সালাফের মূল অবস্থান কী ছিলো?

আল্লাহর নাম ও গুণাবলী বিষয়ে অসাধারণ একটি কিতাব হলো ড. আয়‍্যাশ আল-কুবাইসী এর লেখা আস-সিফাতুল খাবারিয়‍্যা। এ কিতাবে তিনি সিফাতের বিষয়ে অত‍্যন্ত জ্ঞান গর্ভ আলোচনা করেছেন। যারা সিফাত বিষয়ে অধ‍্যয়ন করতে চান, তাদের প্রত্যেকের কিতাবটি পড়া উচিৎ। এ কিতাবে শায়খ আয়‍্যাশ কুবাইসী সিফাতের বিষয়ে সালাফের অবস্থান নিয়ে আলোচনা করেছেন। আলোচনার উপসংহারে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা লিখেছেন। আমি তার উপসংহারের মোটামুটি অনুবাদ সাধারণ পাঠকের জন‍্য তুলে ধরছি।
“সিফাতের বিষয়ে সালাফের অবস্থান সম্পর্কে উপযুক্ত স্পষ্ট পর্যালোচনা থেকে আমরা দৃঢ়ভাবে বলতে পারি যে, সিফাতের বিষয়ে সালাফে সালেহীনের সুস্পষ্ট কোন একক মাজহাব ছিলো না। কিছু ধারণা ও আলামতের উপর নিভর্র করে সিফাতের বিষয়ে সালাফদের অবস্থানের ব‍্যাখ‍্যা করা হয়। এই ধারণা ও আলমাত গুলো অকাট‍্য নয়। ফলে সালাফদের অবস্থানের বিষয়ে যেসব ব‍্যাখ‍্যা করা হয়, অনুমান নির্ভর হওয়ার কারণে সেই ব‍্যাখ‍্যাগুলো মেনে নেয়া আমাদের জন‍্য আবশ‍্যক নয়। এজন‍্য বিষয়টি নিয়ে পরবর্তী আলেমগন মতবিরোধ করেছেন। পরবর্তীদের মধ্যে বিভিন্ন মাজহাব ও মতবাদ দেখা দিয়েছে। সিফাতের বিষয়ে সালাফের যদি একটিমাত্র সুস্পষ্ট মাজহাব থাকতো, তাহলে কোন মুসলিমের জন‍্য সেটার বিরোধীতা করা জায়েজ হতো না। এটা তো অকল্পনীয় যে, সালাফের একটি মাত্র সুস্পষ্ট মাজহাব থাকবে, আর মুসলিম উম্মাহর বিশাল একটা অংশের পক্ষে তাদের বিরোধীতা করা জায়েজ হয়ে যাবে।
আকিদা এমনকি ফিকহী বিষয়ে সালাফের একটিমাত্র মাজহাব ছিলো, এ ধরণের দাবী মূলত: বাস্তবতা বিবর্জিত ও ভয়ংকর। বাস্তবে এধরণের দাবী মুসলিম উম্মাহের মাঝে বিভেদের রাস্তা প্রশস্ত করেছে। বিভেদটি মুসলমানদের মধ্যে এমন ভয়ংকর দূরত্ব তৈরি করেছে যে এর উপশম কঠিন। এজন‍্য একজন আরেকজনকে পথভ্রষ্ট, বিদয়াতী এমনকি কাফের বলার বাজার গরম হয়েছে। লা হাওলা ওলা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।
ধরুন, সিফাতের বিষয়ে সালাফে যতো কথা বলেছেন, আমরা সবগুলো একত্র করলাম। তাদের সমস্ত বক্তব‍্য একত্র করে কি আমরা একটা সুস্পষ্ট একক মাজহাব ও সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারবো? একটি একক মাজহাবে উপনীত হওয়া যে সম্ভব নয়, এটি প্রমাণের জন‍্য সালাফদের মতবিরোধের যে উদাহরণগুলো আমি আলোচনা করেছি, সেগুলোই যথেষ্ট।আর যারা সালাফের যুগে অবস্থান করতেন, তাদের সামনে তো সমস্ত সালাফের বক্তব‍্য সংকলিত অবস্থায় ছিলো না। কারণ তখন তারা এগুলো সংকলন, বিন‍্যাস ও লিপিবদ্ধের বিষয়ে এতটা গুরুত্ব দিতেন না। সে সময়ে তারা এগুলোর প্রতি মানুষকে আহ্বানও করতেন না আবার তাদের বক্তব্যের ব‍্যাখ‍্যাও দিতেন না।সালাফের অবস্থানের বিষয়ে আমার কাছে সবচেয়ে গ্রহণযোগ‍্য মত হলো,সিফাতের এসব বিষয় শরীয়তের অবধারিত কোন কিছুর অন্তর্ভূক্ত নয়। (অথর্াৎ এগুলো প্রতে‍্যক মুসলিমকে অবশ‍্যই মানতে হবে, বিষয়টি এমন নয়)। তাই যদি হতো, তাহলে কি সমস্ত সাহাবী এটা জানতেন যে, আল্লাহর দু’টি হাত, আঙ্গুল, পা, পায়ের পিন্ডলী, চেহারা এবং আল্লাহর চোখ আছে? সাহাবীদের প্রতে‍্যকেই কি জানতেন যে আল্লাহ উপহাস করেন, ষড়যন্ত্র করেন, আল্লাহ তায়ালা হাসেন, উপর ওঠেন, নীচে নামেন? সাহাবীদের প্রত্যেকে কি এগুলো মুখস্থ রাখতেন, এগুলোকে দ্বীনের মৌলিক আকিদা ও দ্বীনের মৌলিক অংশ মনে করতেন? তারা কি অন‍্যদেরকে এগুলো বিশ্বাসের প্রতি দাওয়াত দিতেন? তারা কি এগুলো দিয়ে মানুষকে পরীক্ষা করতে যে, তারা প্রকৃত মুসলমান কি না? তারা কি তাদের ছেলে সন্তানদেরকে এগুলো গুরুত্ব সহকারে শিক্ষা দিতেন? তারা যদি এগুলো করে থাকেন, তাহলে এ বিষয়ে তো আমাদের কাছে তাদের একটা বর্ণনাও এলো না? তরকের খাতিরে ধরে নিলাম, একজন দু’জন সাহাবী করেছেন। (যদিও একজন দু’জন থেকেও বিষয়টি বর্ণিত নয়), তাদের সকলে কি এটি করেছেন? আপনার জন‍্য কি আদৌ এটা জায়েজ হবে যে, আপনি ইসলামের একেবারে মৌলিক কিছু আকিদা একেবারে বেমালুম ভুলে থাকবেন?এসমস্ত প্রশ্ন দিয়ে বিরামহীন সেমস্ত মস্তিষ্কে আঘাত করা উচিৎ যারা উম্মাহের দেহ খন্ড-বিখন্ড করার জন‍্য সিফাতের বিষয়গুলোকে কাচি হিসেবে ব‍্যবহার করছে। আল্লাহই একমাত্র সাহায‍্যকারী।
— আস-সিফাতুল খাবারিয়‍্যা, ড. আয়‍্যাশ আল-কুবাইসী, পৃ.৭৮ (স্ক্রিনশট দ্রষ্টব‍্য)

Read More