আগের দু’টি পর্বে আমরা সিজদা ও তাওয়াফ সম্পর্কে আলোচনা করেছি। আজকের পর্বে আমরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ  একটি বিষয়ে আলোচনা করব।

কাউকে ক্ষমা করা কিংবা জান্নাত দেয়ার মালিক একমাত্র আল্লাহ তায়ালা। কোন মানুষ কারও গোনাহ মাফ করতে পারবে না কিংবা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাতে পারবে না। তবে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা  কিছু মানুষকে শাফায়াত বা সুপারিশের অনুমতি দিবেন। তাদের সুপারিশ গ্রহণ করে আল্লাহ তায়ালা বহু লোককে মাফ করে তাদের জন্য জান্নাতের ফয়সালা করবেন।

সুপারিশের ক্ষেত্রে রাসুল সঃ হবেন সবার অগ্রগণ্য। তার একটি বিশেষ নামই হল, শাফিউল মুজনিবিন (পাপীদের সুপারিশকারী)। কিয়ামতের দিন অন্যান্য নবী-রাসুলদের কাছে আবেদন করে ব্যর্থ হয়ে সকলে রাসুল সঃ এর কাছে শাফায়াতের আবেদন নিয়ে হাজির হব। আল্লাহ তায়ালা রাসুল সঃ কে শাফায়াতের অনুমতি দিবেন।

রাসুল সঃ এর জীবদ্দশায় সাহাবায়ে কেরাম তার কাছে শাফায়াতের আবেদন করতেন। কেয়ামতের দিন তিনি যেন তাদের মুক্তি ও জান্নাতের জন্য আল্লাহর কাছে সুপারিশ করেন, এই আবেদন নিয়ে হাজির হতেন রাসুল সঃ এর দরবারে।

তিরমিজি শরিফে হজরত আনাস রাঃ থেকে স্পষ্ট হাদিস রয়েছে। হজরত আনাস রাঃ বলেন, আমি রাসুল সঃ এর কাছে আবেদন করলাম, তিনি যেন কিয়ামতের দিন আমার জন্য সুপারিশ করেন। রাসুল সঃ বলেন, আমি সুপারিশ করব।  তিরমিজি-২৩৭০, হাদিসটি সহিহ। আলবানি সাহেব সাহিহুত তারগিবে  এই হাদিসকে সহিহ বলেছেন। হাদিসের আরবি পাঠ:

سَأَلْتُ النَّبِيَّ -صلى الله عليه وسلم- أَنْ يَشْفَعَ لِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ ، فَقَالَ : أَنَا فَاعِلٌ

যারা কিয়ামতের দিন শাফায়াতের অনুমতি পাবেন, তাদের কাছে আপনি শাফায়াতের আবেদন রাখতে পারবেন। তাকে আপনি বলতে পারবেন, সে যেন আপনার জন্য আল্লাহর কাছে সুপারিশ করে। হজরত আনাস রাঃ রাসুল সঃ এর কাছে এই আবেদন করেছেন। আরও অনেক সাহাবি এই ধরণের আবেদন করেছেন রাসুল সঃ এর কাছে । সুতরাং হাদিস থেকে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয় যে, শাফায়াতের অনুমতিপ্রাপ্তদের কাছে শাফায়াতের আবেদন করা যাবে।

রাসুল সঃ এর জীবদ্দশায় সাহাবায়ে কেরাম রাঃ তাঁর কাছে শাফায়াতের আবেদন করেছেন, এখন প্রশ্ন হল, রাসুল সঃ এর এর ইন্তেকালের পরে কি তার কাছে শাফায়াতের আবেদন করা যাবে? একথা কি বলা যাবে যে, হে আল্লাহর রাসুল, আপনার কাছে শাফায়াতের আবেদন করছি। কাল কিয়ামতে কঠিন বিপদের মুহূর্তে আপনি আমার মুক্তির জন্য মহান আল্লাহর দরবারে সুপারিশ করবেন।

চার মাজহাবের সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমগণের ফাতওয়া হল, রাসুল সঃ এর ইন্তেকালের পরেও তার কাছে শাফায়াতের আবেদন করা যাবে। অনেকেই শাফায়াতের আবেদনকে রাসুল সঃ এর কবর জিয়ারতের আদবের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। অর্থাৎ রাসুল সঃ এর কবর জিয়ারতের অন্যতম একটি আদব হল, তার কাছে শাফায়াতের আবেদন করা।

