ফাজাইলে জিহাদের পাশাপাশি আমাদের মাঝে আাদাবুল জিহাদের প্রয়োজনীয়তাকে সামনে রেখে শিরোনাম নির্বাচন করা হয়েছে। একটা ঘটনা দিয়ে শুরু করি। আমি তখন কাফিয়া জামাতে পড়ি। জযবাতি কথা তখন খুব আগ্রহ ভরে শুনতাম। সেসম সব দিকে জসিমুদ্দীন রহমানী সাহেবের আলোচনাগুলো বেশ জনপ্রিয়। এগুলো নিয়ে বিভিন্ন সময় আলোচনা হতো। সহপাঠীদের কয়েকজন তার ভক্তও ছিল। তাদের একজনের সাথে মাঝেই মাঝেই বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ হতো। গুরুত্বের সাথে তাদের কথা শুনতাম।

একদিন তাকে বললাম, আগামী শুক্রবার রহমানী সাহেবের ওখানে জুমআ পড়ব। আমি তখন সবেমাত্র ঢাকায় এসেছি। একেবারেই ইয়াং। জুমআর দিন আগে আগে হাতেমবাগ মসজিদে গেলাম। মেম্বারের কাছাকাছি বসার চেষ্টা করলাম।

রহমানী সাহেব বয়ান শুরু করলেন। জ্বালাময়ী বয়ান। আলোচনার এক পর্যায়ে গিয়ে বললেন, 
من قال لا اله فقد كفر ومن قال الاالله فقد كفر

অর্থ হল, যে শুধু ‘লা ইলাহা’ বলল, সে কুফুরী করল আবার যে শুধু ইল্লাল্লাহ বলল, সেও কুফুরী করল।

এই কথা শুনে আমার সীমাহীন খটকা লাগল। ছোট থেকে তাসাউফের সাথে পরিচয় থাকায় বার তসবীহের জিকির সম্পর্কে জানা ছিল। উপহাদেশের বিখ্যাত বুজুর্গ প্রায় সকল আলিমই বার তসবীহের জিকির করেছেন। বার তসবীহের মধ্যে ইল্লাল্লাহ এর জিকিরও আছে। চরমোনাইও এটি করা হয়।

আমি অবাক হলাম। তিনি মুহূর্তে সবাইকে কাফির বানিয়ে দিলেন। যেখানে কাফির বানিয়ে দেয়া এতো সোজা, সেই জযবার ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি শংকিত ছিলাম। এরপর আর কোন দিন উনার কোন বয়ানে যাওয়া হয়নি।

ঘটনাটি বলার উদ্দেশ্য হল, জিহাদের দাওয়াতের জন্য কি ইল্লাল্লাহর জিকির যারা করে তাদেরকে কাফের বলা খুব জরুরি? এর সাথে জিহাদ ওতোপ্রোতভাবে জড়িত?

সম্ভবত: রহমানি সাহেবের পর থেকে আলিমদের সাথে জযবাতিদের সরাসরি ক্লাশ শুরু হয়। এখন যারা গ্লোবাল মানহাজ, মিল্লাতে ইবরাহীমের আওয়াজ তুলছে, এদের আগে একটি জামাত ছিল। এদের সাথে আলিমদের এধরণের সরাসরি ক্লাশ চোখে পড়েনি। কেউ কেউ হয়ত অভিযোগ করেছেন, হরকতের পোলাপান বেয়াদব। অথবা আমার জানা-শোনারও কমতি থাকতে পারে।

আলিমদের সাথে জযবাতিদের এই ক্লাশের গোড়া কোথায়? মূল সমস্যা কোথায়?

এটা বোঝার জন্য আরেকটু গোড়ার দিকে যেতে হবে। ইতিহাসে জিহাদ ছিল মৌলিকভাবে একটি আমল। অকাট্য ইরতিদাদ, কুফুর ও শিরকের বিরুদ্ধে। এর সাথে আকিদার সম্পর্ক ছিল খুব সামান্য। এজন্য ফিকহের কিতাবে জিহাদের সাথে তেমন কোন আকিদার আলোচনা পাওয়া যায় না। মোটা দাগের কিছু আকিদা ছাড়া জিহাদের মৌলিক সম্পর্ক ময়দান ও আমলের সাথে।

একটা সময়ে উপমহাদেশে জযবাতিরা এটাই লালন করতেন। পরবর্তীতে তাদের সাথে সালাফী চিন্তা-ধারার জযবাতিরা যুক্ত হোন। আর সালাফিয়াতের শুরুই হয় আকিদার আলোচনা দিয়ে। তারা আস্তে আস্তে করে জিহাদের সাথে আকিদাকে যোগ করতে থাকেন। এখান থেকেই সমস্যার শুরু।

