জীবনে পরিমিতিবোধ অর্জন করতে বহু কাঠ-খড় পোড়াতে হয়। সোহবত, দোয়া ও তলব থাকতে হয়। এরপরই আল্লাহ তায়ালা দ্বীনের সঠিক বুঝ দান করেন। সেই বুঝই মুমিনের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যাকে পরিভাষায় বলে তাফাক্কুহ ফিদদীন। এটা না থাকলে অন্য সবকিছুই ঝুঁকির মধ্যে থাকে। যোগ্যতা মাপকাঠি নয়। যোগ্যতা ধারণ করার মতো বুঝ থাকাটাই আসল।

তাফাক্কুহ যদি না থাকে, সমূহ সম্ভাবনা আছে আপনি তিলকে তাল বানাবেন। অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে জীবন ব্যয় করবেন। অথচ এগুলো থেকে মুক্ত থাকতে পারলে আমার জীবন হয়ত ভিন্ন মাত্রা পেত। নীচে আমরা এরকম কিছু বিষয় তুলে ধরার চেষ্টা করছি। যেগুলোকে আমরা তাল মনে করে জীবনের মূল্যবান সময় ব্যয় করতে পারি। কিন্তু বাস্তবে সেগুলো আমার জীবনে এতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়।

১। সাহাবাগণের পারস্পরিক দ্বন্দ

ইতিহাসের বিচারে জঙ্গে জামাল, জঙ্গে সিফফীন গুরুত্বপূর্ণ। উসমান রা: এর শাহাদাত, আলী রা: এর শাহাদাত সবই গুরুত্বপূর্ণ। হযরত আলী ও হযরত মু’য়াবিয়া রা: এর দ্বন্দও ছোট বিষয় নয়। কিন্তু আমার ব্যক্তি জীবনে এই ইতিহাস কতটা গুরুত্ব রাখে? এখান থেকে আমার কতটুকু নেয়া দরকার? এখানে কি আমি অপ্রয়োজীয় সময় ও মেধা করছি?

ক। ধরুন, আমি হযরত আলী রা: এর পক্ষ নিয়ে হযরত মুয়াবিয়া রা: ও তার পক্ষের সাহাবীদেরকে যা ইচ্ছা বললাম। এটাকেই আমি আমার জীবনের ব্রত বানালাম। দুনিয়ার মানুষকে বোঝাতে শুরু করলাম, দেখো, ওমুক ওমুক খারাপ। এই কাজে দশ-বিশ বছর ব্যয় করে দিলাম। এতে আমার কী লাভ?

খ। আবার আমি হযরত মু’য়াবিা রা: ও ইয়াজিদের পক্ষ নিয়ে হযরত আলী রা: ও রাসূল স: এর প্রিয় নাতীদেরকে দোষারোপ করলাম। আকারে ইঙ্গিতে তাদের অসম্মান করলাম। এর পেছনেই আমার মেধা ও শ্রম ব্যয় করলাম। এটাকেই জীবনের ব্রত বানালাম। দিন শেষে এতে আমার কী লাভ?

একটু চিন্তা করলে বুঝবেন, ঐতিহাসিকভাবে বিষয়গুলো তাল। কিন্তু আমার জীবনে এসবের ভূমিকা তিলের চেয়ে নগন্য। কোন একজনকে ভুল প্রমাণ করে আমার লাভ কী? আমার কী উপকারটা হচ্ছে? তারা গত হয়ে গেছেন। তাদের আমলের বিচার আল্লাহ করবেন। আমি যদি ইনসাফ করতে না পারি, তাহলে চুপ থাকি। এ বিষয়ে চুপ থাকলে শরীয়তের দৃষ্টিতে আমার কোন গোনাহ হবে? আমি ভালো-মন্দ কিছু বললাম না। আল্লাহর উপর ছেড়ে দিলাম। মোটা মোটা কথার উপর আমলের চেষ্টা করলাম। সামগ্রিকভাবে সমস্ত সাহাবীকে মহব্বত করলাম। তাদের ব্যাপারে আল্লাহর ক্ষমা, রাসূলের মহব্বতকে মূল ধরে নিলাম। এর বাইরে গিয়ে আমার ব্যক্তি জীবনে, আমলী জীবনে এর বিশেষ কোন ভূমিকা আছে কি?

২। হাদীসের সহী-জয়ীফ

ইসলামে কোন জ্ঞানের শাখাকে যদি সমুদ্রের সাথে তুলনা করা যায়, তাহলে সেটা হবে উলুমুল হাদীস। এই সমুদ্র থেকে কেউ এক বালতি পানি আহরণ করে। কেউ এক জাহাজ। কেউ আরও বেশি। তবে এর ব্যাপকতা ও বিশালতার কথা সবাই স্বীকার করেন।