আমরা এই পর্বে এ বিষয়ে চার মাজহাবের সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমগণের ফাতওয়া উল্লেখ করব। পরের পর্বে এ বিষয়ে সালাফিদের বাড়াবাড়ি সম্পর্কে আলোচনা করব ইনশা আল্লাহ।

হানাফি মাজহাবের ফাতওয়াঃ

১। হানাফি মাজহাবের বিখ্যাত আলেম ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনে মাহমুদ অাল-মোসেলি তার বিখ্যাত কিতাব ‘আল-মুখতার লিল ফাতাওয়া’ ও তার ব্যাখ্যা ‘আল-ইখতিয়ার লিতা’লিল মুখতার’ -এ রাসুল সঃ এর কবর জিয়ারতের বিভিন্ন আদব লিখেছেন। কীভাবে দাঁড়াবে, কীভাবে সালাম দিবে, এগুলো বিস্তারিত লিখেছেন। শাফায়াতের আবেদনের বিষয়ে তিনি লিখেছেন,

فيقول : يا رسول الله ، نحن وفدك و زُوّار قبرك، جئنا من بلاد شاسعة ونواحي بعيدة، قاصدين قضاء حقك ، والنظر إلى مآثرك و التيمّن بزيارتك ، و الاستشفاع بك إلى ربنا ، فإن الخطايا قد أثقلت ظهورنا ، وأنت الشافع المشفّع الموعود بالشفاعة والمقام المحمود ، وقد قال تعالى : { ولو أنهم إذ ظلموا أنفسهم جاؤوك… }الآية، وقد جئناك ظالمين لأنفسنا مستغفرين لذنوبنا ، فاشفعْ لنا عند ربنا ، واسْأله أن يميتنا على سُنّتك . الشفاعةَ يا رسول الله ، الشفاعةَ يا رسول الله ، الشفاعةَ يا رسول الله

অর্থ: এরপর বলবে, হে আল্লাহর রাসুল সঃ আমরা আপনার দরবারে এসেছি। আপনার কবর জিয়ারত করতে এসেছি। আমরা দূর-দুরান্ত থেকে আপনার হক আদায় করতে এসেছি। আপনার রেখে যাওয়া স্মৃতি চিহ্ন দেখতে এবং জিয়ারতের বরকত হাসিল করতে এসেছি। আপনার মাধ্যমে আল্লাহর দরবারে সুপারিশ করতে এসেছি। গোনাহের বোঝা আমাদের পিঠ বাঁকা করে দিয়েছে। আপনি সুপারিশকারি। আপনার সুপারিশ গৃহীত হবে। আপনাকে শাফায়াত ও মাকামে মাহমুদের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আর তারা যদি  নিজেদের উপর জুলুম করে আপনার কাছে আসে, এরপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায় এবং রাসুলও তাদের পক্ষে আল্লাহর কাছে ক্ষমার আবেদন করে, তাহলে আল্লাহ তাদের তওবা কবুল করবেন। তিনি অসীম দয়ালু” (সুরা নিসা-৬৪)। আমরা নিজেদের উপর অবিচার করে ইস্তিগফারের আবেদন নিয়ে আপনার দরবারে উপস্থিত হয়েছি। আমাদের রবের কাছে আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। আল্লাহর কাছে আমাদের জন্য আবেদন করুন, তিনি যেন আমাদেরকে আপনার আদর্শের উপর মৃত্যু দান করেন। হে আল্লাহর রাসুল, আপনার কাছে শাফায়াতের আবেদন করছি। হে আল্লাহর রাসুল, আপনার কাছে শাফায়াতের আবেদন করছি।  হে আল্লাহর রাসুল, আপনার কাছে শাফায়াতের আবেদন করছি…

-আল-ইখতিয়ার লিতা’লিল মুখতার, ২২৭-২২৮ পৃ:

২। হানাফি মাজহাবের বিখ্যাত আলেম শাইখ জাদাহ রহঃ তার বিখ্যাত কিতাব ‘মাজমাউল আনহুর’-এ রাসুল সঃ এর কবর জিয়ারতের আদব লিখেছেন। কীভাবে দাঁড়াবে, কী কী বলবে তিনি বিস্তারিত লিখেছেন। আমরা শাফায়াতের বিষয়টি এখানে উল্লেখ করছি।

..وَيَقِفُ كَمَا يَقِفُ فِي الصَّلَاةِ وَيَقُولُ: السَّلَامُ عَلَيْكَ أَيُّهَا النَّبِيُّ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ
ثُمَّ يَسْأَلُ اللَّهَ تَعَالَى حَاجَتَهُ ، وَأَعْظَمُ الْحَاجَاتِ: سُؤَالُ حُسْنِ الْخَاتِمَةِ وَطَلَبُ الْمَغْفِرَةِ؛ وَيَقُولُ:
السَّلَامُ عَلَيْكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ , أَسْأَلُكَ الشَّفَاعَةَ الْكُبْرَى وَأَتَوَسَّلُ بِكَ إلَى اللَّهِ تَعَالَى فِي أَنْ أَمُوتَ مُسْلِمًا عَلَى مِلَّتِكَ وَسُنَّتِكَ وَأَنْ أُحْشَرَ فِي زُمْرَةِ عِبَادِ اللَّهِ الصَّالِحِينَ

অর্থ: নামাজে যেভাবে দাঁড়ায় ঐভাবে আদবের সাথে দাঁড়াবে এবং বলবে, السَّلَامُ عَلَيْكَ أَيُّهَا النَّبِيُّ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ …। এরপর আল্লাহর কাছে নিজেদের প্রয়োজনের কথা বলবে। মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হল, ইমানের সাথে মৃত্যু হওয়া এবং তার মাগফিরাতের ব্যবস্থা হওয়া। সে বলবে, হে আল্লাহর রাসুল, আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক। আপনার কাছে শাফায়াতে কুবরার (কিয়ামতের  দিন আল্লাহর রাসুল  উম্মতী উম্মতী বলে তার উম্মতের জন্য ব্যাপকভাবে সুপারিশ করবেন) আবেদন করছি। আপনার ওসিলায় আল্লাহর কাছে আবেদন করছি, আমি যেন আপনার মিল্লাত ও আদর্শের উপর থেকে একজন মুসলিম হিসেবে ইন্তেকাল করতে পারি এবং আল্লাহর নেক বান্দাদের দলের সাথে যেন আমার হাশর হয়। – মাজমাউল আনহুর ফি শরহি মুলতাকাল আবহুর

http://shamela.ws/browse.php/book-21644/page-312

৩। আল্লামা ইবনে আবেদিন রহঃ ‘ফাতওয়া-ই শামি’-তে রাসুল সঃ এর কবর জিয়ারতের নিয়ম-কানুন ও আদব দেখার জন্য আল্লামা ইবনুল হুমামের ‘ফাতহুল কাদির’ দেখতে বলেছেন। আল্লামা ইবনুল হুমাম রহঃ এ বিষয়ে বিস্তারিত লিখেছেন। ‘ফাতহুল কাদির’ থেকে আমরা শাফায়াতের বিষয়ে ইবনুল হুমাম রহঃ এর বক্তব্য উল্লেখ করছি। ইবনুল হুমাম রহঃ লিখেছেন,

ثُمَّ يَسْأَلُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الشَّفَاعَةَ فَيَقُولُ : يَا رَسُولَ اللَّهِ أَسْأَلُك الشَّفَاعَةَ ، يَا رَسُولَ اللَّهِ أَسْأَلُك الشَّفَاعَةَ وَأَتَوَسَّلُ بِك إلَى اللَّهِ فِي أَنْ أَمُوتَ مُسْلِمًا عَلَى مِلَّتِك وَسُنَّتِك

অর্থ: …অতঃপর রাসুল সঃ এর কাছে শাফায়াতের আবেদন করবে। সে বলবে, হে আল্লাহর রাসুল, কাল কিয়ামতে আপনার সুপারিশের আবেদন করছি। হে আল্লাহর রাসুল, আপনার শাফায়াত কামনা করছি। আপনার ওসিলায় আল্লাহর কাছে আবেদন করছি, আমি যেন আপনার মিল্লাত ও আদর্শের উপর থেকে একজন মুসলিম হিসেবে ইন্তেকাল করতে পারি।