জিহাদের বহু বিষয় আছে ইজতিহাদী (গবেষণা নির্ভব)। এসব বিষয়ে যেমন ইজতেহাদের সুযোগ আছে, সেই ইজতিহাদগুলোতে মতের ভিন্নতা থাকারও সুযোগ আছে।অনেক্ষেত্রে ইজতিহাদী বিষয়কে অকাট্য মনে করা অথবা অন্যদের ইজতিহাদকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করার প্রবণতা দেখা যায়। এটাও জযবাতিদের সাথে আলিমদের বিরোধের একটা বড় কারণ।

নীচে কিছু উদাহরণ উল্লেখ করছি। 
১। ফিদায়ী হামলা জায়েজ নাকি নাজায়েজ।
২। বর্তমানে সবার উপর জিহাদ ফরজে আইন নাকি কিফায়া।
৩। আমাদের দেশ বা আশে-পাশের দেশ দারুল হারব, দারুল আমান নাকি দারুল মু’য়াহাদা।
৪। জিহাদের জন্য আমীর বা খলীফা শর্ত কি না।
৫। কেউ জিহাদের আমীর বা খলীফা দাবী করলে তাকে বাইয়াত দেয়ার হুকুম কী?
৬। একই সময়ে বিভিন্ন জিহাদী দল থাকলে কাকে বাইয়াত দিতে হবে?

৭। জিহাদ বা খিলাফতের জন্য হিজরতের হুকুম কী?

৮। শরয়ী আইন ছাড়া পরিচালিত মুসলিম দেশসমূহের হুকুম কী? বা তারা মুজাহিদদের কাজে বাধা দিলে তার হুকুম কী?
৯। মুসলমানদের সাথে যুদ্ধরত দেশসমূহের সাথে লেনদেন, চুক্তি বা তাদের পণ্য ব্যবহারের হুকুম কী?
১০। জিহাদের জন্য আন্তর্জাতিক কোন তানজীমকে বাইয়াত দেয়ার হুকুম কী?

এর সাথে আরও অনেক বিষয় যোগ করা যাবে। এধরণের ইজতিহাদী বিষয়ের মূল সমস্যা হল অবস্থা ও প্রয়োগক্ষেত্র। মূল বিধান হয়ত স্পষ্ট। কিন্তু প্রয়োগক্ষেত্রের কারণে বিধানের ভিন্নতা হতে পারে। এসব ইজতিহাদী বিষয়কে অকাট্য মনে করা বা অন্য কোন আলিমের ইজতিহাদকে তাচ্ছিল্য করাটা হল বাড়াবাড়ি। এক্ষেত্রে জযবাতি ভাইয়েরা দু’টি কাজ করেন,

১। ইজতিহাদী বিষয়ের সমাধানের জন্য বিজ্ঞ ফকীহদের স্মরণাপন্ন হন না। অনেকক্ষেত্রে বিজ্ঞ আলিম ও ফকীহদের থেকে এই ভেবে দূরে থাকেন যে, আলিমরা আরাম প্রিয়। তারা গদি, পান ও পেট ঠিক রাখতে চায়। তাদের কাছে সঠিক সমাধান পাওয়া যাবে না। অথবা এরা বিকৃত করে ফতোয়া দিবে।

২। তারা এসব ইজতিহাদী বিষয়ে তাদের চেনা-জানা কিছু শায়খের ফতোয়া, ইন্টারনেটে বিভিন্ন বই ও বয়ান, অজানা বিভিন্ন লেখকের বক্তব্যকে চূড়ান্ত ধরে নেন। অথচ এসব লোকের ফিকহ ও ফতওয়ার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন করার যথেষ্ট সুযোগ আছে। কেউ কেউ এই কাজের যোগ্যও না। কেউ কেউ শুধু দলিল উল্লেখ করাকেই ফিকহ ও ফতোয়া মনে করে।অথচ দলিল ও এর ফিকহের মাঝে আকাশ-পাতাল ব্যবধান রয়েছে।

কোন কোন ভাই তো নতুন উসুল আবিষ্কার করেছেন। শুধু ময়দানের আলিমদেরই ফতোয়া নিবেন। অথবা নবী ইউসুফ আ: এর পাঠশালার ছাত্রদের কাছ থেকেই মাসআলা নিবেন। একেবারে কিছু তাবলীগীর মত। সাল লাগান আলেম ছাড়া কোন মাসআলা নিবে না।