আমি একজন সাধারণ মানুষ। এই উলুমুল হাদীসের এই সমুদ্র আমার জীবনে কী ভূমিকা রাখতে পারে? আমার জন্য এই সমুদ্র ডুব দিয়ে প্রত্যেকাটা হাদীস যাচাই করে আমল করা জরুরি? মুহাদ্দিসদের উপর আস্থা রেখে চললে কি আমার ক্ষতি হবে? আমার পরকালীন মুক্তি কি বাধাগ্রস্ত হবে? চারপাশে কিছু লোক আছে। যারা বিষয়টাকে তাল বানিয়ে উপস্থাপন করবে। অথচ এটি আপনার জীবনে তিলের ভূমিকাও রাখে না। আপনি যদি মুহাদ্দিসদের উপর নির্ভব করেন, তাহলে আপনার আখিরাত নষ্ট হবে না। উল্টো নিজে মুহাদ্দিস সেজে হাদীসের মান নির্ণয়ে নেমে পড়লে আপনার বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে নিশ্চিত।

৩। ফিকহ ও মাজহাব

দৈনন্দিন জীবনে হাজারও সমস্যা আছে। যেগুলোর সমাধান সরাসরি কুরআন ও হাদীসের মূল বক্তব্যে নেই। আবার থাকলেও বাহ্যিকভাবে পরস্পর বিরোধী বক্তব্য, ব্যক্তি ও অবস্থার ভিন্নতার কারণে এগুলো নিয়ে গবেষণার প্রয়োজন আছে। এই গবেষণার কাজটি আনজাম দিয়েছেন মাজহাবের ইমামগণ। যুগে যুগে এই গবেষণার ধারা অব্যাহত রেখেছেন ফকীহ আলিমগণ। সাধারণ মানুষের দায়িত্ব হল বিজ্ঞ আলিম ও ফকীহদের ফতোয়া অনুসরণ করা। বিষয়টা অতি সহজ।

আমাদের সমাজে কিছু ভাই আছে। বিষয়টাকে তাল বানাবে। আপনার ইমান-ইসলাম নিয়ে টানাটানি শুরু করবে। ইমামদেরকে ব্রাহ্মণ-পুরোহিত আর আপনাকে তাদের পূজারী বানাবে। আপনাকে উত্তেজিত করবে। আপনার আখেরাতের মুক্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। ধরুন, আপনি তাদের কথায় ময়দানে নেমে পড়লেন। ফিকহ, ফতোয়া আর মাসআলা-মাসাইল নিয়ে গবেষণা শুরু করলেন। আট-দশ বছর কেটে গেল। অবশেষে গিয়ে বুঝলেন, এটা আপনার কাজ নয়। আলিমদের অনুসরণই আপনার আসল দায়িত্ব। এই সরল কথাটুকু বোঝার জন্য দশ বছর কাটানোর দরকারটা কী? আর ময়দানে তীহে ঘোরাঘুরি করে আগের জায়গায় ফিরে আসার দরকার কী?

৪। ইসলামী আকিদা ও সহীহ আকিদা
ইসলামী আকিদাগুলো অকাট্য ও সরল। সেখানে জারিজুরি কম। সর্বস্তরের সবাই যেন মানতে পারে। সাধারন মানুষের জন্য এই সরল আকিদাকে মেনে নেয়া কঠিন কাজ নয়। কিন্তু আমাদের চারপাশে কিছু ভাই আছেন। তারা আপনাকে সহীহ আকিদার নামে কিছু বিষয়ের দাওয়াত দিবে। সেই দাওয়াতের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা এতো বাড়িয়ে তুলে ধরবে যে, আপনার মাথায় হাত। আপনার ইমান-আকিদার তো কিছুই বোধহয় ঠিক নেই। আল্লাহ কোথায়, আল্লাহর হাত, পা , চোখ, কান, মুখ এগুলোতে বিশ্বাস না করলে ইমান থাকে?
অথচ এগুলো ইসলামী আকিদার মৌলিক কোন বিষয় নয়। পরবর্তী কিছু লোকের অপ্রয়োজনীয় সংয়োজন। সহীহ আকিদার নামে তারা এগুলোই শিখাবে।

এগুলো নিয়ে আপনাকে উত্তেজিত করবে। আপনি তাদের কথায় গবেষণায় নেমে গেলেন। পাঁচ-দশ বছর কেটে গেল। পরে বুঝতে পারলেন, আপনাকে সরল রাস্তায় ফিরতে হবে। এগুলো ইমান ও ইসলামের মৌলিক বিষয় নয়। সেই আগের জায়গায় এলেন। মাঝখানে আপনার মূল্যবান কয়েকটা বছর ব্যয় করতে হলে। যাকে আপনি তাল মনে করলেন, পরে গিয়ে দেখলেন আসলে এগুলো তিল ছিল।

সমাজে উস্কে দেয়ার লোকের অভাব নেই। তারা আপনাকে নানা বিষয়ে ব্যস্ত রাখবে। ইসলামের মূল আবেদন থেকে সরিয়ে রাখবে। তাকওয়া, তওবা, আল্লাহর নৈকট্য থেকে দূরে সরে যাবেন। যুক্তিতর্ক ও অপ্রয়োজনীয় ঝগড়া আপনার প্রিয় হবে। এভাবে জীবনের মূল্যবান সময়গুলো নষ্ট হবে। এজন্য জীবনে পরিমিতিবোধ ও তাফাক্কুহ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটি শিখতে হবে খোদাভীরু আলিমদের সংস্পর্শে থেকে। প্রফেসর হামীদুর রহমান হযরতের ভাষায় আলিমদের জুতা সোজা করে। আগামীর ব্রত হোক তাফাক্কুহ ফিদদীন অর্জন।

Print Friendly