ফাতহুল কাদির – https://goo.gl/wD8BUO

এছাড়া

৪ । মোল্লা আলী কারি রহ: তার ‘জিয়ারতুন নাবী’ কিতাব শাফায়াতের আবেদনের কথা লিখেছেন।

৫।  ইমাম ত্বরাবুলুসি তার ‘মানাসিকে’ শাফায়াতের কথা লিখেছেন।

৬। আল্লামা হাসান শুরুম্বুলালি রহঃ তার বিখ্যাত কিতাব  ইমদাদুল ফাত্তাহ(নুরুল ইজাহ এর ব্যাখ্যাগ্রন্থ) শাফায়াতের আবেদনের কথা লিখেছেন।  নুরুল ইজাহ এর ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘মারাকিল ফালাহ’-তে শাফায়াতের  বিষয়টি বিস্তারিত রয়েছে।

৭। ‘ফতোয়া-ই আলমগিরি’-তেও শাফায়াতের আবেদনের কথা রয়েছে।

মালেকি মাজহাবের ফাতওয়াঃ

১। আল্লামা ইবনু জুযাই কালবি আল-মালেকি রহঃ তাঁর বিখ্যাত কিতাব ‘আল-কাওয়ানিনুল ফিকহিয়্যা’-তে লিখেছেন,

ينبغي لمن حج أن يقصد المدينة فيدخل مسجد النبي – صلى الله عليه وسلم – فيصلي فيه ويسلم على النبي  صلى الله عليه وسلم – وعلى ضجيعيه أبي بكر وعمر رضي الله عنهما ويتشفع به إلى الله ويصلي بين القبر والمنبر ويودع النبي – صلى الله عليه وسلم – إذا خرج من المدينة .

অর্থ: হাজীদের মদিনায় যাওয়া উচিৎ। মদিনায়  মসজিদে নববিতে গিয়ে নামাজ আদায় করবে। রাসুল সঃ ও তার দু’পাশে শায়িত আবু বকর ও উমর রাঃ কে সালাম দিবে। রাসুল সঃ কে মাধ্যম বানিয়ে আল্লাহর কাছে দুয়া করবে। রাসুল সঃ এর কবর ও মেম্বারের মাঝে নামাজ আদায় করবে। মদিনা থেকে বের হওয়ার সময় রাসুল সঃকে বিদায় জানিয়ে আসবে।

আল-কাওয়ানিনুল ফিকহিয়্যা-  http://islamport.com/w/usl/Web/856/153.htm

২। কাজি ইয়াজ রহঃ তার বিখ্যাত কিতাব ‘আশ-শিফা’-তে শাফায়াতের কথা লিখেছেন।

৩। মালেকি মাজহাবের বিখ্যাত আলেম আব্দুল্লাহ ইবনুন নু’মান তার ‘মিসবাহুজ জলাম’-এ শাফায়াতের আবেদনের কথা লিখেছেন।

শাফেয়ি মাজহাবের ফাতওয়াঃ

১। ইমাম নববী রহঃ তার বিখ্যাত কিতাব ‘আল-আজকার’,  ‘আল-মানাসিক’ ও ‘আল-মাজমু’-তে রাসুল এর কাছে শাফায়াতের আবেদনের কথা লিখেছেন। ইমাম নববী রহঃ লিখেছেন,

فإذا صلى تحية المسجد أتى القبر الكريم فاستقبله واستدبر القبلة على نحو أربع أذرع من جدار القبر ، وسلم مقتصدا لا يرفع صوته ، فيقول – السلام عليك يا رسول الله ، السلام عليك يا خيرة الله من خلقه ، السلام
عليك يا حبيب الله ، السلام عليك يا سيد المرسلين وخاتم النبيين ، السلام عليك وعلى آلك وأصحابك وأهل بيتك وعلى النبيين وسائر الصالحين ; أشهد أنك بلغت الرسالة ، وأديت الأمانة ، ونصحت الأمة ، فجزاك الله عنا أفضل ما جزى رسولا عن أمته