২। তাগুত বর্জন।

জযবাতি দাওয়াতের একটি বড় অংশ হল তাগুত বর্জন। তাগুত বর্জনের কথা যেহেতু পবিত্র কুরআনে এসেছে, সুতরাং তাগুত বর্জনের বিষয়ে কারও দ্বিমত নেই। কিন্তু সমস্যা হল, তাগুত নির্ধারণে। কোনটা তাগুত আর কোনটা তাগুত না, সেইটা নির্ধারণে ইজতিহাদের প্রয়োজন। এসব ভাইদের তাগুতের লিস্টও একেবারে ছোট না। মুফতী তাকী উসমানী দা:বা: থেকে শুরু করে বরেণ্য আলিমরাও সেই তাগুতের লিস্টে স্থান পেয়েছে।

নিজেদের গবেষণায় যে কাউকে তাগুত বানিয়ে তাকে বর্জনের আহ্বানও এখন কমন বিষয়। মূল জিহাদের দাওয়াতের চেয়ে এসব দাওয়াতের বাজার আবার রমরমা। কাটতি বেশি। এগুলোও অনেক সচেতন আলিমকে বিব্রত করে।

৩। তাকফীর।
উপরের বিষয়গুলো থেকে তাকফির বেশি ভয়ঙ্কর। অথচ এটিই এখন সহজলভ্য ও সস্তা। তাদের মর্জি মত তাকফির না করলে আপনি মুরজিয়া। ইরজাগ্রস্ত। এসব ভাইদের তাকফিরকে সহজ করার জন্য নীচে কিছু উপায় উল্লেখ করছি। এর মাধ্যমে তারা চাাইলে সমাজের অধিকাংশ মানুষকে কাফির-মুশরিক বানাতে পারবে খুব সহজেই।

ক। ইসলামে গণতন্ত্র কুফুরী। সুতরাং যারা গণন্ত্রে বিশ্বাস করবে অথবা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে অংশ নিবে তারা কাফির। একারণে দেশের বড় বড় গণতান্ত্রিক দলের সাথে সাথে ইসলামী দলগুলোও কাফির। জামাতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন, খেলাফত মজলিশ ও আন্দোলন। ইত্যাদি। এরা সবাই কাফির।

খ। ভোটের সময় মন্দের ভাল হিসেবে কোন কোন দলকে আলিমরা ভোট দিতে বলেন। যেসব আলিম ভোট দিতে বলেন বা নিজেরা ভোট দেন, তারা কাফির।

গ। আপামর জনসাধারণকে গণতন্ত্র দিয়ে সহজে কাফির বলা না গেলেও অন্য রাস্তা আছে। দেশের বহু লোক তাবলীগ করে। আর তাবলীগের ফাজাইলের কিতাবে কুফুরী শিরকী রয়েছে। সুতারাং যারা তাবলীগ করে এরা কাফির মুশরিক।

ঘ। দেশের বহু লোক বিভিন্ন পীরের মুরিদ। এসব পীরদের কিতাবেও বিভিন্ন কুফুরী -শিরকী কথা আছে। এরাও কাফির-মুশরিক।

এভাবে মোটামুটি দেশের অধিকাংশ মুসলমানকেই কাফির-মুশরিক বানান যাবে। অনেকে এসব পদ্ধতি ব্যবহার করে বানাচ্ছেনও। অনেক ভাইয়ের কাছে স্বঘোষিত কাফির-মুশরিকদের চেয়ে মুসলমাদেরকে কাফির-মুশরিক বানান গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। তারা এগুলোর পেছনেই তাদের দাওয়াতের বড় একটা সময় ব্যয় করেন। অনেকের কাছেই ময়দানের চেয়ে এগুলোই মুখ্য বিষয়। মূল কাজের দাওয়াতের চেয়ে মূলমানকে কাফের বানান যেন বেশি সওয়বের কাজ। কেউ কেউ আবার পথের কাটা সরানোর কথা ভেবে কাফিরদের আগে এদেরকে টার্গেট করে। যেমন আইএস আল-কায়েকাকে টার্গেট করেছিল।

মূল কথা হল, আলিমদেরকে প্রতিপক্ষ বানিয়ে দ্বীনের কোন কাজই সফলতা পেতে পারে না। কাজটি যত মহতই হোক। সেই কাজকে সঠিক পথের উপর রাখতে আলিমদের নেগরানির প্রয়োজন আছে। আর যেখানে অবলীলায় মানুষকে কাফির-মুশরিক বানান যায়, শুধু ইল্লাল্লাহ বললে মানুষ কাফির হয়ে যায়, সেখানে আলিমদের রাহবারি কতটা জরুরি? মনে রাখতে হবে, জিহাদের দু’টি দিক আছে। একদিকে জুহদ, সবর, ইখলাস ও জান্নাত। অন্যদিকে তাকাব্বুর, রিয়া, শুহরত, অন্যায় তাকফির ও জাহান্নাম। যাচাই করতে হবে আমি কোন প্রান্তে।

ওমা আলাইনা ইল্লাল বালাগ।

Print Friendly