাসান রহঃ ২। মুফতি আজিজুর রাহমান দেওবন্দি ৩। আশরাফ আলি থানবি রহ ৪। মির হাসান আম্রুহি ৫। মুফতি কেফায়াতুল্লাহ রহসহ আরও অনেকে।

মনজুর নুমানি রহঃ খলিল আহমাদ সাহারানপুরি রহঃ সম্পর্কে বলেছেন, তিনি তার অভিমত থেকে ফিরে আসেন। এর প্রমাণ হিশেবে দুটি চিঠির কথা উল্লেখ করেছেন। একটা চিঠি তিনি জমিন্দার পত্রিকার সম্পাদক জফর আলি খান এর কাছে এবং আরেকটি চিঠি তিনি ইয়াকুব গাঙ্গুহি রহঃ এর কাছে পাঠান।

ইয়াকুব গাঙ্গুহি রহঃ এর কাছে যে চিঠি পাঠিয়েছেন, তাতে সে সময়ের সৌদি বাদশা আব্দুল আজিজ বিন সউদ এর ভালো কিছু কাজ কর্ম ও তার দ্বীনদারি সম্পর্কে আলোচনা করেছনে। দ্বিতীয় চিঠিতে তিনি শাইখ আব্দুল্লাহ বিন বুলাইহিদ এর প্রসংশা ও সৌদির লোকদের তেলাওয়াত, নামাজের পাবন্দী এসব বিষয়ের প্রসংশা করেছেন।
কোন চিঠি শাইখ নজদির ব্যাপারে সাহারানপুরি রহঃ এর মত পরিবর্তনের দলিল হতে পারে না। মদিনার মানুষের আমল, বাদশার প্রসংশা এগুলো শাইখ নজদির ব্যাপারে মত পরিবতনের দূরবর্তী দলিল ধরাটাও কষ্টের। এ দিক থেকে মনজুর নুমানি রহঃ এর দলিলটি বেশ দুর্বল ও সম্ভাবনাময়। যা আল-মুহান্নাদের স্পষ্ট বক্তব্যের বিপরীতে দাড় করান কঠিন।

আল-মুহান্নাদে তিনি স্পষ্ট বলেছেন, আহমাদ রেজা ব্রেলভি উম্মতের আলেমদেরকে তাকফির করেছে, যেমন শাইখ মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজদির অনুশারি ওহাবীরা উম্মতের আলেমদেরকে তাকফির করেছে।

এধরণের স্পষ্ট বক্তব্যের বিপরিতে মাদিনার লোকদের জামাতের পাবন্দি ও আমলের কথা সাহারানপুরি রহঃ এর মত পরিবর্তনের দলিল হওয়াটা কঠিন।

মনজুর নুমানি রহঃ এর কিতাবের সব থেকে দুর্বল দিক হল, পুর কিতাবে তিনি শাইখ মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজদির কিছু চিঠির উপর নির্ভর করেছেন। তিনি শাইখের যে কথাগুলোর উপর ভিত্তি করে কিতাবটি লিখেছেন, শাইখ নজদির অন্য কিতাবে এর বিপরিত কথা রয়েছে। এক্ষেত্রে শাইখ নজদির আমলও তার ওই সব চিঠির বিপরিত ছিল। মোট কথা, শাইখ নজদির কিছু স্ববিরোধী বক্তব্য বলতে গেলে নুমানি রহঃ এর কিতাবর মূল। আর শাইখ নজদির স্ববিরোধী বক্তব্য ও আমলের উপর নির্ভর করে ফয়সালা দেয়াটা এই কিতাবের মৌলিক একটি দুর্বলতা।

এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত লেখার দাবি রাখে। ইনশা আল্লাহ পরে কখনও সময় হলে আরও বিস্তারিত আলোচনা করব।

Print Friendly