وإن كان قد أوصاه أحد بالسلام على رسول الله صلى الله عليه وسلم قال : السلام عليك يا رسول الله من فلان بن فلان ، ثم يتأخر قدر ذراع إلى جهة يمينه فيسلم على أبي بكر ، ثم يتأخر ذراعا آخر فسلام على عمر رضي الله عنهما ، ثم يرجع إلى موقفه الأول قبالة وجه رسول الله صلى الله عليه وسلم فيتوسل به في حق نفسه ، ويتشفع به إلى ربه سبحانه وتعالى ، ويدعو لنفسه ولوالديه وأصحابه وأحبابه ومن أحسن إليه وسائر المسلمين ، وأن يجتهد في إكثار
الدعاء ، ويغتنم هذا الموقف الشريف ويحمد الله تعالى ويسبحه ويكبره ويهلله ، ويصلي على رسول الله صلى الله عليه وسلم ويكثر من كل ذلك

অর্থ: মসজিদে নববিতে তাহিয়্যাতুল মসজিদ আদায় করে রাসুল সঃ এর কবরের কাছে আসবে। কেবলার দিকে পীঠ রেখে কবরের দিকে মুখ করে কবরের দেয়াল থেকে প্রায় চার গজ দূরে দাঁড়াবে। মধ্যম আওয়াজে সালাম দিবে। স্বর বেশি উঁচু করবে না। সে বলবে, হে আল্লাহর রাসুল, আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক,  হে আল্লাহর সর্বোত্তম সৃষ্টি, আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক। আপনার উপর, আপনার পরিবার, সাহাবায়ে কেরাম, আহলে বাইত, সমস্ত নবি-রাসুল ও নেককারদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক। আমি সাক্ষ দিচ্ছি যে আপনি রিসালাতের দায়িত্ব পরিপূর্ণভাবে পালন করেছেন। আল্লাহর পক্ষ থেকে দ্বীনের যে আমানত আপনাকে দেয়া হয়েছিল, আপনি তা সঠিকভাবে আদায় করেছেন। উম্মতকে সঠিক দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন। নবী হিসেবে আপনি উম্মতকে যা দিয়েছেন আল্লাহ তায়ালা আমাদের পক্ষ থেকে আপনাকে এর চেয়ে উত্তম প্রতিদান দান করুন।

কেউ যদি তাকে রাসুল সঃ এর কাছে সালাম পৌছানোর দায়িত্ব দিয়ে থাকে তাহলে বলবে, হে আল্লাহর রাসুল, অমুকের ছেলে অমুকের পক্ষ থেকে অাপনার জন্য সালাম । এক গজ মত ডান দিকে পিছিয়ে হজরত আবু বকর রাঃ এর কে সালাম দিবে। এরপর আরেক গজ পিছিয়ে হজরত উমর রাঃ কে সালাম দিবে।

এর সে রাসুল সঃ এর চেহারার কাছে   পূর্বের জায়গায় ফিরে আসবে  এবং রাসুল সঃ এর ওসিলা দিয়ে দুয়া করবে। রাসুল সঃ এর কাছে আল্লাহর দরবারে তার জন্য সুপারিশকারী হওয়ার আবেদন করবে। এরপর নিজের জন্য, নিজের পিতা-মাতা, বন্ধু-বান্ধব, তার প্রতি ইহসানকারী এবং সমস্ত মুসলমানের জন্য দুয়া করবে। কায়মনোবাক্যে খুব বেশি দুয়া করবে। এই মহান জায়গায় তার এই দুয়ার সুযোগকে গণীমত (মহামূল্যবান) মনে করবে। আল্লাহর খুব প্রশংসা করবে। তাসবিহ(সুবহানাল্লাহ বলা), তাকবির(আল্লাহু আকবার)  ও তাহলিল (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ) পড়তে থাকবে। রাসুল স: এর জন্য দুরুদ ও সালামের হাদিয়া পাঠাবে। এসব কিছু বেশি বেশি করবে।

– আল-আজকার (http://www.islamport.com/w/akh/Web/1243/206.htm)

২।  ইমাম মাওয়ারদি রহঃ তার ‘আল-হাওয়ীল কাবির (খ:৪, পৃ:৫৪৪) ‘-এ রাসুল সঃ এর কাছে শাফায়াতের আবেদন করার কথা লিখেছেন।

