১। আমরা সবাই চাই সমাজের শিক্ষিত, উচ্চবিত্ত ও প্রভাবশালী লোকগুলো দ্বীনদার হয়ে যাক। তাদের মাধ্যমে ইসলামের কল্যাণেরও সম্ভাবনা থাকে। 
এজন্য সমাজের এলিট শ্রেণির কাছে দাওয়াতের ব্যাপারে আমাদের বেশ আগ্রহ থাকে।

তাদেরকে দাওয়াত দেয়া ও দ্বীনের পথে আনার চেষ্টা অবশ্যই দ্বীনের একটি মহান খেদমত। কিন্তু এক্ষেত্রে আমাদের নিজস্ব সীমাবদ্ধতার কারণে কিছু বিপত্তি ঘটে। বিপত্তিগুলো কোথাও লঘু। কোথাও ঘোরতর। ধরুন, তাদেরকে কাছে টানার জন্য একটু উদার হলাম। দ্বীনের কিছু বিধি-বিধানে একটু শিথিল হলাম। যেমন,

ক। এলিট শ্রেণিকে দাওয়াতের ক্ষেত্রে পর্দার বিধানে কিছুটা শিথিলতা। কোথাও দেখা যায় মডার্ণ হিজাবী বোনদেরকে উপস্থাপন করা হচ্ছে। তারা ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলছে।

খ। এলিটদেরকে কাছে টানার জন্য কিছু বিধান-বিধানের আবেদনকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন। কোথাও আংশিক, কোথাও লুকোচুরি। আবার কোথাও সামান্য বিকৃতি।

এখানে দাওয়াত দেয়াটা সওয়াবের কাজ। কাছে টানার নিয়তটাও সওয়াবের। কিন্তু পদ্ধতি ও বিপত্তিগুলো ভয়ঙ্কর। পেছনের মানসিকতাটা হল মূল সমস্যা। ভুলগুলো শোধরানো সহজ। পদ্ধতি পরিবর্তন করাও সহজ। কিন্তু মানসিকতা বার বার ফিরে আসে। কর্মে। কথায়। লেখায়।

এই ছাড় দেয়ার মানসিকতাকে দোষ দিচ্ছি কেন? একটু-আধটু ছাড় দিলে অসুবিধাটা কোথায়? সবজায়গায় কাট-মোল্লা হলে চলে?

উত্তরটা আসুন কোরআন থেকে নেই। সূরা আবাসা অবতীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপট। আল্লাহর রাসূল স: মক্কার শীর্ষ নেতাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছেন। উতবা। আবু জেহল। চাচা আব্বাস। ইত্যবসরে উপস্থিত হলেন আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম। অন্ধ। নবীজীর প্রিয় সাহাবী। এসে নবীজীকে কোরআনের একটি আয়াত নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন। আল্লাহর রাসূল স: তার প্রশ্নটিকে একটু এড়িয়ে গেলেন। নেতাদের সাথে আলোচনায় মনযোগী হলেন।

অন্ধ সাহাবীর কী শান। কোথায় আবু জেহল। কোথায় উতবা। অন্ধ সাহাবীর প্রশ্নকে এড়িয়ে যাওয়াও আল্লাহ তায়ালা পছন্দ করলেন না। যদিও এড়িয়ে যাওয়া বা পরে উত্তর দেয়াটা কোন সমস্যা ছিল না। এরপরও আল্লাহ তায়ালা পছন্দ করলেন না। আল্লাহ তায়ালা সাথে সাথে আসমান থেকে ওহী পাঠিয়ে দিলেন। জিবরীল আমিন সূরা আবাসা নিয়ে হাজির হলেন।

ইসলামের সার্বজনীন সৌন্দর্য এখানে। শ্রেণিবিভাগের সামান্য সম্ভাবনাও এখানে অগ্রহণযোগ্য। অপছন্দনীয়। কোন বিশেষ শ্রেণি আল্লাহর কাছে বিশেষ কোন মূল্য রাখে না। আল্লাহ তায়ালা দেখেন ভগ্ন হ্রদয়। অবনত মস্তক। চোখের দু’ফোটা অশ্রু। আল্লাহর মহব্বতে ভরা কলিজা। এগুলোই আল্লাহর কাছে দামী।

তাহলে এলিটদেরকে কাছে টানা বা তাদেরকে খুশি করার জন্য এই ছাড় দেয়ার মানসিকতা কীভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে?

২। কওমী অঙ্গনে নতুন জোয়ার এল। বাংলা সাহিত্য চর্চার জোয়ার। এর প্রয়োজনীয়তা কেউ অস্বীকার করবে না। এই জোয়ার থেকে জাতির অসামান্য ফায়দা হয়েছে। তবে একটা জায়গায় বিপত্তি রয়ে গেল। সেই বিপত্তির পেছনে আছে সমাজে অবহেলিত শ্রেণির সহজাত পরাজিত মানসিকতা।

কিছু কওমী তরুণ সেকুল্যার সাহিত্যিকদের কাছে ঘেষতে চাইল। তাদেরকে একটু খুশি করতে চাইল। কেউ কেউ একটু বেশি কাছে গেল। পরিণতি যা হবার তাই হল। কাফেরদেরকে কখন খুশি করতে পারবেন? আর কতটুকু পারবেন?

এলিট সাহিত্যিকদের কাছে টানতে গিয়ে, তাদের স্বীকৃতি আদায় ও আস্থা ভাজন হতে গিয়ে নিজের অজান্তেই কতো ভাই নিজের আদর্শ জলাঞ্জলি দিচ্ছে। এখানে কাকে দোষ দিব? হুজুরের সাহিত্যিক হওয়ার বাসনাকে? কখনও না। তাহলে? উত্তর একটাই।হুজুরের পরাজিত মানসিকতা।

৩। ইসলামি গজল, কবিতার বলতে গেলে সোনালি যুগ চলছে। প্রচুর দর্শক শ্রোতা। মাশাআল্লাহ অসংখ্য সুন্দর সুন্দর নাশিদ ও গজল আমরা নিয়মিত পাচ্ছি। আমি নিজেও প্রচুর গজল শুনি।

একটা সমস্যা মোটামুটি সবাই ফেস করে থাকবেন। গানের অনুকরণে গজল। কখনও হুবহু গানের শব্দের ইসলামীকরণ। কখনও সুর ও ছন্দের ইসলামীকরণ। অপরাধী গানের অসংখ্য ইসলামী ভার্সন আপনি পাবেন। এই জোয়ার সামান্য নয়। এর জন্য আমি কি কিছু ভাইকে দোষ দিব? তাদের গায়ক হওয়ার আকাংখ্যাকে দোষারোপ করব? কখনও না। বরং আমি এদের পরাজিত মানসিকতাকেই দায়ী করব।

মাথা উচু করাটা মুখ্য না। কতটুকু উচু করলাম তাও গুরুত্বপূর্ন নয়। কলিজা কত বড় সেটা হল মূল।

Print Friendly