৩। শাইখুল ইসলাম যাকারিয়া আল-আনসারি রহ: তার ‘ফাতহুল ওয়াহহাব শরহু মানহাজিত তুল্লাব’-এ ইমাম নববী এর বক্তব্যের অনুরূপ আদব লিখেছেন এবং রাসুল স: এর কাছে শাফায়াতের আবেদনের কথা বলেছেন। তার বক্তব্যের আরবী পাঠ –

وصلى تحية المسجد بجانب المنبر وشكر الله تعالى بعد فراغها على هذه النعمة، ثم وقف مستدبر القبلة مستقبل رأس القبر الشريف ويبعد منه نحو أربعة أذرع ناظرا لاسفل ما يستقبله فارغ القلب من علق الدنيا، ويسلم بلا رفع صوت
وأقله السلام عليك يا رسول الله (صلى الله عليه وسلم) ثم يتأخر صوب يمينه قدر ذراع فيسلم على أبي بكر ثم يتأخر قدر ذراع فيسلم على عمر رضي الله عنهما، ثم يرجع إلى موقفه الاول قبالة وجه النبي (صلى الله عليه وسلم) ويتوسل به في حق نفسه ويستشفع به إلى ربه ثم يستقبل القبلة ويدعو بما شاء لنفسه وللمسلمين.

অর্থ: রাসুল সঃ এর মেম্বারের পাশে তাহিয়্যাতুল মসজিদ আদায় করবে। নামাজ শেষে রাসুল সঃ এর জিয়ারতের সৌভাগ্যের জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করবে। এরপর কেবলার দিকে পীঠ করে রাসুল এর মাথার দিকে মুখ করে দাঁড়াবে। রাসুল সঃ এর কবর থেকে চার গজ পরিমাণ দূরত্ব বজায় রাখবে। দৃ্ষ্টি অবনত রাখবে। দুনিয়ার সমস্ত বন্ধন থেকে অন্তরকে মুক্ত রাখবে। মধ্যম স্বরে সালাম দিবে। সর্বনিম্ন সালাম হল, আস-সালামু আলাইকা ইয়া রাসুলাল্লাহ। এরপর এক গজ পরিমাণ ডান দিকে সরে হজরত আবু বকর রা:কে সালাম। আরেক গজ সরে হজর উমর রাঃ কে সালাম দিবে। এরপর পূর্বের জায়গায় রাসুল সঃ এর চেহারার কাছে ফিরে আসবে। রাসুল সঃ এর ওসিলায় নিজের জন্য দুূয়া করবে। রাসুল সঃ এর কাছে আল্লাহর দরবারে তার জন্য সুপারিশকারী হওয়ার আবেদন করবে। এরপর কেবলার  দিকে ফিরে নিজের জন্য এবং সমস্ত মুসলমানের জন্য দুয়া করবে।

-ফাতহুল ওয়াহহাব শরহু মানহাজিত তুল্লাব (http://islamport.com/w/shf/Web/1084/258.htm)

৪। ইবনে হাজার হাইতামি রহঃ এর ‘তুহফাতুল মিনহাজ’ এর হাশিয়া লিখেছেন ইমাম ত্বাবলাওয়ী রহঃ। তিনিও রাসুল এর কাছে শাফায়াতের আবেদনের কথা লিখেছেন।

৫।  ইমাম শুরবিনি রহঃ ‘মুগনিল মুহতাজ’-এ শাফায়াতের আবেদনের কথা লিখেছেন।

৬। ইবনে হাজার আসকালানি রহ: তার ‘দিওয়ান’-এ রাসুল সঃ এর শানে অনেক কবিতা লিখেছেন। তিনি লিখেছেন,

فاشفعْ لمادحك الذي بك يتّقي = أهوالَ يوم الدين و التعذيبِ
قد صحّ أنّ ضناه زادَ و ذنبَه = أصلُ السّقام و أنت خير طبيبِ

অর্থঃ হে আল্লাহর রাসুল, আপনার প্রশংসাকারীর জন্য আপনি সুপারিশ করুন। বিচার ও শাস্তির দিবসের ভয়াবহতা থেকে সে আপনার মাধ্যমে বাঁচতে চায়।

একথা সত্য যে, তার অসুস্থতা আরও বেড়ে গিয়েছে। তার মূল রোগ হল পাপাচার। আপনি হলেন সর্বোত্তম ডাক্তার।

-দিওয়ানে ইবনে হাজার, পৃ:১০। মূল কিতাবের লিংক: http://waqfeya.net/book.php?bid=3069

৭। ইমাম বাকারি রহ: তার ইয়ানাতুত ত্বালিবিনে ( খ:২, পৃ:৩৫৬) শাফায়াতের আবেদনের কথা লিখেছেন।

৮। ইমাম রমালি আস-সগির তার মানাসিকে রাসুল সঃ এর কবর জিয়ারতের বিষয়ে ইমাম নববি রহ: এর উপরের বক্তব্যটি উল্লেখ করেছেন ।

হাম্বলী মাজহাবের ফাতওয়াঃ

 

১। ইমাম ইবনে কুদামা রহঃ তার বিখ্যাত কিতাব ‘আল-মুগনি’-তে রাসুল সঃ এর কবর জিয়ারতের বিস্তারিত আদব লিখেছেন। এখানে তিনি শাফায়াতের বিষয়টিও উল্লেখ করেছেন। তার বক্তব্যের আরবি পাঠ নিম্নরূপ:

إذا دخلت المسجد . ثم تأتي القبر فتولي ظهرك القبلة ، وتستقبل وسطه ، وتقول : السلام عليك أيها النبي ورحمة الله وبركاته ، السلام عليك يا نبي الله ، وخيرته من خلقه وعباده ، أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك له ، وأشهد أن محمدا عبده ورسوله ، أشهد أنك قد بلغت رسالات ربك ، ونصحت لأمتك ، ودعوت إلى سبيل ربك بالحكمة والموعظة الحسنة ، وعبدت الله حتى أتاك اليقين ، فصلى الله عليك كثيرا ، كما يحب ربنا ويرضى ، اللهم اجز عنا نبينا أفضل ما جزيت أحدا من النبيين والمرسلين ، وابعثه المقام المحمود الذي وعدته ، يغبطه به الأولون والآخرون ، اللهم صل على محمد وعلى آل محمد ، كما صليت على إبراهيم وآل إبراهيم ، إنك حميد مجيد ، وبارك على محمد وعلى آل محمد ، كما باركت على إبراهيم وآل إبراهيم، إنك حميد مجيد ، اللهم إنك قلت وقولك الحق : { ولو أنهم إذ ظلموا أنفسهم جاءوك فاستغفروا الله واستغفر لهم الرسول لوجدوا الله توابا رحيما } . وقد أتيتك مستغفرا من ذنوبي ، مستشفعا بك إلى ربي ، فأسألك يا رب أن توجب لي المغفرة ، كما أوجبتها لمن أتاه في حياته ، اللهم اجعله أول الشافعين ، وأنجح السائلين ، وأكرم الآخرين والأولين ، برحمتك يا أرحم الراحمين . ثم يدعو لوالديه ولإخوانه وللمسلمين أجمعين ، ثم يتقدم قليلا ، ويقول : السلام عليك يا أبا بكر الصديق ، السلام عليك يا عمر الفاروق ، السلام عليكما يا صاحبي رسول الله صلى الله عليه وسلم وضجيعيه ووزيريه ورحمة الله وبركاته ، اللهم اجزهما عن نبيهما وعن الإسلام خيرا : ( سلام عليكم بما صبرتم ، فنعم عقبى الدار ) . اللهم لا ص: 299 ]تجعله آخر العهد من قبر نبيك صلى الله عليه وسلم ومن حرم مسجدك يا أرحم الراحمين .
  কিতাবের লিংক: http://library.islamweb.net/newlibrary/display_book.php?flag=1&bk_no=15&ID=2224

২। হাম্বলি মাজহাবের বিখ্যাত কিতাব ‘মাতালিবু উলিন নুহা’-তেও রাসুল স: এর কবর জিয়ারতের আদব ও শাফায়াতের কথা  রয়েছে। বক্তব্যগুলো মোটামুটি একই রকম। শুধু রেফারেন্স এর জন্য এখানে আরবি উল্লেখ করছি।

وَيَقُولُ: السَّلَامُ عَلَيْك أَيُّهَا النَّبِيُّ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ السَّلَامُ عَلَيْك يَا نَبِيَّ اللَّهِ، وَخِيرَتَهُ مِنْ خَلْقِهِ وَعِبَادِهِ، أَشْهَدُ أَنْ لَا إلَهَ إلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ (وَأَشْهَدُ أَنَّك قَدْ بَلَّغْت رِسَالَاتِ رَبِّك، وَنَصَحْت لِأُمَّتِك، وَدَعَوْت إلَى سَبِيلِ رَبِّك بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ، وَعَبَدْت اللَّهَ حَتَّى أَتَاك الْيَقِينُ، فَصَلَّى اللَّهُ عَلَيْك كَثِيرًا كَمَا يُحِبُّ رَبُّنَا وَيَرْضَى) اللَّهُمَّ اجْزِ عَنَّا نَبِيَّنَا أَفْضَلَ مَا جَزَيْت أَحَدًا مِنْ النَّبِيِّينَ وَالْمُرْسَلِينَ، وَابْعَثْهُ مَقَامًا مَحْمُودًا الَّذِي وَعَدْتَهُ يَغْبِطُهُ بِهِ الْأَوَّلُونَ وَالْآخِرُونَ، اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا صَلَّيْت عَلَى إبْرَاهِيمَ وَآلِ إبْرَاهِيمَ إنَّك حَمِيدٌ مَجِيدٌ، وَبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا بَارَكْت عَلَى إبْرَاهِيمَ وَآلِ إبْرَاهِيمَ إنَّك حَمِيدٌ مَجِيدٌ، اللَّهُمَّ إنَّك قُلْت وَقَوْلُك الْحَقُّ: {وَلَوْ أَنَّهُمْ إِذْ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ جَاءُوكَ فَاسْتَغْفَرُوا اللَّهَ وَاسْتَغْفَرَ لَهُمُ الرَّسُولُ لَوَجَدُوا اللَّهَ تَوَّابًا رَحِيمًا} [النساء: 64] وَقَدْ أَتَيْتُك مُسْتَغْفِرًا مِنْ ذُنُوبِي مُسْتَشْفِعًا بِك إلَى رَبِّي فَأَسْأَلُك يَا رَبِّ أَنْ تُوجِبَ لِي الْمَغْفِرَةَ كَمَا أَوْجَبْتهَا لِمَنْ أَتَاهُ فِي حَيَاتِهِ، اللَّهُمَّ اجْعَلْهُ أَوَّلَ الشَّافِعِينَ، وَأَنْجَحَ السَّائِلِينَ، وَأَكْرَمَ الْأَوَّلِينَ وَالْآخِرِينَ بِرَحْمَتِك يَا أَرْحَمَ الرَّاحِمِينَ. ثُمَّ يَدْعُو لِوَالِدَيْهِ وَإِخْوَانِهِ وَلِلْمُسْلِمِينَ أَجْمَعِي

http://shamela.ws/browse.php/book-21677/page-1383
মোট কথা চার মাজহাবের বিখ্যাত অধিকাংশ আলেমের নিকট রাসুল সঃ এর কাছে সুপারিশ
শাফায়াতের আবেদন করা বৈধ। অধিকাংশ আলেমশাফায়াতের আবেদনকে রাসুল স: এর কবর
জিয়ারতের আদব হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

দেওবন্দি আলেমদের মধ্যে এ বিষয়ে বিস্তারিত লিখেছেন আল্লামা সরফরাজ খান সফদর রহঃ । তিনি তার ‘তাসকিনুন সুদুর’, ‘আল-মাসলাকুল মানসুর’ ও ‘সিমা-এ মাউতা’ এই তিনটি কিতাবে শাফায়াতের কথাও উল্লখ করেছেন। আগ্রহী পাঠক কিতাব তিনটি অধ্যয়ন করতে পারেন।

পরবর্তী পর্বে আমরা শাফায়াতের বিষয়ে সালাফিদের বাড়াবাড়ি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব ইনশা আল্লাহ।

Print Friendly